মার্কিন সামরিক হামলায় ওমান উপসাগরের কাছে নিহত ভারতীয় নাবিক পাটনালা সুরেশের শেষ কথাগুলো এখনও কানে বাজে স্ত্রী পাটনালা ভার্গবীর। স্বামীর সঙ্গে ১৫তম বিবাহবার্ষিকী উদযাপনের অপেক্ষায় ছিলেন তিনি। কিন্তু তার আগেই আসে মৃত্যুসংবাদ।
ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের উপকূলীয় শহর বিশাখাপত্তনমের বাসিন্দা ভার্গবী বলেন,সে বলেছিল খুব শিগগিরই বাড়ি ফিরবে। কিন্তু লাশ হয়ে ফিরবে, এমটা কখনও ভাবিনি।
গত বুধবার ওমান উপসাগরে এমটি সেত্তেবেলো নামের একটি তেলবাহী জাহাজে মার্কিন বাহিনীর হামলায় সুরেশসহ তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হন। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জাহাজটি ইরান-সংশ্লিষ্ট তেল বহন করছিল এবং সতর্কবার্তা অমান্য করেছিল। তবে জাহাজ পরিচালনাকারী কর্তৃপক্ষ এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, জাহাজটির সঙ্গে ইরানের কোনো সম্পর্ক ছিল না এবং হামলার আগে কোনো সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়নি। হামলার পর ওই জাহাজের আরও ২১ জন নাবিককে উদ্ধার করা হয়।
ঘটনার পর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে নিহত নাবিকদের পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। কেউ হারিয়েছেন স্বামী, কেউ একমাত্র সন্তান। ভারতের জাহাজ পরিবহনমন্ত্রী সর্বনন্দ স্যান্যায়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েছেন। তিনি এ ঘটনাকে ভারতের সামুদ্রিক খাতের জন্য ‘গভীর ক্ষতি’ বলে উল্লেখ করেন।
এদিকে, ভারত সরকারও এ হামলার প্রতিবাদ জানিয়ে ওয়াশিংটনে কড়া বার্তা পাঠিয়েছে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে। কিন্তু ভার্গবীর কাছে আন্তর্জাতিক কূটনীতি এখন অর্থহীন। তার কাছে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা, স্বামী আর ফিরবেন না।
তিনি বলেন, ও বলেছিল, ওই এলাকায় হামলা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু আমি যেন চিন্তা না করি। বলেছিল নিরাপদে ফিরে এসে ঠিকমতো আমাদের বিবাহবার্ষিকী উদযাপন করবে।
১৫ বছর ধরে সমুদ্রে কাজ করতেন সুরেশ। তিনি ছিলেন জাহাজটির প্রধান প্রকৌশলী। বছরে ছয় মাস ছুটি পাওয়ার সুযোগ থাকলেও খুব কমই বাড়িতে সময় কাটাতেন বলে জানান তার বাবা রামাকৃষ্ণ।
রামকৃষ্ণ বলেন, সুরেশ তার কাজকে খুব ভালোবাসত। বেশিরভাগ সময় সমুদ্রেই থাকতে চাইত।
পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত ভিডিও কলে কথা বলতেন সুরেশ। তবে ৫ জুনের পর থেকে যোগাযোগে সমস্যা শুরু হয়। ৯ জুনের পর পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় যোগাযোগ।
ভার্গবী বলেন, ভাবছিলাম সমুদ্রে নেটওয়ার্ক সমস্যার কারণেই কথা হচ্ছে না। দুই দিন অপেক্ষার পর তিনি জানতে পারেন, হামলায় তার স্বামী নিহত হয়েছেন।
প্রথমে পরিবারটি আশা করেছিল, হয়তো কোনো ভুল হয়েছে। কিন্তু পরে জাহাজ কর্তৃপক্ষ জানায়, হামলার সময় পালানোর কোনো সুযোগই ছিল না। ভার্গবীর দাবি, জাহাজের জেনারেটরের একটি ত্রুটি পরীক্ষা করার সময় হামলার শিকার হন সুরেশ।
দুই ছেলে ও দুই ভাতিজিকে নিয়ে এখন অনিশ্চয়তায় পড়েছেন ভার্গবী। বড় বোন ও দুলাভাই মারা যাওয়ার পর ভাতিজিদের দেখভালের দায়িত্বও নিয়েছিলেন সুরেশ।
ভার্গবী বলেন, পুরো পরিবার সুরেশের আয়ের ওপর নির্ভর করত। এখন সন্তানদের কীভাবে বড় করব, পড়াশোনা করাব, কিছুই বুঝতে পারছি না।
একই ধরনের শোক নেমে এসেছে ভারতের হিমাচল প্রদেশের হামিরপুর জেলায়। সেখানে নিহত ২৩ বছর বয়সী আদিত্য শর্মা ছিলেন পরিবারের একমাত্র ছেলে।
তার বাবা রাজেশ শর্মা বলেন, আমি শুধু চাই আমার ছেলের মরদেহ ফিরিয়ে দেওয়া হোক। তার শেষ মুহূর্তে কী ঘটেছিল, সেটাও জানতে চাই।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, অন্যদের যখন উদ্ধার করা গেছে, তাহলে এই তিনজনকে কেন বাঁচানো গেল না?
উত্তরপ্রদেশের দেওরিয়া জেলায় নিহত আরেক নাবিক শিবানন্দ চৌরাসিয়ার পরিবারও একই শোক বয়ে বেড়াচ্ছে। ৩৫ বছর বয়সী শিবানন্দ বিদেশি একটি শিপিং কোম্পানিতে কাজ করতেন।
তার বাবা রামজি চৌরাসিয়া বলেন, পরশু রাতেও কথা হয়েছে। সে বলেছিল সব ঠিক আছে। এখন শুনছি, সে আর নেই।
নিহত তিন নাবিকের পরিবারই এখন অপেক্ষা করছে প্রিয়জনের মরদেহ দেশে ফেরার। আন্তর্জাতিক উত্তেজনা কিংবা ভূরাজনীতির হিসাব তাদের কাছে এখন গৌণ। শেষবারের মতো প্রিয় মুখটি দেখাই তাদের একমাত্র প্রত্যাশা।