মে দিবসের উপহার

নিপু গাঁয়ের ছেলে। ছোটবেলায় কৃষিকাজ করার সময় বজ্রপাতে ওর বাবা ছলিম উদ্দিন মারা যান। সেই থেকে মা রাশেদা বেগম ছেলেকে আগলে রেখেছেন। দুই বছর আগে বিএ পাস করার পর থেকে নিপু একের পর এক ইন্টারভিউ দিয়ে চলেছে কিন্তু চাকরি যেন সোনার হরিণ—কিছুতেই ধরা দেয় না। একদিন মতিঝিলে গ্রামের দুলাভাই জগলু সরকারকে পেয়ে যায় নিপু। জগলু সাহেব সরকারি-বেসরকারি অনেক বড় বড় পদে চাকরি করেছেন। নিপু অনুরোধের সুরে বলল, ‌‘দেখেন না দুলাভাই, কিছু একটা করতে পারেন কি না? মায়ের মুখের দিকে আর তাকাতে পারছি না।’জগলু সাহেব একটু দার্শনিক হাসিতে উত্তর দিলেন, ‘এখন আমি অবসরপ্রাপ্ত। জানো তো, দাবা খেলা শেষ হলে রাজা, মন্ত্রী, সৈনিক, ঘোড়া সবাইকে একই বাক্সে আটকে রাখা হয়। আমার ক্ষমতা এখন তেমনই বাক্সে সীমাবদ্ধ।’নিপু হাল ছাড়লো না। তার আকুতি দেখে জগলু সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘নিপু, তুমি শ্রমিকের কাজ করবে?’নিপু তড়িৎ উত্তর দিলো, ‘পারবো দুলাভাই। শিক্ষিত হবার অহংকার আমার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে!’ জগলু সাহেবের সুপারিশে টঙ্গীর মুকিজ গ্রুপের একটি ফ্যাক্টরিতে নিপুর চাকরি হলো। দেড় রুমের একটি বাসা নিলো সে। মা উঠেপড়ে লেগে আঁখি পারভীনকে ঘরের বউ করে আনলেন। স

মে দিবসের উপহার

নিপু গাঁয়ের ছেলে। ছোটবেলায় কৃষিকাজ করার সময় বজ্রপাতে ওর বাবা ছলিম উদ্দিন মারা যান। সেই থেকে মা রাশেদা বেগম ছেলেকে আগলে রেখেছেন। দুই বছর আগে বিএ পাস করার পর থেকে নিপু একের পর এক ইন্টারভিউ দিয়ে চলেছে কিন্তু চাকরি যেন সোনার হরিণ—কিছুতেই ধরা দেয় না।

একদিন মতিঝিলে গ্রামের দুলাভাই জগলু সরকারকে পেয়ে যায় নিপু। জগলু সাহেব সরকারি-বেসরকারি অনেক বড় বড় পদে চাকরি করেছেন। নিপু অনুরোধের সুরে বলল, ‌‘দেখেন না দুলাভাই, কিছু একটা করতে পারেন কি না? মায়ের মুখের দিকে আর তাকাতে পারছি না।’
জগলু সাহেব একটু দার্শনিক হাসিতে উত্তর দিলেন, ‘এখন আমি অবসরপ্রাপ্ত। জানো তো, দাবা খেলা শেষ হলে রাজা, মন্ত্রী, সৈনিক, ঘোড়া সবাইকে একই বাক্সে আটকে রাখা হয়। আমার ক্ষমতা এখন তেমনই বাক্সে সীমাবদ্ধ।’
নিপু হাল ছাড়লো না। তার আকুতি দেখে জগলু সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘নিপু, তুমি শ্রমিকের কাজ করবে?’
নিপু তড়িৎ উত্তর দিলো, ‘পারবো দুলাভাই। শিক্ষিত হবার অহংকার আমার চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে!’

জগলু সাহেবের সুপারিশে টঙ্গীর মুকিজ গ্রুপের একটি ফ্যাক্টরিতে নিপুর চাকরি হলো। দেড় রুমের একটি বাসা নিলো সে। মা উঠেপড়ে লেগে আঁখি পারভীনকে ঘরের বউ করে আনলেন। সৎ মায়ের সংসার ছেড়ে মেয়েটি মা পেলো। ছোট সংসার; রান্নাঘরে মা থাকেন, অন্য ঘরে নিপু আর আঁখি। কিন্তু আঁখি পারভীনের আঁখিপানে ডুবে থাকার সময় নেই।

বারো থেকে ষোলো ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ডিউটি করে মাস শেষে সর্বসাকুল্যে সতেরো হাজার টাকা পায় নিপু। মা সেলাইয়ের কাজ করেন আর আঁখি শিশুদের পড়ায়। কোনোমতে দিন চলে যায়। বউ-শাশুড়ির দারুণ মিল। কারো কোনো অভিযোগ নেই। অভিযোগ কেবল একটাই—ছুটি আর টাকার অভাবে নিপু কোনোদিন স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরতে যেতে পারেনি।

সেদিন মা নিপুর পকেটে চারটি পাঁচশ টাকার নোট গুঁজে দিয়ে বললেন, ‘আমাদের বিয়ের পর তোর বাবা আমাকে কতবার গোপালপুর, ভোলাচং ও দরিকান্দির মেলায় নিয়ে গিয়েছিলো। আর তুই সেই বাপের ছেলে হয়ে বউমাকে নিয়ে ঘুরতে যাস না! এখন আর বলতে পারবি না টাকা নেই। এবার বউটাকে নিয়ে একটু ঘুরতে যা।’
নিপু কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘আচ্ছা মা, দেখি। সামনে একটা বন্ধ আছে। সেদিন আঁখিকে কোথাও থেকে ঘুরিয়ে আনবো। সাথে তোমাকেও নিবো মা।’

নিপুর সুপারভাইজার সুমিত্রা জলদাস। তিনবার এসএসসি দিয়েও পাস করতে পারেননি তিনি। কিন্তু জিএমের বাসার গৃহকর্মী জোগাড় করে দেওয়ার সুবাদে এই পদে আসীন। বাড়ির আত্মীয়-স্বজন সবাইকে চাকরি দিয়ে একটা সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছে। নিপু শুনেছে, ওর বাপ নাকি খেতে না পেয়ে গলায় দড়ি দিয়েছিলো। আজ এই মেয়ের কী দাপট!

শিক্ষিত ও সুদর্শন নিপুকে সুমিত্রা দুচোখে দেখতে পারেন না। সুযোগ পেলেই টিটকারি দেন, ‘তা এতই যদি শিক্ষিত, তবে শ্রমিকের কাজ করতে আসছেন কেন?’
নিপুর মনে পড়ে যায় জগলু দুলাভাইয়ের বলা রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের সেই উক্তি—‘দ্য ফিমেল অব দ্য স্পেসিস ইজ মোর ডেডলি দ্যান দ্য মেল।’
ছুটির কথা জিজ্ঞেস করতেই সুমিত্রা জ্বলে উঠে বললেন, ‘কে বলেছে আগামীকাল ছুটি? গেটের বাইরে নোটিশ থাকবে ফ্যাক্টরি বন্ধ কিন্তু কাজ হবে ভেতরে ভেতরে। আগে সকালে আসো, তারপর দেখা যাবে।’

পরদিন ভোরে কাজে যাওয়ার সময় নিপু আঁখিকে বলে গেল, ‘দুপুরে খেয়ে মা আর তুমি তৈরি হয়ে থেকো, আমি এসে ঘুরতে নিয়ে যাবো।’

কারখানায় গিয়ে নিপু দেখলো ভেতরে কাজ চলছে পুরোদমে। সেও কাজে যোগ দিলো। একসময় কারখানার পাশ দিয়ে মে দিবস উপলক্ষে একটি বর্ণাঢ্য মিছিল যাচ্ছিল। অন্য কয়েকজনের সাথে নিপু কৌতূহলী হয়ে জানালার ফাঁক দিয়ে সেই মিছিল দেখতে গিয়েছিল। সুমিত্রা সেই অপরাধে অন্যদের শুধু বকাঝকা করে ছেড়ে দিলেও নিপুকে তিনদিনের জন্য সাসপেন্ড করে দিলেন।

পরাজিত সৈনিকের মতো ধীর পায়ে নিপু বাসায় ফিরলো। আঁখি নীল শাড়ি পরেছে। চুলে ভাঁট ফুল গুঁজেছে। সাথে নীল টিপ পরে বারান্দায় প্রতীক্ষায় আছে। নিপুকে অসময়ে ফিরতে দেখে আঁখির চোখে রাজ্যের আনন্দ খেলে গেল। কিন্তু নিপুর পকেটে থাকা মায়ের দুই হাজার টাকা আর হাতে তিন দিনের অনাকাঙ্ক্ষিত ছুটির কাগজটা যেন বিশাল উপহাস হয়ে রইল। নিপু বুঝতে পারল, নিম্ন-মধ্যবিত্তের জীবনে আনন্দটুকুও অনেক সময় অপমানের মোড়কে আসে। বিশ্বের সবাই জানে, মে দিবস ছুটির দিন। আজ সে পেলো সেরা পুরস্কার।

নিপু দরজায় ধপাস করে বসে পড়লো। বিড়বিড় করে কী যেন বলে আর হাসে। এমন সময় তার বন্ধু শহীদ এসে বলল, ‘নিপু দেখ, আজ ‘জয়কাল’ পত্রিকায় জগলু সরকার মে দিবস নিয়ে কত সুন্দর একটা কবিতা লিখেছেন। ওরা কবিতা পড়ায় মন দেয়।

মে দিবসের হাহাকার

মিছিলে ব্যানার, প্লাকার্ড ও ফেস্টুন,
কৃষ্ণচূড়ার রঙে ছেয়েছে রাজপথ;
মে ডে’র প্রগাঢ় মাহাত্ম্য বন্দনায়—
সম্মুখপানে রথী-মহারথীর রথ!

লালসালু মাথায় বেঁধে নব-উল্লাসে
স্লোগান দিচ্ছে ঘর্মাক্ত ভাড়াটে শ্রমিক;
‘দুনিয়ার মজদুর এক হও—
এক হও, লড়াই করো নির্ভীক!’

বন্ধ ফটকের ভেতরে জানালা দিয়ে
মিছিল পানে চেয়ে ক’টি ক্লান্ত নয়ন;
ফোরম্যান দ্রুত এসে দেয় চড় কষে
কাজে ফাঁকি তোদের দোষ চিরন্তন!

মে দিবসেও চলে মজুরদের কর্মযজ্ঞ
শত যন্ত্রের অফুরান হাহাকার—
স্বেচ্ছায় খুশি মনে বাবুরা বেখেয়াল
জগৎ শেঠরা কথা শোনে কার?

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow