বিষাক্ত বর্জ্যের বিরুদ্ধে ‘নীরব যোদ্ধা’ ইটিপি

বাংলাদেশে শিল্পায়নের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকিও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার আশপাশের নদী, খাল ও জলাশয়গুলো শিল্পবর্জ্যের কারণে দিন দিন দূষিত হয়ে পড়ছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা কিংবা ধলেশ্বরী নদীর পানির দিকে তাকালেই দূষণের ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নদীর পানির কালচে রং, দুর্গন্ধ এবং জলজ প্রাণীর ক্রমহ্রাসমান উপস্থিতি এখন এক গভীর পরিবেশ সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিল্পকারখানায় ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) স্থাপন ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। ইটিপি হলো এমন একটি শোধন ব্যবস্থা, যেখানে শিল্পকারখানা থেকে বের হওয়া দূষিত তরল বর্জ্য বিভিন্ন ধাপে পরিশোধন করে পরিবেশে নিঃসরণ করা হয়। অর্থাৎ, নদী বা খালে বর্জ্য ফেলার আগে সেটিকে রাসায়নিক, জৈবিক ও যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিরাপদ মাত্রায় নিয়ে আসাই ইটিপির মূল কাজ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্যের বড় অংশই বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা কিংবা ধলেশ্বরী নদীতে ফেলা হয়। এতে পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যায়, জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটে এবং মান

বিষাক্ত বর্জ্যের বিরুদ্ধে ‘নীরব যোদ্ধা’ ইটিপি

বাংলাদেশে শিল্পায়নের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকিও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার আশপাশের নদী, খাল ও জলাশয়গুলো শিল্পবর্জ্যের কারণে দিন দিন দূষিত হয়ে পড়ছে। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা কিংবা ধলেশ্বরী নদীর পানির দিকে তাকালেই দূষণের ভয়াবহ চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নদীর পানির কালচে রং, দুর্গন্ধ এবং জলজ প্রাণীর ক্রমহ্রাসমান উপস্থিতি এখন এক গভীর পরিবেশ সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। পরিবেশবিদরা বলছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিল্পকারখানায় ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) স্থাপন ও কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।

ইটিপি হলো এমন একটি শোধন ব্যবস্থা, যেখানে শিল্পকারখানা থেকে বের হওয়া দূষিত তরল বর্জ্য বিভিন্ন ধাপে পরিশোধন করে পরিবেশে নিঃসরণ করা হয়। অর্থাৎ, নদী বা খালে বর্জ্য ফেলার আগে সেটিকে রাসায়নিক, জৈবিক ও যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিরাপদ মাত্রায় নিয়ে আসাই ইটিপির মূল কাজ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্যের বড় অংশই বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা কিংবা ধলেশ্বরী নদীতে ফেলা হয়। এতে পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যায়, জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটে এবং মানুষের ব্যবহারের জন্য পানি অনিরাপদ হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন

তাদের মতে, একটি কার্যকর ইটিপি শুধু পানি দূষণ কমায় না, বরং সামগ্রিক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ শিল্পবর্জ্যে প্রায়ই সিসা, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, অ্যামোনিয়া, সালফাইড ও বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান থাকে। এসব উপাদান দীর্ঘমেয়াদে মানুষের শরীরে ক্যানসার, কিডনি জটিলতা, চর্মরোগ এবং শ্বাসতন্ত্রের সমস্যার কারণ হতে পারে।

বিশেষ করে ট্যানারি শিল্পে ব্যবহৃত ক্রোমিয়াম অত্যন্ত ক্ষতিকর। যদি তা সরাসরি নদীতে ফেলা হয়, তাহলে পানি ও মাটির গুণগত মান নষ্ট হয়। একই সঙ্গে কৃষিজ উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই শিল্পাঞ্চলভিত্তিক কার্যকর ইটিপি স্থাপন এখন সময়ের দাবি।

নিয়ম থাকলেও বাস্তবায়নে অনীহা

বাংলাদেশে পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকারখানায় ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে অনেক কারখানায় ইটিপি থাকলেও তা নিয়মিত চালু রাখা হয় না।

ইটিপি শিল্পের দূষিত পানি পরিশোধন করে ন্যাচারাল পানিতে (প্রকৃতির উপযোগী পানি) রূপান্তর করে। এই পরিশোধিত পানি নদী বা জলাশয়ে পড়লে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয় না। কিন্তু পরিশোধন ছাড়াই শিল্পের বর্জ্য নদীতে ফেলা হলে নদীর পানি দূষিত হয়ে পড়ে এবং জীববৈচিত্র্যের স্বাভাবিক পরিবেশ ধ্বংস হয়।-জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের আরেক অধ্যাপক এম. মনজুরুল হাসান

কেউ কেউ বিদ্যুৎ ও পরিচালন ব্যয় বাঁচাতে রাতের আঁধারে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে দেন। আবার কিছু কারখানায় নিম্নমানের ইটিপি স্থাপন করা হয়েছে, যা কার্যকরভাবে বর্জ্য শোধনে অক্ষম।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ইটিপি স্থাপন করলেই হবে না, সেটি সঠিকভাবে পরিচালনা ও নিয়মিত মনিটরিংও নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের তদারকি আরও জোরদার করার পাশাপাশি শিল্প মালিকদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

পরিবেশ রক্ষার সঙ্গে রপ্তানি বাজারে প্রভাব

তাদের মতে, বিশ্বব্যাপী এখন টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিবেশসম্মত উৎপাদন ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে বিদেশি ক্রেতারা এখন কারখানার পরিবেশ সুরক্ষা ব্যবস্থা, বিশেষ করে ইটিপির কার্যকারিতা যাচাই করেই ক্রয়াদেশ দিচ্ছেন। ফলে, ইটিপি এখন শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয়, রপ্তানি বাজার ধরে রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তারা বলছেন, বাংলাদেশের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে শিল্পায়নের গতি ধরে রাখা, অন্যদিকে পরিবেশ রক্ষা করা। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য আনতে কার্যকর ইটিপি ব্যবস্থার বিকল্প নেই। নদী, প্রকৃতি ও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণে এখনই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায়, উন্নয়নের সুফলের চেয়ে পরিবেশ বিপর্যয়ের ক্ষতিই একসময় বড় হয়ে উঠবে।

আরও পড়ুন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, নদী, খাল, জলাশয় ও কৃষিজমিতে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শিল্পবর্জ্য মিশে যাচ্ছে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, ডাইং, ট্যানারি ও রাসায়নিক শিল্পের বর্জ্য পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় ইটিপি পরিবেশ রক্ষার অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।

তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী প্রতিটি শিল্পকারখানায় ইটিপি থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তবে দেশের অধিকাংশ শিল্পকারখানায় কার্যকর ইটিপি নেই। তার ভাষায়, এটা যেন কাজীর গরু। কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই।

এই অধ্যাপক জানান, অনেক শিল্প মালিক খরচ বাঁচাতে ইটিপি স্থাপন করেন না। আবার কোথাও ইটিপি থাকলেও তা নিয়মিত চালানো হয় না। রাতের আঁধারে অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। ফলে নদীর পানি দ্রুত দূষিত হয়ে পড়ছে।

পানির রং ও গন্ধই বলে দেয় দূষণের ভয়াবহতা কতটুকু

অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বলেন, ঢাকার আশপাশের নদীগুলোর বর্তমান অবস্থাই তার প্রমাণ। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরী নদীর পানির রং ও গন্ধই বলে দেয় দূষণের ভয়াবহতা কতটা। অপরিশোধিত শিল্পবর্জ্যের বড় অংশ এসব নদীতে গিয়ে পড়ছে। এতে পানির দ্রবীভূত অক্সিজেন কমে যাচ্ছে, জলজ প্রাণীর মৃত্যু ঘটছে এবং মানুষের ব্যবহারের জন্য পানি অনিরাপদ হয়ে উঠছে।

শিল্পকারখানার জন্য ইটিপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পরিবেশ রক্ষা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকারগুলোর একটি। কোনো শিল্পকারখানায় ইটিপি না থাকলে বর্জ্য সরাসরি খাল, নদী ও জলাশয়ে গিয়ে পরিবেশ দূষণের কারণ হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।-বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম

পরিবেশ রক্ষায় ইটিপির কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ইটিপি হলো এমন একটি শোধনাগার ব্যবস্থা, যেখানে শিল্পকারখানা থেকে বের হওয়া দূষিত তরল বর্জ্য বিভিন্ন ধাপে পরিশোধন করে পরিবেশে নিঃসরণ করা হয়। অর্থাৎ, নদী বা খালে বর্জ্য ফেলার আগে সেটিকে রাসায়নিক, জৈবিক ও যান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিরাপদ মাত্রায় নিয়ে আসার কাজটিই করে ইটিপি।

এই অধ্যাপক বলেন, শিল্পায়নের সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার ভারসাম্য বজায় রাখতে হলে প্রতিটি শিল্পকারখানায় কার্যকর ইটিপি স্থাপন নিশ্চিত করতে হবে। শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, বাস্তবায়নেও কঠোরতা প্রয়োজন। পরিবেশ অধিদপ্তরের নিয়মিত তদারকি এবং আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

ইটিপিকে ব্যয় হিসেবে নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত

তিনি বলেন, শিল্প মালিকদের ইটিপিকে ব্যয় হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত। কারণ পরিবেশ ধ্বংসের ক্ষতি অর্থনৈতিকভাবেও ভয়াবহ। নদী দূষিত হলে মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হয়, কৃষি উৎপাদন কমে যায়, নিরাপদ পানির সংকট তৈরি হয় এবং মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের আরেক অধ্যাপক এম. মনজুরুল হাসানও ইটিপিকে পরিবেশ সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে ইটিপি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার আশপাশের বেশিরভাগ শিল্পকারখানায় ইটিপি না থাকায় বুড়িগঙ্গা নদীর পানির এই ভয়াবহ অবস্থা (দূষিত কালো) সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, ইটিপি শিল্পের দূষিত পানি পরিশোধন করে ন্যাচারাল পানিতে (প্রকৃতির উপযোগী পানি) রূপান্তর করে। এই পরিশোধিত পানি নদী বা জলাশয়ে পড়লে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হয় না। কিন্তু পরিশোধন ছাড়াই শিল্পের বর্জ্য নদীতে ফেলা হলে নদীর পানি দূষিত হয়ে পড়ে এবং জীববৈচিত্র্যের স্বাভাবিক পরিবেশ ধ্বংস হয়।

এই অধ্যাপকের মতে, একটি কার্যকর ইটিপি শুধু পানি দূষণ কমায় না, বরং সামগ্রিক পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ শিল্পবর্জ্যে প্রায়ই সীসা, ক্রোমিয়াম, আর্সেনিক, অ্যামোনিয়া, সালফাইডসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান থাকে। এসব উপাদান দীর্ঘমেয়াদে মানুষের শরীরে ক্যানসার, কিডনি জটিলতা, চর্মরোগ এবং শ্বাসতন্ত্রের নানা সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই পরিবেশ রক্ষায় প্রতিটি শিল্প কারখানায় ইটিপি নিশ্চিত করতে হবে।

যা বলছেন কারখানা মালিকরা

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জাগো নিউজকে বলেন, শিল্পকারখানার জন্য ইটিপি (এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, পরিবেশ রক্ষা এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকারগুলোর একটি। কোনো শিল্পকারখানায় ইটিপি না থাকলে বর্জ্য সরাসরি খাল, নদী ও জলাশয়ে গিয়ে পরিবেশ দূষণের কারণ হবে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিশেষ করে শিল্পবর্জ্যের কারণে পানিদূষণ ভয়াবহ আকার নিতে পারে। তাই যেসব শিল্প থেকে দূষিত বর্জ্য নিঃসরণ হয়, সেখানে ইটিপি অপরিহার্য।

তিনি বলেন, রপ্তানিমুখী অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ইটিপি স্থাপন ও পরিচালনা করছে। কিন্তু একই এলাকার অসংখ্য অন্য শিল্পকারখানা ইটিপি ছাড়াই দূষিত পানি একই খাল বা জলাশয়ে ফেলছে। এতে যারা পরিবেশ রক্ষায় বিনিয়োগ করছেন, তাদের উদ্যোগ কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়ছে। একটি প্রতিষ্ঠান ১০, ১৫ বা ২০ কোটি টাকা ব্যয় করে ইটিপি স্থাপন করলেও পাশের প্রতিষ্ঠান যদি কোনো ধরনের শোধন ছাড়াই বর্জ্য ফেলতে থাকে, তাহলে সামগ্রিকভাবে পরিবেশ দূষণ কমে না।

তিনি আরও বলেন, আমি দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয় ইটিপি ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছি। আমার প্রস্তাব হলো- সরকারের উদ্যোগে একটি কেন্দ্রীয় ইটিপি স্থাপন করা যেতে পারে, যেখানে বর্জ্য নিঃসরণকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো পাইপলাইনের মাধ্যমে তাদের বর্জ্য পানি সরবরাহ করবে। এরপর গ্যাস বা বিদ্যুতের বিলের মতো ব্যবহারের পরিমাণ অনুযায়ী মাসিক বিল পরিশোধ করবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক মিটার থাকবে, যেন কে কত পরিমাণ বর্জ্য পাঠাচ্ছে তা নির্ধারণ করা যায়।

হাতেম বলেন, এই পদ্ধতি চালু হলে ইটিপি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে এবং পরিবেশ দূষণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। একই সঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তর ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে নানা ধরনের জটিলতাও কমবে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ইটিপির বিভিন্ন মানদণ্ড- যেমন পিএইচ মাত্রা বা রাসায়নিক উপাদান নিয়ে প্রশ্ন তুলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সরকারের তত্ত্বাবধানে কেন্দ্রীয়ভাবে ইটিপি পরিচালিত হলে এ ধরনের সমস্যার সুযোগ কমে যাবে বলে মন্তব্য তার।

তিনি বলেন, দেশের মোট পোশাক কারখানার সবগুলোতে ইটিপি প্রয়োজন হয় না। প্রায় আড়াই হাজার গার্মেন্টস কারখানার মধ্যে সর্বোচ্চ ৩০০টির মতো কারখানায় ইটিপি প্রয়োজন হতে পারে। মূলত যেসব কম্পোজিট কারখানায় ডাইং, ওয়াশিং বা কিছু ক্ষেত্রে প্রিন্টিং কার্যক্রম রয়েছে, সেগুলোতেই ইটিপি অপরিহার্য। তবে বাস্তবে এসব কারখানার মধ্যেও অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো ইটিপি নেই। শুধু রপ্তানিমুখী শিল্প নয়, আরও অনেক ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে যেখানে ইটিপি থাকা প্রয়োজন, কিন্তু সেখানে এখনো কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

ইটিপি কী

ইটিপি হলো এমন একটি ব্যবস্থা বা প্ল্যান্ট, যেখানে কারখানা বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে বের হওয়া দূষিত পদার্থ পরিশোধন করা হয়, যেন তা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে না থাকে। বিশেষ করে টেক্সটাইল, ডাইং, ট্যানারি, ওষুধ, কাগজ, খাদ্য ও রাসায়নিক শিল্পে ইটিপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এসব কারখানা থেকে বের হওয়া পানিতে বিষাক্ত রাসায়নিক, রং, তেল, ভারী ধাতু ও ক্ষতিকর জীবাণু থাকতে পারে।

আরও পড়ুন

পরিশোধন ছাড়া শিল্পবর্জ্য নদী, খাল বা মাটিতে ফেললে পানি দূষিত হয়, মাছ ও জলজ প্রাণী মারা যায়, কৃষিজমির ক্ষতি হয়, মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়। বাংলাদেশে, বিশেষ করে টেক্সটাইল ও ট্যানারি শিল্পে ইটিপি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমোদন পেতে অধিকাংশ শিল্পকারখানায় ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক।

ইটিপি কীভাবে কাজ করে

ইটিপি সাধারণত কয়েকটি ধাপে কাজ করে। কারখানার বর্জ্য পানি প্রথমে একটি ট্যাংকে আনা হয়। এখানে বড় ময়লা, প্লাস্টিক, কাপড়ের টুকরা বা কঠিন বর্জ্য আলাদা করা হয়। এরপর ইকুয়ালাইজেশন ট্যাংক (সমতাকরণ ট্যাংক)-এ পানি জমিয়ে সব বর্জ্যকে একটি সমান অবস্থায় আনা হয়।

এরপর করা হয় রাসায়নিক শোধন। এ পর্যায়ে বিভিন্ন রাসায়নিক মিশিয়ে- রং কমানো, বিষাক্ত উপাদান আলাদা করা, তেল বা ভারী ধাতু জমাট বাঁধানোর কাজ করা হয়। সাধারণত চুন, অ্যালাম, পলিমার ইত্যাদি এ কাজে ব্যবহার করা হয়।

রাসায়নিক শোধনের পর করা হয় জৈবিক শোধন। এ ধাপে ব্যাকটেরিয়া বা অণুজীব ব্যবহার করে পানির জৈব দূষণ ভাঙা হয়। এটি দুইভাবে হতে পারে- অক্সিজেনসহ এবং অক্সিজেন ছাড়া। তরপর হয় পলি পৃথককরণ। এ পর্যায়ে দূষিত কণা ও কাদা নিচে জমে যায়। পরিষ্কার পানি উপরে উঠে আসে।

শেষ ধাপে বালি ফিল্টার, কার্বন ফিল্টার বা ক্লোরিন অথবা ইউভি ব্যবহার করে পানি আরও পরিষ্কার করা হয়। তারপর পরীক্ষা করে মান ঠিক থাকলে পানি নদী, ড্রেন বা পুনঃব্যবহারের জন্য ছাড়া হয়।

ইটিপির প্রধান অংশগুলোর মধ্যে রয়েছে- ছাঁকনি কক্ষ, সমতাকরণ ট্যাংক, রাসায়নিক ট্যাংক, বায়ুকরণ ট্যাংক, পলি পৃথকীকরণ ট্যাংক, পরিশোধন ইউনিট, কাদা শুকানোর বেড।

ইটিপির ধারণা কীভাবে এলো

১৮ ও ১৯ শতকে ইউরোপে শিল্প বিপ্লবের পর বড় বড় কারখানা গড়ে ওঠে। তখন কারখানার বর্জ্য সরাসরি নদী-খাল ও জলাশয়ে ফেলা হতো। ফলে- নদীর পানি দূষিত হতে থাকে, মাছ ও জলজ প্রাণী মারা যায়, পানিবাহিত রোগ বাড়ে এবং দুর্গন্ধ ও পরিবেশ বিপর্যয় দেখা দেয়।

বিশেষ করে ইংল্যান্ডের লন্ডনে টেমস নদীর ভয়াবহ দূষণ এবং ইউরোপ-আমেরিকায় কলেরা ও টাইফয়েডের মতো রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর সরকার ও বিজ্ঞানীরা বর্জ্য পরিশোধনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।

প্রথম দিকে শুধু বড় ময়লা আলাদা করা, পলি বসিয়ে পানি পরিষ্কার করা, সহজ ফিল্টার ব্যবহার এসব পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো। পরে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন, শুধু ময়লা সরালেই হবে না, পানিতে থাকা রাসায়নিক ও বিষাক্ত উপাদানও অপসারণ করতে হবে।

আধুনিক ইটিপির বিকাশ

২০ শতকে রাসায়নিক ও জীববৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির উন্নতির ফলে আধুনিক ইটিপি তৈরি হয়। এতে যোগ হয়- রাসায়নিক শোধন, ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে জৈব দূষণ অপসারণ, ফিল্টার ও জীবাণুমুক্তকরণ ব্যবস্থা, স্লাজ ব্যবস্থাপনা। বিশেষ করে টেক্সটাইল, ট্যানারি, কাগজ, ওষুধ ও রাসায়নিক শিল্প বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ইটিপির ব্যবহার দ্রুত বাড়ে।

বাংলাদেশে ইটিপির ব্যবহার

বাংলাদেশে শিল্পকারখানা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীদূষণও বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও তুরাগ নদীর দূষণ বড় সমস্যা হয়ে ওঠে। এরপর পরিবেশ অধিদপ্তর শিল্পকারখানায় ইটিপি বাধ্যতামূলক করতে শুরু করে। বর্তমানে টেক্সটাইল ও ট্যানারি শিল্পে ইটিপি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।

এমএএস/এএমএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow