ভারসাম্যপূর্ণ বিনিয়োগ কৌশল : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রবৃদ্ধির ধারাকে ধরে রাখা যেমন জরুরি, তেমনি সেই প্রবৃদ্ধিকে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ঝুঁকিমুক্ত করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ কথা অস্বীকার করার কোনো জো নেই, গত এক দশকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রপ্তানির সম্প্রসারণ এবং দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে মোটামুটি সাফল্যও অর্জিত হয়েছে। এই সাফল্যের পেছনে যে বিনিয়োগ কাঠামো কাজ করেছে, বর্তমান বাস্তবতায় তা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট পথ নির্দেশনা দিচ্ছে যে, শুধু বৃহৎ বিনিয়োগ বা মেগা প্রকল্পনির্ভর উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না। এই প্রেক্ষাপটে ভারসাম্যপূর্ণ বিনিয়োগ কৌশল (Balanced Investment Strategy) বাংলাদেশের জন্য যেমন সময়োপযোগী তেমনি অপরিহার্যও বটে। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দ্রুত প্রবৃদ্ধি এবং সীমিত খাতনির্ভরতা। তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট রপ্তানির সিংহভাগ জোগান দেয়, যা একদিকে শক্তি হলেও অন্যদিকে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। একইভা

ভারসাম্যপূর্ণ বিনিয়োগ কৌশল : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রবৃদ্ধির ধারাকে ধরে রাখা যেমন জরুরি, তেমনি সেই প্রবৃদ্ধিকে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং ঝুঁকিমুক্ত করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ কথা অস্বীকার করার কোনো জো নেই, গত এক দশকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। উচ্চ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রপ্তানির সম্প্রসারণ এবং দারিদ্র্য হ্রাসের ক্ষেত্রে মোটামুটি সাফল্যও অর্জিত হয়েছে। এই সাফল্যের পেছনে যে বিনিয়োগ কাঠামো কাজ করেছে, বর্তমান বাস্তবতায় তা পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। কারণ, বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট পথ নির্দেশনা দিচ্ছে যে, শুধু বৃহৎ বিনিয়োগ বা মেগা প্রকল্পনির্ভর উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না। এই প্রেক্ষাপটে ভারসাম্যপূর্ণ বিনিয়োগ কৌশল (Balanced Investment Strategy) বাংলাদেশের জন্য যেমন সময়োপযোগী তেমনি অপরিহার্যও বটে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো দ্রুত প্রবৃদ্ধি এবং সীমিত খাতনির্ভরতা। তৈরি পোশাক খাত দেশের মোট রপ্তানির সিংহভাগ জোগান দেয়, যা একদিকে শক্তি হলেও অন্যদিকে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। একইভাবে, বড় অবকাঠামো প্রকল্প যেমন সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র ইত্যাদি দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এগুলোর জন্য বিপুল পরিমাণ ঋণ ও বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়েছে। ফলে ঋণচাপ বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং আর্থিক খাতের ঝুঁকি বাড়ছে।

অন্যদিকে, দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (SME) খাত এখনো পুরোপুরি বিকশিত হয়নি। যদিও এই খাত কর্মসংস্থানের বড় উৎস, কিন্তু অর্থায়ন, প্রযুক্তি এবং বাজারসংযোগের অভাবে এর সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য আনার জন্যই Balanced Investment Strategy খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

Balanced Investment Strategy বলতে এমন একটি বিনিয়োগ কাঠামোর কথা বোঝাতে চাই, যেখানে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে, বিভিন্ন আকারের (বৃহৎ, মাঝারি ও ক্ষুদ্র) এবং বিভিন্ন অঞ্চলে সমন্বিতভাবে বিনিয়োগ বণ্টন করা সম্ভব হয়। এর লক্ষ্য হলো, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা, ঝুঁকি হ্রাস করা, আয় বৈষম্য কমানো, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করা এবং আঞ্চলিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা।

এটি মূলত একক খাত বা একক ধরনের বিনিয়োগের উপর নির্ভরতা কমিয়ে একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হবে।

একটি কথা এখানে স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের উন্নয়নে বৃহৎ বিনিয়োগের গুরুত্ব অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সড়ক ও রেল যোগাযোগ, সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন—এসব খাতে বড় বিনিয়োগ ছাড়া শিল্পায়ন সম্ভব নয়। বড় প্রকল্পগুলো অর্থনীতির জন্য ‘ফাউন্ডেশন’ তৈরি করে।

তবে এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে—

প্রথমত, বড় প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন হয়, যা প্রায়ই বিদেশি ঋণের মাধ্যমে সংগ্রহ করতে হয়। ফলে ঋণনির্ভরতা বাড়ে।
দ্বিতীয়ত, এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় বেশি লাগে এবং বিলম্ব বা ব্যয় বৃদ্ধি হলে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়।
তৃতীয়ত, বড় শিল্পে প্রযুক্তিনির্ভরতা বেশি হওয়ায় কর্মসংস্থান তুলনামূলকভাবে কম সৃষ্টি হয়।
চতুর্থত, বৃহৎ বিনিয়োগ প্রায়ই কিছু গোষ্ঠীর হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত করে, যা আয় বৈষম্য সৃষ্টি করে।

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (SME) খাতকে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি হিসেবে গণ্য করা যায়। এই খাতটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় একটি ক্ষেত্র। এই খাতের বৈশিষ্ট্য হলো যথাক্রমে এক. স্বল্প পুঁজিতে ব্যবসা শুরু করা যায়। দুই. দ্রুত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। তিন. স্থানীয় সম্পদ ও দক্ষতার ব্যবহার হয়। চার. গ্রামীণ অর্থনীতি সক্রিয় হয়। পাঁচ. নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ বাড়ে

যদি এই খাতকে যথাযথ সহায়তা দেওয়া যায়, তবে এটি অর্থনীতির ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে পারে এবং প্রবৃদ্ধিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তুলতে পারে।

খাতভিত্তিক বৈচিত্র্য ঝুঁকি কমানোর মূল চাবিকাঠি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বাংলাদেশের রপ্তানি কাঠামো এখনো একমুখী। তৈরি পোশাক খাতের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা অর্থনীতিকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। তাই Balanced Investment Strategy-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো খাতভিত্তিক বৈচিত্র্য আনা।

সম্ভাবনাময় খাতগুলো হলো : এক. তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল সেবা। দুই. কৃষিভিত্তিক শিল্প ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ। তিন. ফার্মাসিউটিক্যালস। চার. লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং। পাঁচ. ব্লু ইকোনমি।

এই খাতগুলোতে বিনিয়োগ বাড়ানো হলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং রপ্তানি আয় বৈচিত্র্যময় হবে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বাংলাদেশের উন্নয়ন এখনো অনেকাংশে ঢাকাকেন্দ্রিক। ফলে গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে উন্নয়নের সুযোগ সীমিত। Balanced Investment Strategy-এর মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক অঞ্চল বিস্তার এবং গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন করা যেতে পারে। এসব প্রক্রিয়ায় আঞ্চলিক বৈষম্য কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে মনে করি।

SME খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অর্থায়ন। ব্যাংকগুলো সাধারণত বড় শিল্পকে বেশি ঋণ দিতে আগ্রহী, কারণ সেখানে জামানত ও নিরাপত্তা বেশি। অন্যদিকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা জামানতের অভাবে ঋণ পান না, উচ্চ সুদের কারণে নিরুৎসাহিত হন এবং জটিল প্রক্রিয়ার কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থেকে যান।এছাড়া ঋণখেলাপি ও দুর্নীতি ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করে তুলছে, যা বিনিয়োগ পরিবেশকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।

Balanced Investment Strategy বাস্তবায়নের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি—

প্রথমত, SME খাতের জন্য সহজ ও সাশ্রয়ী অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষায়িত ব্যাংকিং ব্যবস্থা, স্বল্প সুদের ঋণ এবং জামানতবিহীন অর্থায়ন চালু করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, বৃহৎ প্রকল্পে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অপচয় ও দুর্নীতি কমে।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম উন্নয়ন এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের মাধ্যমে SME খাতকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

চতুর্থত, রপ্তানি বৈচিত্র্য আনতে প্রণোদনা দিতে হবে এবং নতুন বাজার অনুসন্ধান করতে হবে।

পঞ্চমত, আঞ্চলিক উন্নয়নের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন জোরদার করতে হবে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের উন্নত অর্থনীতিগুলো Balanced Investment Strategy অনুসরণ করে সফল হয়েছে। জার্মানির Mittelstand মডেল ছোট ও মাঝারি শিল্পকে অর্থনীতির কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। দক্ষিণ কোরিয়া বড় শিল্প ও SME খাতের মধ্যে সমন্বয় তৈরি করেছে। চীন গ্রামীণ শিল্পায়নের মাধ্যমে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করেছে।

বাংলাদেশ এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কৌশল তৈরি করতে পারে।

ভবিষ্যতের বাংলাদেশে একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি হবে এমন—যেখানে বড় প্রকল্প অবকাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করবে, SME খাত অর্থনীতিকে গতিশীল রাখবে, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে এবং এভাবে ক্রমান্বয়ে আঞ্চলিক বৈষম্য কমে আসবে।
Balanced Investment Strategy এই লক্ষ্য অর্জনের একটি কার্যকর পথ।

এই কথা দ্বিধাহীন চিত্তে বলা যায়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে টেকসই ও স্থিতিশীল করতে হলে এখনই বিনিয়োগ কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। শুধুমাত্র বৃহৎ বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। আবার শুধুমাত্র ক্ষুদ্র উদ্যোগ দিয়ে বৃহৎ অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব নয়।

অতএব, একটি ভারসাম্যপূর্ণ, বহুমুখী এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বিনিয়োগ কৌশল গ্রহণ করাই সময়ের দাবি। এই কৌশল বাস্তবায়ন করতে পারলে বাংলাদেশ শুধু প্রবৃদ্ধির ধারাই বজায় রাখতে পারবে না, বরং একটি শক্তিশালী, বৈচিত্র্যময় এবং টেকসই অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারবে।

মো. মুখলেছুর রহমান,

(ইসলামী অর্থনীতিবিদ, ও সমাজ চিন্তক)

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow