‘বিদেশে গেলে লাইফ সেট’—আমরা কি এক মরীচিকার পেছনে ছুটছি?
এমকে হক, জার্মানি ইউরোর অঙ্কে সুখ মাপা মানুষেরা প্রবাস জীবনের একাকীত্ব ও সংগ্রামের গল্পটা জানতেও চায় না। আমাদের সমাজে একটা কথা খুব প্রচলিত- ‘বিদেশে গেলে লাইফ সেট।’ আমি যতদিন জার্মানিতে আছি, এই একটা কথার সঙ্গে কোনোভাবেই একমত হতে পারিনি। কিছু কথা আমাদের চারপাশে এতবার বলা হয় যে, অবচেতনভাবেই সেগুলোকে আমরা ধ্রুব সত্য বলে ধরে নিই। ছোটবেলা থেকে এই থিওরি শুনতে শুনতেই বড় হয়েছি। গ্রামের কেউ ইউরোপে গেলেই বলা হতো, ‘ওর তো আর কোনো চিন্তা নেই।’ কেউ জার্মানিতে একটা চাকরি পেলেই মন্তব্য আসত, ‘এখন তো ও শুধু টাকা গুনবে!’ আমি অবশ্য কাউকে দোষ দিই না। কারণ জার্মানি আসার আগে আমিও ঠিক এটাই বিশ্বাস করতাম। জার্মানিতে পা রাখার পর প্রথম কয়েকটা মাস আমারও মনে হয়েছিল জীবন বুঝি বদলে গেছে। নতুন অফিস, আকর্ষণীয় বেতন, ঝকঝকে সুন্দর রাস্তা, ঘড়ির কাঁটা ধরে চলা বাস-ট্রেন, আর ছবির মতো সাজানো পরিপাটি শহর। কিন্তু দিন যত গড়াল, বুঝলাম-ছবির ফ্রেমের বাইরেও একটা বিশাল জীবন আছে, যা সোশ্যাল মিডিয়ার রঙিন দুনিয়ায় কখনো প্রকাশ পায় না। আরও পড়ুন সব রোগের ওষুধ প্যারাসিটামল! মালয়েশিয়ায় ১৪০ বন্দির মৃত্যু একদিন রাতের কথা। অফিস থেকে ফির
এমকে হক, জার্মানি
ইউরোর অঙ্কে সুখ মাপা মানুষেরা প্রবাস জীবনের একাকীত্ব ও সংগ্রামের গল্পটা জানতেও চায় না। আমাদের সমাজে একটা কথা খুব প্রচলিত- ‘বিদেশে গেলে লাইফ সেট।’ আমি যতদিন জার্মানিতে আছি, এই একটা কথার সঙ্গে কোনোভাবেই একমত হতে পারিনি।
কিছু কথা আমাদের চারপাশে এতবার বলা হয় যে, অবচেতনভাবেই সেগুলোকে আমরা ধ্রুব সত্য বলে ধরে নিই। ছোটবেলা থেকে এই থিওরি শুনতে শুনতেই বড় হয়েছি। গ্রামের কেউ ইউরোপে গেলেই বলা হতো, ‘ওর তো আর কোনো চিন্তা নেই।’ কেউ জার্মানিতে একটা চাকরি পেলেই মন্তব্য আসত, ‘এখন তো ও শুধু টাকা গুনবে!’ আমি অবশ্য কাউকে দোষ দিই না। কারণ জার্মানি আসার আগে আমিও ঠিক এটাই বিশ্বাস করতাম।
জার্মানিতে পা রাখার পর প্রথম কয়েকটা মাস আমারও মনে হয়েছিল জীবন বুঝি বদলে গেছে। নতুন অফিস, আকর্ষণীয় বেতন, ঝকঝকে সুন্দর রাস্তা, ঘড়ির কাঁটা ধরে চলা বাস-ট্রেন, আর ছবির মতো সাজানো পরিপাটি শহর। কিন্তু দিন যত গড়াল, বুঝলাম-ছবির ফ্রেমের বাইরেও একটা বিশাল জীবন আছে, যা সোশ্যাল মিডিয়ার রঙিন দুনিয়ায় কখনো প্রকাশ পায় না।
একদিন রাতের কথা। অফিস থেকে ফিরেছি, শরীর প্রচণ্ড ক্লান্ত, মাথায় তীব্র যন্ত্রণা। কিন্তু ফ্রিজ খুলে দেখি খাবার নেই। শরীর না চললেও বাধ্য হয়ে রান্নাঘরে দাঁড়াতে হলো। কারণ এখানে ‘আজ শরীর ভালো নেই, মা রান্না করে দেবে’- এমন কোনো সমীকরণ কাজ করে না।
কাপড় ধোয়া, ঘর পরিষ্কার রাখা, মাসের সব বিল সময়মতো পরিশোধ করা, অফিসের কাজের চাপ সামলানো, ভাষার প্রতিবন্ধকতা আর প্রতিদিনের অফিশিয়াল কাগজপত্রের ঝামেলা- সবকিছু এখানে এক হাতে সামলাতে হয়। তখনই প্রথম উপলব্ধি করলাম, প্রবাস জীবনে স্বাধীনতা আছে ঠিকই, তবে সেই স্বাধীনতার পিঠে যে পরিমাণ দায়িত্বের বোঝা চেপে বসে, তা বহন করা সহজ নয়।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খেয়েছিলাম এখানকার মানুষদের ব্যক্তিগত জীবন দেখে। অনেকেই এখানে খুব মোটা অঙ্কের বেতন পান, কিন্তু সপ্তাহের শেষে শুক্রবার রাতে একাকী নিজের ফ্ল্যাটে বসে থাকেন। আবার এমন মানুষও দেখেছি যাদের আয় হয়তো খুব বেশি নয়, কিন্তু পরিবার, বন্ধুবান্ধব আর মানসিক শান্তির কারণে তারা দিনশেষে অনেক বেশি সুখী। তখনই মনের ভেতর প্রশ্নটা জাগল- সুখ আর উপার্জনের অঙ্ক কি আসলেই এক জিনিস?
গত কয়েক বছরে একটা নির্মম ট্রেন্ড লক্ষ্য করেছি। বাংলাদেশে থাকা আমাদের পরিচিত মানুষেরা বিদেশকে শুধু ইউরোর অঙ্ক দিয়ে মাপতে ভালোবাসেন। কেউ ভুলেও জিজ্ঞেস করে না, ‘তুমি কেমন আছ?’ কিংবা ‘মানসিকভাবে শান্তিতে আছ তো?’ বরং প্রথম অবধারিত প্রশ্নটাই হয়, ‘তোমার বেতন কত?’
যেন একজন মানুষের মূল্য তার সততা, তার চরিত্র, তার নিত্যদিনের সংগ্রাম বা স্বপ্নের ওপর নির্ভর করে না; বরং মাসের শেষে ব্যাংকে কত টাকা ঢুকলো- সেটাই তার একমাত্র পরিচয়।
এই জায়গাটাতেই আমার তীব্র দ্বিমত। আমি অস্বীকার করছি না যে, বেঁচে থাকার জন্য টাকা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মানুষকে শুধু টাকার দাঁড়িপাল্লায় মাপা অত্যন্ত বিপজ্জনক। আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে হয়তো ৫ হাজার ইউরো জমে আছে, কিন্তু প্রতি রাতে যদি আপনাকে তীব্র মানসিক চাপ নিয়ে ঘুমাতে যেতে হয়, তবে সেই ইউরোর প্রকৃত মূল্য আসলে শূন্য।
অন্যদিকে, কারো আয় যদি কিছুটা কমও হয়, কিন্তু সে যদি রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পারে, পরিবারকে গুণগত সময় দিতে পারে এবং নিজের কাজকে ভালোবাসতে পারে- তবে তাকে কোনোভাবেই ব্যর্থ বলা চলে না।
আমার কাছে সফলতার মানে শুধু একটি মোটা অঙ্কের পে-চেক নয়। সফলতা হলো এমন একটি জীবন, যেখানে আপনি নিজের সিদ্ধান্ত নিজে স্বাধীনভাবে নিতে পারবেন, বিপদের দিনে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারবেন, অসুস্থ হলে সুচিকিৎসা পাবেন এবং রাতে ঘুমানোর আগে অন্তত এই আফসোসটা হবে না যে- আজকের দিনটাও শুধু যান্ত্রিক ইঁদুরদৌড়েই কাটিয়ে দিলাম!
আমার এই ভাবনা পড়ে হয়তো অনেকেই অবজ্ঞার সুরে বলবেন, ‘না ভাই, দিনশেষে টাকাই সব।’ আমি আপনার সেই ব্যক্তিগত মতামতকে অবশ্যই শ্রদ্ধা জানাই। তবে যাওয়ার আগে আপনার কাছে একটি সাধারণ প্রশ্ন রেখে যেতে চাই।
যদি টাকাই জীবনের একমাত্র চালিকাশক্তি বা সব সুখের উৎস হতো, তবে পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষদের জীবনে কোনো দুঃখ-কষ্ট থাকত না। তাদের সুন্দর সম্পর্কগুলো ভেঙে যেত না, তীব্র একাকীত্ব বা মানসিক অবসাদ তাদের গ্রাস করত না।
তাই আমার বিশ্বাস, জীবনের জটিল সমীকরণে টাকা অবশ্যই একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘অধ্যায়’। কিন্তু মনে রাখবেন, এটি কিন্তু পুরো ‘বই’টা নয়।
প্রত্যেক মানুষের জীবনের অভিজ্ঞতা আলাদা, তাই আমার সঙ্গে আপনার দ্বিমত থাকতেই পারে। আর ভিন্ন মতের প্রতি পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ থেকেই একটি সুন্দর আলোচনা জন্ম নেয়।
সবশেষে এটুকুই বলব- বিদেশে আসার স্বপ্ন আপনারা অবশ্যই দেখুন। জীবনে অনেক বড় হওয়ার, অনেক টাকা উপার্জনের স্বপ্নও বুকে লালন করুন। কিন্তু জীবনটাকে এমনভাবে গড়ে তুলুন, যেন একদিন আপনার সন্তান বুক ফুলিয়ে বলতে পারে, ‘আমার বাবা বা মা শুধু টাকা উপার্জন করতে শেখেননি, তারা একজন সত্যিকারের ভালো মানুষও ছিলেন।’
এমআরএম
What's Your Reaction?
