ভয় নয়, আতঙ্কই নষ্ট করছে মানসিক শান্তি
প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে মানুষ এখন যেন দৌড়ের ওপর বেঁচে আছে। সময়মতো অফিসে পৌঁছানো, সংসারের চাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তুলনা, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা-সব মিলিয়ে অজান্তেই মানুষের মনে জমে উঠছে উদ্বেগ আর আতঙ্ক। বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভেতরে অসংখ্য মানুষ লড়ছেন এক অদৃশ্য মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে। আজ ১৮ জুন, আন্তর্জাতিক আতঙ্ক দিবস। নাম শুনে মনে হতে পারে এটি ভয় বা আতঙ্ক উদযাপনের দিন। কিন্তু বাস্তবে এই দিবসের উদ্দেশ্য ঠিক উল্টো। মানুষকে আতঙ্ক থেকে মুক্তির বার্তা দেওয়া, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং ভয়কে স্বাভাবিকভাবে বুঝতে শেখানো। আরও পড়ুন বিশ্ব থাইরয়েড দিবস / শিক্ষা ও সচেতনতাই পারে থাইরয়েড ঝুঁকি কমাতে আতঙ্ক-শুধু ভয় নয়, শরীর ও মনের সংকেত অনেকেই মনে করেন আতঙ্ক মানেই দুর্বলতা। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, আতঙ্ক মানুষের স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়ার একটি অংশ। কোনো বিপদ, অনিশ্চয়তা বা অতিরিক্ত চাপের মুখে শরীর ও মস্তিষ্ক এক ধরনের সতর্ক সংকেত পাঠায়। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই আতঙ্ক অকারণে ঘন ঘন ফিরে আসে কিংবা দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করতে শুরু করে। হঠাৎ বুক ধড়ফড় করা, নিঃশ্বাস
প্রতিদিনের ব্যস্ত জীবনে মানুষ এখন যেন দৌড়ের ওপর বেঁচে আছে। সময়মতো অফিসে পৌঁছানো, সংসারের চাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তুলনা, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা-সব মিলিয়ে অজান্তেই মানুষের মনে জমে উঠছে উদ্বেগ আর আতঙ্ক। বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখালেও ভেতরে ভেতরে অসংখ্য মানুষ লড়ছেন এক অদৃশ্য মানসিক যন্ত্রণার সঙ্গে।
আজ ১৮ জুন, আন্তর্জাতিক আতঙ্ক দিবস। নাম শুনে মনে হতে পারে এটি ভয় বা আতঙ্ক উদযাপনের দিন। কিন্তু বাস্তবে এই দিবসের উদ্দেশ্য ঠিক উল্টো। মানুষকে আতঙ্ক থেকে মুক্তির বার্তা দেওয়া, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং ভয়কে স্বাভাবিকভাবে বুঝতে শেখানো।
আতঙ্ক-শুধু ভয় নয়, শরীর ও মনের সংকেত
অনেকেই মনে করেন আতঙ্ক মানেই দুর্বলতা। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, আতঙ্ক মানুষের স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়ার একটি অংশ। কোনো বিপদ, অনিশ্চয়তা বা অতিরিক্ত চাপের মুখে শরীর ও মস্তিষ্ক এক ধরনের সতর্ক সংকেত পাঠায়। সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন এই আতঙ্ক অকারণে ঘন ঘন ফিরে আসে কিংবা দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করতে শুরু করে।
হঠাৎ বুক ধড়ফড় করা, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, হাত-পা কাঁপা, অস্বস্তি বা অজানা ভয়-এসবই প্যানিক অ্যাটাকের লক্ষণ হতে পারে। অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারেন না যে তিনি মানসিক সমস্যার মধ্যে আছেন। বরং মনে করেন শারীরিক কোনো জটিলতা হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় ২ শতাংশ মানুষ প্যানিক ডিসঅর্ডারে ভোগেন বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। নারীদের মধ্যে এই সমস্যা তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। তবে শিশু, কিশোর, তরুণ কিংবা বয়স্ক-যে কেউ আতঙ্কজনিত সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারেন।
আধুনিক জীবনের অদৃশ্য চাপ
একসময় মানুষের আতঙ্কের কারণ ছিল যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ কিংবা রোগব্যাধি। এখন আতঙ্কের ধরন বদলেছে। আজকের মানুষ আতঙ্কিত হন চাকরি হারানোর ভয়, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা, সামাজিক ব্যর্থতা কিংবা অনলাইনে নিজেকে প্রমাণ করতে না পারার কারণে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও মানুষের মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে। অন্যের সাজানো জীবন দেখে নিজের জীবনকে ব্যর্থ মনে করার প্রবণতা বাড়ছে। সারাক্ষণ অনলাইনে থাকা, নোটিফিকেশনের শব্দ, তথ্যের অতিরিক্ত চাপ-সব মিলিয়ে মানুষের মস্তিষ্ক যেন বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।
বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে ‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা পিছিয়ে পড়ার ভয় ব্যাপকভাবে দেখা যাচ্ছে। তারা সবসময় মনে করেন, অন্যরা হয়তো তাদের চেয়ে বেশি সফল, বেশি জনপ্রিয় কিংবা বেশি সুখী। এই তুলনা ধীরে ধীরে জন্ম দেয় উদ্বেগ, হতাশা ও আতঙ্কের।
মানসিক রোগ নিয়ে লজ্জা কেন?
শরীরে ব্যথা হলে আমরা চিকিৎসকের কাছে যাই। কিন্তু মনের ভেতরে ভয়, অস্থিরতা বা বিষণ্নতা তৈরি হলে অনেকেই তা লুকিয়ে রাখেন। সমাজে এখনো মানসিক রোগ নিয়ে নানা ভুল ধারণা আছে। কেউ চিকিৎসকের কাছে গেলে তাকে ‘পাগল’ ভাবা হবে-এই ভয়ও কাজ করে অনেকের মধ্যে।
ফলে অসংখ্য মানুষ নীরবে কষ্ট সহ্য করেন। অথচ মানসিক সমস্যার চিকিৎসাও অন্য সব রোগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং পেলে একজন মানুষ স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতে পারেন।
আতঙ্ককে জয় করার উপায়
- পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা
- নিয়মিত শরীরচর্চা করা
- অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কমানো
- নিজের অনুভূতি কাছের মানুষের সঙ্গে ভাগাভাগি করা
- ধ্যান বা মেডিটেশন করা
- ক্যাফেইন ও অতিরিক্ত মানসিক চাপ এড়িয়ে চলা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের মানসিক অবস্থাকে অস্বীকার না করা। ভয় লাগলে, আতঙ্ক তৈরি হলে বা দীর্ঘদিন অস্থিরতা অনুভব করলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
আতঙ্কের ইতিহাসও বেশ পুরোনো
মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার ইতিহাসে উদ্বেগ ও আতঙ্ক নতুন কোনো বিষয় নয়। ১৮৪৯ সালে অটোমার ডমরিচ প্রথম উদ্বেগ আক্রমণের বিষয়ে রিপোর্ট করেন। পরে ১৮৯৫ সালে সিগমুন্ড ফ্রয়েড উদ্বেগ নিউরোসিস নিয়ে গবেষণা করেন এবং মানসিক বিশ্লেষণের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন।
১৯৮০ সালে ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল ম্যানুয়াল বা ডিএসএম-এ প্যানিক ডিসঅর্ডারকে আনুষ্ঠানিকভাবে মানসিক রোগ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর থেকে বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা ও সচেতনতা আরও বৃদ্ধি পায়।
ভয় নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা
আতঙ্কে ভোগা মানুষকে দুর্বল ভাবার সুযোগ নেই। তারা প্রতিদিন নিজের সঙ্গে লড়াই করেন। হয়তো বাইরে হাসছেন, কাজ করছেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সামলাচ্ছেন অদৃশ্য ঝড়।
আন্তর্জাতিক আতঙ্ক দিবস তাই শুধু একটি দিবস নয়, বরং মানুষকে মনে করিয়ে দেওয়ার দিন-মানসিক স্বাস্থ্যও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভয়কে লুকিয়ে না রেখে, সাহায্য চাইতে শেখা এবং অন্যের মানসিক অবস্থাকে সম্মান করা এখন সময়ের দাবি। কারণ সুস্থ সমাজ গড়তে শুধু শারীরিক নয়, মানসিক সুস্থতাও জরুরি।
জেএস/
What's Your Reaction?




