মাকে নিয়ে লেখা: অমীমাংসিত কষ্ট
অভিলাষ মাহমুদ ২০২৫ সালের জুলাইয়ের শেষদিক থেকে অক্টোবরের ১১ তারিখ পর্যন্ত আমাদের দিন কেটেছে চমেক হাসপাতালের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে। মাঝেমধ্যে আম্মুকে বাসায় আনা হয়েছিলো, হয়তো তিন কিংবা চারবার। কিন্তু ততদিনে জীবন যেন ছোট ছোট অস্থিরতায় ভরে উঠেছে। মামুনের ফোন হারানো, সাইকেল চুরি, সংসারের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে আমরা আর আম্মুকে স্বস্তির একটা সময় দিতে পারিনি। আম্মুর ইচ্ছে ছিলো ছোট ছেলের বউকে বাসায় এনে নিজের হাতে সেবা করবেন। সেই ইচ্ছে অপূর্ণই রয়ে গেল। নাতি কালফানকে দেখতে চেয়েছিলেন, সেটাও আর হয়ে ওঠেনি। মানুষের জীবনে কিছু না-পারা থেকে যায়, পরে সেগুলোই বুকের ভেতর নিঃশব্দ কষ্ট হয়ে বেঁচে থাকে। কিডনি বিভাগের ভেতরে, যাওয়ার পথের বাঁপাশে থাকা সেই বিছানাটা এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে। ঘড়ির কাঁটা তখন পৌনে চারটার দিকে। আম্মুর চোখ বন্ধ ছিল। কিন্তু আব্বু কাছে আসতেই তিনি যেন বুঝতে পারলেন। যদিও চোখ খোলেননি তখনো। আমি আম্মুকে আমার কোল থেকে আব্বুর কোলে তুলে দিলাম। আম্মু আব্বুর কোলে মাথা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই সবকিছু কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। চারদিকে মানুষের কলরব, তবুও মনে হলো তখন খুব শান্তভাবে, কোনো শব্দ ছাড়া, আব্বুর কোলে মাথা রাখার সাথ
অভিলাষ মাহমুদ
২০২৫ সালের জুলাইয়ের শেষদিক থেকে অক্টোবরের ১১ তারিখ পর্যন্ত আমাদের দিন কেটেছে চমেক হাসপাতালের ১৭ নম্বর ওয়ার্ডে। মাঝেমধ্যে আম্মুকে বাসায় আনা হয়েছিলো, হয়তো তিন কিংবা চারবার। কিন্তু ততদিনে জীবন যেন ছোট ছোট অস্থিরতায় ভরে উঠেছে। মামুনের ফোন হারানো, সাইকেল চুরি, সংসারের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে আমরা আর আম্মুকে স্বস্তির একটা সময় দিতে পারিনি।
আম্মুর ইচ্ছে ছিলো ছোট ছেলের বউকে বাসায় এনে নিজের হাতে সেবা করবেন। সেই ইচ্ছে অপূর্ণই রয়ে গেল। নাতি কালফানকে দেখতে চেয়েছিলেন, সেটাও আর হয়ে ওঠেনি। মানুষের জীবনে কিছু না-পারা থেকে যায়, পরে সেগুলোই বুকের ভেতর নিঃশব্দ কষ্ট হয়ে বেঁচে থাকে।
কিডনি বিভাগের ভেতরে, যাওয়ার পথের বাঁপাশে থাকা সেই বিছানাটা এখনো স্পষ্ট মনে পড়ে। ঘড়ির কাঁটা তখন পৌনে চারটার দিকে। আম্মুর চোখ বন্ধ ছিল। কিন্তু আব্বু কাছে আসতেই তিনি যেন বুঝতে পারলেন। যদিও চোখ খোলেননি তখনো।
আমি আম্মুকে আমার কোল থেকে আব্বুর কোলে তুলে দিলাম। আম্মু আব্বুর কোলে মাথা রাখার সঙ্গে সঙ্গেই সবকিছু কেমন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। চারদিকে মানুষের কলরব, তবুও মনে হলো তখন খুব শান্তভাবে, কোনো শব্দ ছাড়া, আব্বুর কোলে মাথা রাখার সাথে সাথেই আচমকা উড়ে গেল আম্মুর প্রাণপাখি। মনে হয়েছিল, দীর্ঘ জীবনের সমস্ত ক্লান্তি শেষে তিনি সবচেয়ে আপন জায়গাতেই আশ্রয় নিলেন।
ছোট বোন আম্মুর শারমিন পাশে বসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল। মেজ ভাই ফায়সাল পাশে ছিল না তখন। মামুন ডিউটিতে, তার স্ত্রী কালফানের আম্মু বাপের বাড়িতে, ডিসেম্বরের দিকে কালফান ধরণীর মেহমান হবে। তখনো নাম কী রাখা হবে তার সিদ্ধান্ত হয়নি, আমার বিবি শাহীজান তখন নিচে গিয়েছিল। সে সকাল থেকে কেমন ছটফট করছিল। বাড়িতে সে বলেছিলো, আম্মু আর বাঁচবেন না।
আমরা দ্রুত ইসিজি করানোর চেষ্টা করি। কিন্তু মেশিনও যেন সেদিন তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল। চারপাশে হাসপাতালের শব্দ ছিল, মানুষের চলাফেরা ছিল, অথচ আমাদের ভেতরে সবকিছু থেমে গিয়েছিল।
সেদিন বুঝেছিলাম, মৃত্যু শুধু একজন মানুষকে নিয়ে যায় না; সঙ্গে করে নিয়ে যায় পরিবারের বহু অভ্যাস, বহু নির্ভরতা, বহু ডাকে সাড়া দেওয়া এক পরিচিত মুখ। তারপরও কিছু জিনিস থেকে যায়। থেকে যায় মায়ের হাতের স্পর্শ, অসুস্থ শরীর নিয়েও সন্তানের জন্য ভাবনা, আর সংসারটাকে আগলে রাখার অদ্ভুত ক্ষমতা।
সময় চলে যায়, মানুষও একদিন চলে যায়। কিন্তু মায়ের জন্য জমে থাকা অমীমাংসিত কষ্টগুলো সহজে কোথাও যায় না। সেগুলো বেঁচে থাকে মানুষের ভেতরে।
এসইউ
What's Your Reaction?