বিয়ে বিতর্কে নাসির-তামিমার জয়, উচ্চ আদালতে যাবেন রাকিব

ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তার স্ত্রী তামিমা সুলতানা তাম্মিকে ঘিরে আলোচিত বিয়ে-সংক্রান্ত মামলায় উভয় আসামিকে খালাস দিয়েছেন আদালত। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছরের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে বুধবার (১০ জুন) ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এ রায় ঘোষণা করেন। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত নাসির হোসেন ও তামিমা সুলতানা তাম্মিকে বেকসুর খালাস দেন। রায় ঘোষণার পর আদালতপাড়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একদিকে আসামিপক্ষ এ রায়কে ন্যায়বিচারের প্রতিফলন হিসেবে অভিহিত করেছে, অন্যদিকে বাদীপক্ষ এ রায়ে অসন্তোষ জানিয়ে উচ্চ আদালতে আপিলের ঘোষণা দিয়েছে। আরও পড়ুন বিয়ে বিতর্ক: খালাস পেলেন নাসির-তামিমা আদালত প্রাঙ্গণে দেখা যায়, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে একটি মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। পরে দুই পক্ষের আইনজীবীরা আদালতে পৌঁছান। বেলা ১১টা ৪৮ মিনিটে নাসির হোসেন ও তামিমা সুলতানা তাম্মি এজলাসে প্রবেশ করেন। রায় ঘোষণা শেষে দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটের দিকে তারা আদালত ভবন থেকে বের হয়ে যান। এ সময় আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত কয়েকজনকে তাদের উদ্দেশে দুয়োধ্বনি দিতে দেখা যায়। আদালতে উপস্থিত ছি

বিয়ে বিতর্কে নাসির-তামিমার জয়, উচ্চ আদালতে যাবেন রাকিব

ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তার স্ত্রী তামিমা সুলতানা তাম্মিকে ঘিরে আলোচিত বিয়ে-সংক্রান্ত মামলায় উভয় আসামিকে খালাস দিয়েছেন আদালত। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছরের বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে বুধবার (১০ জুন) ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলাম এ রায় ঘোষণা করেন।

অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় আদালত নাসির হোসেন ও তামিমা সুলতানা তাম্মিকে বেকসুর খালাস দেন। রায় ঘোষণার পর আদালতপাড়ায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একদিকে আসামিপক্ষ এ রায়কে ন্যায়বিচারের প্রতিফলন হিসেবে অভিহিত করেছে, অন্যদিকে বাদীপক্ষ এ রায়ে অসন্তোষ জানিয়ে উচ্চ আদালতে আপিলের ঘোষণা দিয়েছে।

আদালত প্রাঙ্গণে দেখা যায়, সকাল সাড়ে ১১টার দিকে একটি মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। পরে দুই পক্ষের আইনজীবীরা আদালতে পৌঁছান। বেলা ১১টা ৪৮ মিনিটে নাসির হোসেন ও তামিমা সুলতানা তাম্মি এজলাসে প্রবেশ করেন। রায় ঘোষণা শেষে দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটের দিকে তারা আদালত ভবন থেকে বের হয়ে যান। এ সময় আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত কয়েকজনকে তাদের উদ্দেশে দুয়োধ্বনি দিতে দেখা যায়।

jagonews24আদালতে উপস্থিত ছিলেন নাসির-তামিমা দম্পতি-ছবি জাগো নিউজ

রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তার স্ত্রী তামিমা আদালতে উপস্থিত হলে সেখানে বিপুল সংখ্যক গণমাধ্যমকর্মীর উপস্থিতি দেখা যায়। সকাল থেকেই বিভিন্ন টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও অনলাইন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা আদালত চত্বরে অবস্থান নেন।

ডিভোর্স জালিয়াতি, পরকীয়া ও ব্যভিচার রোধে নাসির হোসেন ও তামিমা সুলতানার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন ছিল। একই সঙ্গে অপরাধের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমান শাস্তির বিধান রেখে লিঙ্গনিরপেক্ষ আইন প্রণয়নের দাবি জানান তিনি।

এ সময় আদালতের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়। ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং আদালতের প্রবেশপথ সচল রাখতে গণমাধ্যমকর্মীদের সরিয়ে দিতে পুলিশকে বেশ কঠোর অবস্থানে দেখা যায়। কয়েক দফায় সাংবাদিক ও ক্যামেরাপারসনদের নির্ধারিত স্থানে অবস্থান নিতে অনুরোধ করা হয়।

তবে আদালতে উপস্থিতি ও রায় ঘোষণার পরও নাসির-তামিমা দম্পতি গণমাধ্যমের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগের সময়ও তারা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে যান।

যে অভিযোগে মামলা

মামলাটি করেছিলেন তামিমা সুলতানার সাবেক স্বামী দাবি করা রাকিব হোসেন। তার অভিযোগ ছিল, তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক আইনগতভাবে শেষ হওয়ার আগেই তামিমা ক্রিকেটার নাসির হোসেনকে বিয়ে করেন।

আদালতের এ রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে তামিমা সুলতানা যথাযথভাবে তালাক প্রদান করেছিলেন এবং পরবর্তীতে ইসলামি শরিয়ত ও প্রচলিত আইন অনুসারে নাসির হোসেনকে বৈধভাবে বিয়ে করেন।

মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তামিমা সুলতানা তাম্মির সঙ্গে রাকিব হোসেনের বিয়ে হয় এবং তাদের একটি কন্যাসন্তান রয়েছে। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাসির ও তামিমার বিয়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর বিষয়টি আলোচনায় আসে। পরে একই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলা দায়ের করেন রাকিব।

তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া

মামলার তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তদন্ত কর্মকর্তা শেখ মিজানুর রহমান আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে নাসির হোসেন, তামিমা সুলতানা তাম্মি এবং তামিমার মা সুমি আক্তারকে অভিযুক্ত করা হয়। পরে ২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আদালত নাসির ও তামিমার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন। তবে তামিমার মা সুমি আক্তারকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

২০১৬ সালে তামিমা সুলতানা রাকিবকে তালাক দেওয়ার পর সৌদি আরব যাওয়ার আগে বা পরে কতদিন বাংলাদেশে ছিলেন, সে বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা কিংবা সাক্ষীরা সুস্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। ফলে অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণ আদালতের সামনে উপস্থাপিত হয়নি।

আসামিপক্ষের রিভিশন (নথিপত্র পর্যালোচনা) আবেদন ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি খারিজ হয়ে গেলে একই বছরের ২০ মার্চ সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। মামলায় মোট ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়। ২০২৫ সালের ১৬ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর চলতি বছরের মার্চে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। পরে তামিমা নিজের পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন। গত ৬ মে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে আদালত ১০ জুন রায়ের দিন ধার্য করেন।

আদালতে কী বললেন আসামিপক্ষের আইনজীবী

রায় ঘোষণার পর নাসির হোসেনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু গণমাধ্যমকে বলেন, বাদীপক্ষ আদালতে আনা অভিযোগ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় নাসির ও তামিমা বেকসুর খালাস পেয়েছেন। আদালত মনে করেছেন নাসির হোসেন ও তামিমা সুলতানার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। এ কারণেই আদালত তাদের খালাস দিয়েছেন।

jagonews24নাসির হোসেনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান-ছবি জাগো নিউজ

তার দাবি, আদালতের এ রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে যে তামিমা সুলতানা যথাযথভাবে তালাক প্রদান করেছিলেন এবং পরবর্তীতে ইসলামি শরিয়ত ও প্রচলিত আইন অনুসারে নাসির হোসেনকে বৈধভাবে বিয়ে করেন।

রায়ের আইনি ভিত্তি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, উচ্চ আদালতের একটি রায়ের পর্যবেক্ষণ উল্লেখ করে বিচারিক আদালত বলেছেন, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের কাছে তালাকের নোটিশ না পৌঁছানো মানেই তালাক কার্যকর হয়নি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। আপিল বিভাগের ওই রায়ের আলোকে স্বামী-স্ত্রীর আচরণ ও পারিবারিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।

টাকা যার আছে, ক্ষমতা যার আছে, পাওয়ার যার আছে তারই বিচার আছে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে কোনো বিচার নেই।-রাকিব

তার ভাষ্য, ২০১৬ সালে তামিমা সুলতানা রাকিবকে তালাক দেওয়ার পর সৌদি আরব যাওয়ার আগে বা পরে কতদিন বাংলাদেশে ছিলেন, সে বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা কিংবা সাক্ষীরা সুস্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি। ফলে অভিযোগের পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণ আদালতের সামনে উপস্থাপিত হয়নি।

রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি বলেন, একজন জাতীয় ক্রিকেটার হিসেবে নাসির হোসেনকে বিভিন্ন গণমাধ্যম যেভাবে উপস্থাপন করেছে, আজকের রায়ের পর বিষয়টি নতুন করে মূল্যায়ন করা উচিত।

বাদীপক্ষের আইনজীবীর আপত্তি

অন্যদিকে বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে বলেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও আদালত সাক্ষ্য-প্রমাণের যথাযথ মূল্যায়ন করেননি।

jagonews24আইনজীবী অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান-ছবি জাগো নিউজ

তিনি দাবি করেন, দীর্ঘ ছয় মাস তদন্ত শেষে পিবিআই অভিযোগের সত্যতা পেয়েছিল। তদন্তে উঠে এসেছে যে তামিমা সুলতানা বৈধভাবে বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন না করেই নতুন বিয়ে করেছেন এবং ডিভোর্সসংক্রান্ত কিছু নথি জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ডাক বিভাগের মতামতেও কিছু ডাক রসিদকে প্রকৃত ডাক বিভাগের রসিদ নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন।

ইশরাত হাসান বলেন, নাসির হোসেন নিজেই বাদীকে ফোন করে সবকিছু জেনেশুনে বিয়ে করার কথা বলেছেন এবং তামিমাও জেরার সময় কিছু বিষয় স্বীকার করেছেন। এসব সাক্ষ্য-প্রমাণ আদালতে উপস্থাপন করা হলেও রায়ে সেগুলোর পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। লিখিত রায়ের অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।

বাদীর প্রতিক্রিয়া

রায়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন মামলার বাদী রাকিব হাসান। আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি দাবি করেন, মামলায় পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও নথি আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছিল।

রাকিব বলেন, ‘নাসির আমাকে ফোন দিয়ে বলেছিল, সবকিছু জেনে-শুনেই সে বিয়ে করছে। আমরা যথাযথ প্রমাণ আদালতে জমা দিয়েছি। অনেক এভিডেন্স (প্রমাণ) দিয়েছি, রিপোর্টও ছিল। এরপরও যদি বাংলাদেশে ন্যায়বিচার না পাওয়া যায়, তাহলে আর কোথায় পাওয়া যাবে?’

jagonews24মামলার বাদী রাকিব হাসান

তিনি আরও বলেন, ‘টাকা যার আছে, ক্ষমতা যার আছে, পাওয়ার যার আছে তারই বিচার আছে। আমাদের মতো সাধারণ মানুষের পক্ষে কোনো বিচার নেই।’

পরে তিনি জানান, রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে।

রায়ের আগে আদালত প্রাঙ্গণে মানববন্ধন

রায় ঘোষণার আগে বুধবার সকালে আদালত প্রাঙ্গণে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে ‘এইড ফর মেন ফাউন্ডেশন’।

jagonews24এইড ফর মেন ফাউন্ডেশনের মানববন্ধন-ছবি জাগো নিউজ

সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম নাবিল বলেন, ডিভোর্স জালিয়াতি, পরকীয়া ও ব্যভিচার রোধে নাসির হোসেন ও তামিমা সুলতানার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া প্রয়োজন ছিল। একই সঙ্গে অপরাধের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য সমান শাস্তির বিধান রেখে লিঙ্গনিরপেক্ষ আইন প্রণয়নের দাবি জানান তিনি।

তার ভাষ্য, বহু প্রবাসী পুরুষ সংগঠনের কাছে অভিযোগ করেন যে, তাদের স্ত্রী যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় বিবাহবিচ্ছেদ সম্পন্ন না করেই অন্যত্র বিয়ে করছেন। এ ধরনের ঘটনায় ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

এরপরে কী?

দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে দেওয়া এ রায়ের মধ্য দিয়ে বহুল আলোচিত মামলার বিচারিক অধ্যায়ের একটি ধাপ শেষ হলেও, বাদীপক্ষের আপিলের ঘোষণার কারণে বিষয়টি উচ্চ আদালতে নতুন মোড় নিতে পারে।

এমডিএএ/এসএইচএস

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow