যেভাবে রাশিয়ার ‘ভাড়াটে সেনা’ হয়ে লড়ছেন বাংলাদেশি যুবকরা
ইউক্রেনের সঙ্গে চার বছরের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রভাবে রাশিয়া তীব্র সেনা ও জনবল সংকটে পড়েছে। বিপুল হতাহত, উন্নত প্রযুক্তির অভাব এবং দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতির কারণে সামরিক উৎপাদন ও কার্যক্ষমতা ব্যাহত হচ্ছে। এই ঘাটতি মেটাতে রাশিয়া বিভিন্ন দেশের তরুণদের উচ্চ বেতনের মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক সেনা নিয়োগের মাধ্যমে তাদের ‘ভাড়াটে সৈনিক’ ব্যবহার করছে। এসব ভাড়াটে সৈনিকদের তালিকায় রয়েছে শত শত বাংলাদেশি তরুণ-যুবকদের নামও। তারা বৈধ-অবৈধ পথে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়ে দালালচক্রের মাধ্যমে যোগ দিচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনীতে। পরে ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধা হিসেবে তাদের পাঠানো হচ্ছে ইউক্রেন সীমান্তে। যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে অনেকে প্রাণ হারাচ্ছেন, আবার অনেকেই পঙ্গু হয়ে অথবা পালিয়ে দেশে ফিরছেন। উচ্চ বেতনে চাকরি বা স্থায়ী নাগরিকত্বের প্রলোভন দেখিয়ে এসব বাংলাদেশি তরুণকে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠাচ্ছে একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক দালাল চক্র। সম্প্রতি মোহন মিয়াজি নামে এক তরুণ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে দেশে ফিরে আসায় এই ভয়াবহ চিত্র সামনে উঠে এসেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘চারদিকে শুধ
ইউক্রেনের সঙ্গে চার বছরের দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের প্রভাবে রাশিয়া তীব্র সেনা ও জনবল সংকটে পড়েছে। বিপুল হতাহত, উন্নত প্রযুক্তির অভাব এবং দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতির কারণে সামরিক উৎপাদন ও কার্যক্ষমতা ব্যাহত হচ্ছে। এই ঘাটতি মেটাতে রাশিয়া বিভিন্ন দেশের তরুণদের উচ্চ বেতনের মাধ্যমে চুক্তিভিত্তিক সেনা নিয়োগের মাধ্যমে তাদের ‘ভাড়াটে সৈনিক’ ব্যবহার করছে।
এসব ভাড়াটে সৈনিকদের তালিকায় রয়েছে শত শত বাংলাদেশি তরুণ-যুবকদের নামও। তারা বৈধ-অবৈধ পথে রাশিয়ায় পাড়ি জমিয়ে দালালচক্রের মাধ্যমে যোগ দিচ্ছে দেশটির সেনাবাহিনীতে। পরে ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধা হিসেবে তাদের পাঠানো হচ্ছে ইউক্রেন সীমান্তে। যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে অনেকে প্রাণ হারাচ্ছেন, আবার অনেকেই পঙ্গু হয়ে অথবা পালিয়ে দেশে ফিরছেন।
উচ্চ বেতনে চাকরি বা স্থায়ী নাগরিকত্বের প্রলোভন দেখিয়ে এসব বাংলাদেশি তরুণকে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠাচ্ছে একটি সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক দালাল চক্র। সম্প্রতি মোহন মিয়াজি নামে এক তরুণ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে দেশে ফিরে আসায় এই ভয়াবহ চিত্র সামনে উঠে এসেছে।
যুদ্ধক্ষেত্রে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘চারদিকে শুধু লাশ আর লাশ। যেদিকে চোখ যায়, সেদিকেই দেখা যায় মানুষ মরে পড়ে রয়েছে।’ সেখানে নোয়াখালীর আশিকুর নামে এক বন্ধু ছিল। ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে তার প্রাণ যায় বলে জানান মোহন।
মোহন-আশিকুরের মতো শত শত বাংলাদেশি যুবকের রাশিয়া যাওয়ার পর মাসের পর মাস কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তারা কী বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন— জানেন না দেশে থাকা স্বজনরা।
এমনই একজন রাজবাড়ির বাসিন্দা নজরুল ইসলাম। তার স্ত্রী আইরিন আক্তার জানান, রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া স্বামীর দীর্ঘদিন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে স্বামীর মৃত্যুর খবর জানতে পারেন তার সহযোদ্ধা ইকবাল হোসেনের মাধ্যমে।
ইকবালের সন্ধানও প্রায় মাসখানেক ধরে পাচ্ছিল না তার পরিবারের সদস্যরা। পরে জানা যায় যে, তিনি আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভালো চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে কৌশলে প্রথমে নেওয়া হয় রাশিয়ায়। সেখান থেকে পাঠানো হয় রুশ-ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে। এছাড়া পড়াশোনা ও কাজের সুবাদে বাংলাদেশ থেকে যারা রাশিয়া যাচ্ছেন, তাদের মধ্য থেকেও অনেকে মোটা অর্থ ও স্থায়ী নাগরিকত্বের লোভে পড়ে যোগ দিচ্ছেন দেশটির সেনাবাহিনীতে।
রুশ বাহিনীর হয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি তরুণদের অনেকে বলছেন, দালাল চক্রের প্রতারণার শিকার হয়ে রাশিয়া গিয়ে যুদ্ধে অংশ নিতে বাধ্য হয়েছেন তারা। এসব দালাল চক্র সৈনিক হিসেবে পাঠানো হবে না এবং হাসপাতাল, ফার্নিচার কোম্পানি বা গ্যারেজে চাকরির কথা বলার আশ্বাস দিয়ে নিয়ে যায়।
এসব বাংলাদেশিকে রাশিয়ায় নেওয়ার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের প্রথমে মধ্যপ্রাচ্যের যে কোনো একটি দেশে নেওয়া হচ্ছে। এরপর সেখান থেকে নিয়ে যাওয়া হয় রাশিয়ায়। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে রুশ ভাষায় লেখা চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়। এই চুক্তিগুলো আসলে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগদানের আনুষ্ঠানিক দলিল।
অভিযোগ রয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী রুশ সরকার যুদ্ধে অংশ নেওয়া এসব ‘ভাড়াটে সেনাদের’ এককালীন বড় অঙ্কের অর্থ দেয়। এছাড়া প্রতি মাসে মিলে মোটা অঙ্কের বেতনও। কিন্তু রুশ সরকার লজিস্টিক সাপোর্ট বা বেতন বাবদ বড় অঙ্কের টাকা দিলেও তার অধিকাংশ দালালরা হাতিয়ে নেয়।
যে দালাল চক্রের মাধ্যমে বাংলাদেশি তরুণরা রাশিয়ায় ভাড়াটে যোদ্ধা হিসেবে অংশ নিচ্ছে, তাদের অন্যতম ‘বিকন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস’। তবে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. জসিম উদ্দিনের দাবি, জেনে-বুঝেই তারা রুশ সেনাবহিনীতে যোগ দিচ্ছে। কাউকে বাধ্য করা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘ভিসা হওয়ার প্রসেস শুরুর আগেই তারা সবাই স্ট্যাম্পে বন্ড দিয়ে গেছে যে, তারা সেখানে আর্মিতেই যাবে। এখানে কেউ কাউকে বাধ্য করেনি।’ এই দাবির পক্ষে একটি চুক্তিপত্রও তুলে ধরেন তিনি।
কিন্তু ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্যরা বলছেন, তারা এ ধরনের কোনো চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেননি। তবে বছরখানেক আগে তাদের কাছ থেকে কিছু সাদা কাগজে সই নেওয়া হয় বলে জানান তারা।
এছাড়া সাবেক সেনা সদস্য নজরুল ইসলামের মৃত্যুর পর তারা রাশিয়ায় লোক পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছেন বলেও জানান বিকনের কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন। তবে বিবিসি বাংলা জানতে পেরেছে, শিগগিরই তারা আরও একদল ব্যক্তিকে রাশিয়ায় পাঠাতে যাচ্ছেন।
তাদের সঙ্গে দীপন দেবনাথ ও রাজেন্দ্রপ্রসাদ জেসনু নামে দুই ভারতীয় নাগরিকের জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে বিবিসি বাংলা।
এদের মধ্যে দীপন বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় লোক পাঠানোর ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন। আর বাংলাদেশ থেকে লোক পাঠানোর পর রাশিয়ায় তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা থেকে শুরু করে রুশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করানো পর্যন্ত যাবতীয় কাজ করে থাকেন রাজেন্দ্রপ্রসাদ জেসনু, যিনি প্রসাদ নামেই ভুক্তভোগীর কাছে বেশি পরিচিত।
‘বিকন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস’ ছাড়া আরও একটি দালাল চক্রের সন্ধান পেয়েছে সংবাদমাধ্যম বিবিসি, যার প্রধান কার্যালয় রাজধানীর মালিবাগে সিআইডি সদর দপ্তরের কাছেই অবস্থিত।
সংবাদমাধ্যমটি বলছে, পুলিশ (সিআইডি) কিছু সদস্যকে গ্রেপ্তার করলেও মূল হোতারা এখনো সক্রিয় এবং নতুন করে লোক পাঠানোর চেষ্টা চালাচ্ছে।
সিআইডি সদরদপ্তরের ঠিক উল্টো পাশেই দালাল চক্রের প্রধান কার্যালয় থাকা সত্ত্বেও কেন তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি, তা নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। এই জালিয়াতির বিষয়ে রুশ সরকার অবগত কি না, তা নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে।
এদিকে, যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত বাংলাদেশিদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের জোরালো হস্তক্ষেপ কামনা করছেন স্বজনরা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মরদেহগুলো ফেরত আনার বিষয়ে চেষ্টা চালানোর কথা বললেও, বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কবে নাগাদ বা আদৌ সেগুলো আনা সম্ভব হবে কি না—তা নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো নিশ্চয়তা দিতে পারেনি।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।
What's Your Reaction?