যশোরে বেসরকারি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বন্ধ, লোকসানে টিকে আছে বিমান

যশোর বিমানবন্দরে যাত্রী সংকটে একের পর এক ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সবশেষ এই বিমানবন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। এর আগে বিমানবন্দরটিতে ফ্লাইট স্থগিত করে নভোএয়ার। এখন সপ্তাহে মাত্র দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুতে সড়ক ও রেল যোগাযোগ চালুর পর থেকে ঢাকার সঙ্গে যশোরের দ্রুত সড়ক ও রেল যোগাযোগ শুরু হয়। এরপর থেকে আকাশ পথে যাত্রী সংকটে ভুগছিল যশোর বিমানবন্দর। এতে রুটটির বাণিজ্যিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। অর্থাৎ, আগে যেখানে দিনে নয়টি ফ্লাইট পরিচালনা হতো, এখন সেখানে সপ্তাহে দুটি ফ্লাইট চলে।  সবশেষ গত ১৬ জুলাই থেকে সাময়িকভাবে উড্ডয়ন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা। এর আগে সংস্থাটি সপ্তাহে সাত দিন ঢাকা-যশোর রুটে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করতো। এছাড়া একই কারণে ২০২৫ সালের আগস্টে ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করে আরেক বেসরকারি এয়ারলাইন্স নভোএয়ার।  আরও পড়ুন পদ্মা সেতুর প্রভাব / যশোর-ঢাকা রুটে অর্ধেকে নেমেছে ফ্লাইট, যাত্রী কমেছে ৪০ শতাংশ জেট ফুয়েলের আকাশচুম্বী দামে আকাশপথে ভ্রমণ

যশোরে বেসরকারি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বন্ধ, লোকসানে টিকে আছে বিমান

যশোর বিমানবন্দরে যাত্রী সংকটে একের পর এক ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সবশেষ এই বিমানবন্দর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স। এর আগে বিমানবন্দরটিতে ফ্লাইট স্থগিত করে নভোএয়ার। এখন সপ্তাহে মাত্র দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
 
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, পদ্মা সেতুতে সড়ক ও রেল যোগাযোগ চালুর পর থেকে ঢাকার সঙ্গে যশোরের দ্রুত সড়ক ও রেল যোগাযোগ শুরু হয়। এরপর থেকে আকাশ পথে যাত্রী সংকটে ভুগছিল যশোর বিমানবন্দর। এতে রুটটির বাণিজ্যিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। অর্থাৎ, আগে যেখানে দিনে নয়টি ফ্লাইট পরিচালনা হতো, এখন সেখানে সপ্তাহে দুটি ফ্লাইট চলে। 
 
সবশেষ গত ১৬ জুলাই থেকে সাময়িকভাবে উড্ডয়ন বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয় বেসরকারি এয়ারলাইন্স ইউএস-বাংলা। এর আগে সংস্থাটি সপ্তাহে সাত দিন ঢাকা-যশোর রুটে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করতো। এছাড়া একই কারণে ২০২৫ সালের আগস্টে ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করে আরেক বেসরকারি এয়ারলাইন্স নভোএয়ার। 

পদ্মা সেতুর প্রভাবে একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়েছে বরিশাল বিমানবন্দর। যাত্রী সংকটের কারণে সেখানেও ধাপে ধাপে বেসরকারি সব বিমান সংস্থা ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে বরিশাল রুটে সপ্তাহে মাত্র তিনটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স।
 
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের জনসংযোগ শাখার মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, ‘যাত্রী সংকটের কারণেই আমরা এই রুটে ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ করেছি। একসময় ঢাকা-যশোর রুটে প্রতিদিন ছয়টি পর্যন্ত ফ্লাইট পরিচালনা করেছি। পরে যাত্রী কমে যাওয়ায় তা ধাপে ধাপে কমিয়ে দিনে একটি ফ্লাইটে আনা হয়। কিন্তু সেটিও লাভজনক ছিল না।’

তিনি বলেন, একটি ফ্লাইট পরিচালনার জন্য উড়োজাহাজের আসনের অন্তত ৭০ শতাংশ পূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। অথচ দীর্ঘদিন ধরে এই রুটে ৫০ শতাংশের বেশি যাত্রী পাওয়া যাচ্ছিল না। ফলে জ্বালানি, জনবল ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়ও উঠে আসছিল না।

যশোরে বেসরকারি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বন্ধ, লোকসানে টিকে আছে বিমান
 
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রের তথ্য বলছে, পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই যশোর বিমানবন্দরের যাত্রী সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমতে শুরু করে। ২০২১-২২ অর্থবছরে এই বিমানবন্দর দিয়ে মোট ৪ লাখ ৫ হাজার ৯০০ জন যাত্রী যাতায়াত করেন। এর মধ্যে ঢাকা থেকে যশোরে যান ২ লাখ ১ হাজার ৬৯১ জন এবং যশোর থেকে ঢাকায় আসেন ২ লাখ ৪ হাজার ২০৯ জন। ২০২২ সালের ২৫ জুন পদ্মা সেতুর উদ্বোধন হওয়ায় সেতুর প্রভাব তখন পুরোপুরি পড়েনি। পরবর্তী অর্থবছর থেকেই যাত্রী কমার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
 
বেবিচকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে যশোর বিমানবন্দরের যাত্রী সংখ্যা নেমে আসে ২ লাখ ২১ হাজার ৭০ জনে। সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই সংখ্যা আরও কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৮ হাজার ৪০৮ জনে। অর্থাৎ চার অর্থবছরের ব্যবধানে যশোর বিমানবন্দরে যাত্রী কমেছে সাড়ে তিন লাখেরও বেশি।

ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জামিল খান। তার গ্রামের বাড়ি যশোর সদরে।

জামিল জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে বছরে দুই ঈদের ছুটিসহ অন্য যে কোনো সময় প্রয়োজনে সড়ক পথে যশোর যেতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হতো। বিশেষ করে মাওয়া ফেরিঘাটে ফেরির জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা ছিল বেশ কষ্টের। ফলে যাদের আর্থিক সামর্থ্য ভালো ছিল তাদের অনেকেই আকাশ পথে গ্রামের বাড়ি বা যশোর যেতেন। তবে পদ্মা সেতু চালুর পর অল্প সময়ে সড়ক পথেই যশোর যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। এ কারণে আকাশ পথে এখন আর যাতায়াত করা হয় না।’
 
আকাশ পথে যারা ঢাকা-যশোর-ঢাকা রুটে যাতায়াত করতেন তাদের অনেকেরই ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে বলে জানান উত্তরার একটি ট্রাভেল এজেন্সির স্বত্বাধিকারী সামিউল ইসলাম। তিনি বলেন, তার এজেন্সি থেকে আগে যশোরগামী যেসব যাত্রী টিকিট কাটতেন, তাদের অনেকেরই ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ওই গাড়িতে করে তারা গ্রামে যাতায়াত করেন। ঢাকা-যশোর রোডে যখন একজন যাত্রীর একমুখী উড়োজাহাজের ভাড়া সাড়ে চার হাজার টাকা, সেখানে দুই হাজার টাকা তেল খরচে ব্যক্তিগত গাড়িতে পুরো পরিবার নিয়ে গ্রামে যেতে পারেন তারা।

যশোরে বেসরকারি এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট বন্ধ, লোকসানে টিকে আছে বিমান
যশোর বিমানবন্দরে ইউএস-বাংলার একটি ফ্লাইট থেকে নামছেন যাত্রীরা, ফাইল ছবি: ইউএস-বাংলা

অভ্যন্তরীণ রুটের এয়ারলাইন্সগুলো জানায়, দেশে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সিলেট, সৈয়দপুর এবং যশোর এই পাঁচটি বিমানবন্দরে ব্যাপক যাত্রী চাপ ছিল। কিন্তু ২০২২ সালে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের সড়কপথে যাতায়াত অনেক সহজ হয়। এরপর ২০২৩ সালে পদ্মা সেতু হয়ে রেল সংযোগ চালু এবং ২০২৪ সালের শেষ দিকে ঢাকা-যশোর সরাসরি ট্রেন চলাচল শুরু হলে আকাশপথের ওপর নির্ভরতা আরও কমে যায়। তুলনামূলক কম ভাড়া, সহজ যাতায়াত এবং নিয়মিত ট্রেন চলাচলের কারণে যাত্রীরা ধীরে ধীরে বিমান ছেড়ে সড়ক ও রেলপথে ঝুঁকেছেন। ফলে এই পরিস্থিতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বেসরকারি বিমান সংস্থাগুলোর ওপর।
 
এমন অবস্থায় ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট ঢাকা-যশোর রুটে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দেয় নভোএয়ার। একই সময়ে ইউএস-বাংলাও তাদের ফ্লাইট সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনে। সর্বশেষ পুরোপুরি ফ্লাইট স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় এখন রুটটিতে কেবল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স সপ্তাহে দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

বিমান খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যাত্রী চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে বেসরকারি কোনো সংস্থার পক্ষে ঢাকা-যশোর রুটে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করা কঠিন হবে। কারণ স্বল্প দূরত্বের এই রুটে পরিচালন ব্যয় তুলনামূলক বেশি হলেও যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে কম।
 
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, যশোর ও বরিশাল বিমানবন্দরে লোকসান দিয়ে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমান। সপ্তাহে দুটি বা তিনটি ফ্লাইট পরিচালনা করলেও ৩০-৪০ শতাংশ আসন ফাঁকা থাকছে। এখন বিমানও যদি ওই দুটি বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ করে দেয়, তা হলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে আর কোনো আকাশপথে যোগাযোগ থাকল না। তাই সরকারের এক প্রকার ইচ্ছায়ই ওই দুটি রুট চালু রাখা হয়েছে।

জানতে চাইলে যশোর বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক মো. আইয়ুব আলী জাগো নিউজকে বলেন, এয়ারলাইন্স প্রতিষ্ঠানগুলো কয়েক বছর ধরে একে একে বেশকিছু ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়। বন্ধের কারণ হিসেবে তারা চিঠিতে কমার্শিয়াল রিজন উল্লেখ করেছেন।

আইয়ুব আলী বলেন, বিমানবন্দরে যাত্রীদের সেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে। এখন প্রতি মঙ্গল ও শুক্রবার দুটি ফ্লাইট পরিচালনা করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। বিমানবন্দরের পক্ষ থেকে যাত্রীদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হচ্ছে।
 
এমএমএ/এমএমএআর / এমএফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow