যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধ অপরিহার্য

ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান যুদ্ধ, গাজা যুদ্ধ, ভেনিজুয়েলায় হস্তক্ষেপ, আফ্রিকা ও ইউরোপকে অস্থির করে তোলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছিল অত্যাবশ্যক। কীভাবে ওয়াশিংটন রাশিয়ার নর্ড স্ট্রিমে গোপনে হামলা চালিয়ে, আর্কটিক থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় জাহাজ আটকিয়ে বিশ্বের জ্বালানির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে উঠেছে, তা অতি সংক্ষেপে বর্ণনা করা দুষ্কর, তবে কাঁচের মতো পরিষ্কার। এক কথায়, যুক্তরাষ্ট্র গোপনে এবং প্রকাশ্যে বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহে ডাকাতি চালিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র একটি জলদস্যু রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের নামে রুশ ট্যাংকার ও পরিশোধনাগারে শতাধিক হামলা হয়েছে, যার পেছনে আছে মূলত যুক্তরাষ্ট্র; সঙ্গে আছে ইউকে, ফ্রান্স ও জার্মানি। চীনের তেল ও এলএনজির এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ ইতিমধ্যেই বিঘ্নিত করা হয়েছে। পৃথিবীর বৃহত্তম তেল মজুত দখলের জন্য নির্লজ্জের মতো ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে দেশ থেকে তুলে নিয়েছে। ভেনিজুয়েলার তেল এখন মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। বিগত দিনেও যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানির ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। কিন্তু দেশটির তেল ব্যবসার এত উচ্চাভ

যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যুদ্ধ অপরিহার্য

ইউক্রেন যুদ্ধ, ইরান যুদ্ধ, গাজা যুদ্ধ, ভেনিজুয়েলায় হস্তক্ষেপ, আফ্রিকা ও ইউরোপকে অস্থির করে তোলা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ছিল অত্যাবশ্যক। কীভাবে ওয়াশিংটন রাশিয়ার নর্ড স্ট্রিমে গোপনে হামলা চালিয়ে, আর্কটিক থেকে ভারত মহাসাগর পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় জাহাজ আটকিয়ে বিশ্বের জ্বালানির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় মরিয়া হয়ে উঠেছে, তা অতি সংক্ষেপে বর্ণনা করা দুষ্কর, তবে কাঁচের মতো পরিষ্কার। এক কথায়, যুক্তরাষ্ট্র গোপনে এবং প্রকাশ্যে বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহে ডাকাতি চালিয়ে যাচ্ছে। ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র একটি জলদস্যু রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

ইউক্রেন যুদ্ধের নামে রুশ ট্যাংকার ও পরিশোধনাগারে শতাধিক হামলা হয়েছে, যার পেছনে আছে মূলত যুক্তরাষ্ট্র; সঙ্গে আছে ইউকে, ফ্রান্স ও জার্মানি। চীনের তেল ও এলএনজির এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ ইতিমধ্যেই বিঘ্নিত করা হয়েছে। পৃথিবীর বৃহত্তম তেল মজুত দখলের জন্য নির্লজ্জের মতো ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে দেশ থেকে তুলে নিয়েছে। ভেনিজুয়েলার তেল এখন মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে।

বিগত দিনেও যুক্তরাষ্ট্র জ্বালানির ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। কিন্তু দেশটির তেল ব্যবসার এত উচ্চাভিলাষ ছিল না। একচেটিয়া অস্ত্র ব্যবসা এখন হাতছাড়া। অন্যদিকে দেশটির সরকারের ৩৯ ট্রিলিয়ন ডলার ঋণ। প্রতিদিন ২.৯০ বিলিয়ন ডলার ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে ডাকাতি করে বিভিন্ন দেশ থেকে তেল নিয়ে তা রপ্তানিই যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অনেকে মনে করছেন যে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের উচ্চমূল্য যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতেও বিরূপ প্রভাব ফেলবে। না, বাস্তবে তা একটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা। বিষয়গুলো একে একে বর্ণনা করলে পরিষ্কার হয়ে যাবে। লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, বৈশ্বিক এই সংকটের সময় প্রথমবারের মতো ডলারের মূল্য পড়ছে না, বরং ঠিক উল্টোটা ঘটছে। লক্ষ্য করুন, ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র এখন এলএনজি রপ্তানিতে বিশ্বের ১ নম্বর স্থানে উঠে এসেছে। রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহে যুক্তরাষ্ট্রের কয়লা, তেল ও এলএনজি রপ্তানি ৯ শতাংশ বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখন ইউরোপের জ্বালানি সরবরাহের সবচেয়ে বড় উৎস হয়ে উঠেছে।

মস্কোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইন ধ্বংস করে যুক্তরাষ্ট্র শুধু রাশিয়ারই ক্ষতি করেনি— তারা ইউরোপকে একটি স্থায়ী গ্রাহকে পরিণত করেছে, দীর্ঘমেয়াদি মুনাফা নিশ্চিত করেছে এবং পেট্রোগ্যাস-ডলারকে সুসংহত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বিশাল মহাসাগরের ওপারের দেশ। তাই এতকাল যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল আমদানি ব্যয়বহুল ছিল। পাশেই সস্তা রুশ গ্যাস থাকতে কখনোই কেউ মার্কিন এলএনজি কিনত না। এই ব্যবস্থাকে যুক্তরাষ্ট্র শেষ করে দিয়েছে। এরই নাম যুদ্ধের লাভ!

একইভাবে তারা ইরান যুদ্ধের আড়ালে বিশ্ব এলএনজির বড় উৎস কাতারের অবস্থান শেষ করে দিয়েছে অত্যন্ত সূক্ষ্ম পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে। যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই ৪ মার্চ দোহাকে তারা দৈব দুর্ঘটনা ঘোষণা করতে বাধ্য করে। কাতারের সবচেয়ে বড় জ্বালানি অঞ্চল হলো রাস লাফান। অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে তারা ইরানকে সুযোগ করে দেয় কাতারের এই রাস লাফানে হামলা চালাতে এবং বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্রকে কার্যত বন্ধ করে দেয়। রাস লাফান থেকে বিশ্বের ২০ শতাংশ এলএনজি রপ্তানি হতো। এভাবে ওয়াশিংটন এক ঢিলে তিন-চারটি পাখি মেরেছে: ইরানের উৎপাদনকে পঙ্গু করে দিয়েছে, কাতারকে বাজার থেকে সরিয়ে দিয়েছে। কাতার চীন ও ইউরোপের সঙ্গে তাদের সস্তা দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে।

এদিকে আকস্মিক এক দুর্যোগে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি সরবরাহকারী দেশ অস্ট্রেলিয়া ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে। এর ফলে তাদের অর্ধেক এলএনজি কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়। সময়টা কিন্তু ভয়ানক। মাত্র ৯ দিনের ব্যবধানে কাতার এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো যুক্তরাষ্ট্রের দুটি বৃহত্তম প্রতিযোগী ছিটকে পড়ল। এই সুযোগে এলএনজির দাম বাড়িয়ে দেওয়া হলো এবং এলএনজিভিত্তিক ডলারকে আরও শক্তিশালী করে দিল। আরও একটি বিষয় আমরা দেখতে পারি। যেদিন কাতারের এলএনজি হাব ধ্বংস হয় (১৮ মার্চ), ঠিক সেই দিনই ইউরোপীয় ইউনিয়ন রুশ স্পট গ্যাস নিষিদ্ধ করে। স্পট গ্যাস হলো এমন গ্যাস, যা তাৎক্ষণিক কেনা যায়।

আরও শুনুন, লেভানটাইন বেসিন হলো বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম গ্যাসক্ষেত্র, যা সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও লেবাননের উপকূলে অবস্থিত। ইরান যুদ্ধ এবং বিশ্বের জ্বালানির ওপর ওয়াশিংটনের বৃহত্তর নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এই অঞ্চল পুরোপুরি দখলে নিয়ে নিয়েছে। গাজা আগেই ইসরাইলের হাতে গেছে, লেবাননের লিতানি নদী পর্যন্ত দখল করার ফলে লেবাননের উপকূল এখন কার্যত ইসরাইলের দখলে। তাদের পরিকল্পনা আছে, ইউরোপকে একটি ভূমধ্যসাগরীয় করিডরের সঙ্গে সংযুক্ত করবে।

ইউরোপের দ্বারপ্রান্তে অবস্থিত হওয়ায়, লেভানটাইন বেসিন রুশ গ্যাস পাইপলাইনের বিকল্প হতে পারে। এটা ওয়াশিংটনকে সমুদ্রপথে চড়া মূল্যে এলএনজি বিক্রির সুযোগ দেবে। এই ধারাবাহিকতায়, যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি শেভরন ডিসেম্বরে ইসরাইলের সঙ্গে ৩৫ বিলিয়ন ডলারের একটি গ্যাস চুক্তি স্বাক্ষর করেছে— যার পরিকল্পনা তারা গাজা গণহত্যার প্রায় ২ বছর আগে থেকেই তৈরি করে রেখেছিল। সবকিছু কাঁচের মতো পরিষ্কার।

প্রথমে গাজা যুদ্ধবিরতি, তারপর বোর্ড অব পিস, এবং অবশেষে শেভরনের গ্যাস চুক্তি। প্ল্যানটা হলো, শেভরন চুক্তিগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে করবে, আর বোর্ড অব পিস একটি ‘মানবিক ফ্রন্ট’ হিসেবে কাজ করবে। ডিসেম্বরে শেভরন সবেমাত্র ইসরাইলের সঙ্গে চুক্তি সই করেছিল, তখনই তারা সিরিয়ার তেল ও গ্যাসের দিকে এগোতে শুরু করে। ওয়াশিংটন কর্তৃক দামেস্কে বসানো নতুন আল-কায়েদা শাসক আল শারার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত টম ব্যারাকের একের পর এক বৈঠক হয়। এই ‘বৈঠক’ কী জিনিস, তা পাঠক জানেন। আল শারার সিরিয়া এখন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম তাবেদার।

ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ চুক্তিটি চূড়ান্ত হয়ে যায়। অথচ যুদ্ধের আগে, সিরিয়া তেল ও গ্যাসে সম্পূর্ণ স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিল। আজ সেই সার্বভৌমত্ব বিলুপ্ত। অকল্পনীয় হলেও সত্য, সিরিয়ানদের এখন দিনের অনেক সময় বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়! তাদের সরবরাহ তুরস্ক থেকে আনতে বাধ্য করা হচ্ছে, অথচ শেভরন সিরিয়ার উপকূলীয় সম্পদ সরাসরি ইউরোপে পাইপলাইনে পাঠাবে। ইউরোপের সঙ্গে ১৯ বছরের চুক্তি হয়েছে।

অর্থাৎ রাশিয়া থেকে ইউরোপের দিকে গ্যাস করিডর এখন মৃত। এর বদলে আমেরিকান করপোরেশন দখল করছে। এবং তা সম্ভব হচ্ছে বিভিন্ন দেশে শক্তিপ্রয়োগ ও দখলের মধ্য দিয়ে। লক্ষ্য করে দেখুন, ওই অঞ্চলের উপকূলীয় সমস্ত বন্দর ধ্বংস করা হয়েছে, শুধু ইসরাইলের বন্দর ছাড়া। গাজা অবরুদ্ধ করে এবং বৈরুত ও সিরিয়ার বন্দর অকার্যকর করে তারা নিশ্চিত করেছে যে, লেভানটাইন অঞ্চলের মানুষ নিজেদের সম্পদ যাতে স্পর্শ করতে না পারে। অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎসগুলো বন্ধ করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী চীনকে আমেরিকান জ্বালানির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল করার পরিকল্পনা এঁকেছে। চীন তাদের তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভেনেজুয়েলা, রাশিয়া এবং ইরানের সম্মিলিত সরবরাহ থেকে পায়। এই দেশ তিনটিকে চীন কৌশলগত অংশীদার বলে বিবেচনা করে। অথচ একটিকে যুক্তরাষ্ট্র দখল করে নিয়েছে, অন্য দুটির ঘাড়ে যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে।

ট্রাম্প ‘বোর্ড অব পিস’ সম্মেলনে বড়াই করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের ৬২% তেল নিয়ন্ত্রণ করে। এই দখল একটি বিশেষ পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তা হলো, এটি অবিলম্বে চীনকে জ্বালানি অংশীদারিত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করবে।

গত কয়েক মাসে, যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনী আক্ষরিক অর্থেই ভূমধ্যসাগর থেকে কৃষ্ণসাগর, বাল্টিক সাগর, ক্যারিবিয়ান, আর্কটিক, উত্তর আটলান্টিক এবং ভারত মহাসাগর পর্যন্ত সমগ্র অঞ্চলজুড়ে রুশ তেল ও গ্যাসের জাহাজ শিকারে নেমেছে। রাশিয়া চীনের মোট তেল আমদানির ১৭ শতাংশ সরবরাহ করে। যদিও কিছু অংশ পাইপলাইনের মাধ্যমে আসে, কিন্তু বাকি বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সমুদ্রপথে সরবরাহ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্র জানত যে চীন ভেনেজুয়েলায় হারানো তেলের প্রতিস্থাপনের জন্য অবিলম্বে রাশিয়ার দিকে তাকাবে— তাই তাদের সরবরাহ বন্ধ করতে, ওয়াশিংটন ক্যারিবিয়ান থেকে আর্কটিক ও আটলান্টিকে মূল স্ট্রাইক গ্রুপগুলো পুনরায় মোতায়েন করে। এই কারণেই ন্যাটো ফেব্রুয়ারিতে ‘অপারেশন আর্কটিক সেন্ট্রি’ নীরবে প্রতিষ্ঠা করেছে। মূল উদ্দেশ্য রাশিয়ার সরবরাহ বাধাগ্রস্ত করা। সহজ ভাষায়, এটি একটি তেল ও গ্যাস নিষেধাজ্ঞা। ন্যাটো খোলাখুলি স্বীকার করছে যে তাদের লক্ষ্য বেইজিংয়ের জ্বালানি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজে প্রবেশাধিকার বিচ্ছিন্ন করা এবং রাশিয়ার সঙ্গে তাদের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য ব্যাহত করা। এই বিষয়গুলোর কোনোটিই নিরাপত্তাসংক্রান্ত নয়। এগুলো ভূ-কৌশলগত ও অর্থনৈতিক।

ইরান তাদের উৎপাদিত তেলের প্রায় ৬০ শতাংশ রপ্তানি করে এবং রাশিয়া ও ভেনেজুয়েলার মতো অধিকাংশ চীনে সরবরাহ করত। ইরান চীনে সমুদ্রবাহিত অপরিশোধিত তেল ১১ শতাংশ পাঠাত। ভেনেজুয়েলা ও রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ইরান থেকে সরবরাহ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল চীনের কাছে। চীনা সরকারি পরিসংখ্যান (জিএসিসি) অনুযায়ী ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তাদের মোট প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি ১৬.৩ শতাংশ কমেছে।

এসব কিছু চীন বোঝে। রাশিয়াও বোঝে। তাই ইরান যাতে পরাস্ত না হয়, সেজন্য পেছন থেকে রাশিয়া ও চীন দেরিতে হলেও কলকাঠি নাড়তে শুরু করেছে। ইউক্রেন যেমন ন্যাটোর প্রক্সি ফিল্ডে পরিণত হয়েছে বহু আগেই, ইরানও তেমনি চীন ও রাশিয়ার প্রক্সি ফিল্ডে পরিণত হয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধ অসমাপ্ত রেখেই নানা উসিলায় হাত গুটিয়ে নিয়েছে।

ইতোমধ্যে ট্রাম্প প্রশাসন সিনেট কমিটির সামনে স্বীকার করেছে, ইরান যুদ্ধে অন্যান্য ব্যয় ছাড়া প্রত্যক্ষ ব্যয় হয়েছে ২৯ বিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রের নিমিটজ শ্রেণির যুদ্ধজাহাজগুলো নিরাপদ দূরত্বে সরে গেছে। এফ-৩৫, এফ-১৫, সি-১৩০-এর মতো ব্যয়বহুল ও অপরাজেয় যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ২২৮টি ঘাঁটি ও স্থাপনা ইরান ধ্বংস করে দিয়েছে, যার ছবি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন পোস্টসহ চারটি শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা প্রকাশ করেছে।

চীন সাধারণত কোথাও আগ্রাসন চালায় না। কিন্তু চীনের বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারা আগুনে ঝাঁপ দিতেও প্রস্তুত। এরকম একটি অবস্থায় ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের কাছ থেকে কী ধরনের ছাড় আশা করতে পারেন? অবশ্যই ট্রাম্পের চীন সফর গুরুত্বপূর্ণ। এই সফরের ওপর নির্ভর করছে আবার যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধ শুরু হবে কি না।

অন্যদিকে চীন তাইওয়ান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো রকম আপস করবে না, এটা পরিষ্কার। চীন চাপ দেবে তাইওয়ানের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করতে। এক্ষেত্রে চীন কি ইরান ও রাশিয়াকে বলির পাঁঠা করতে পারে? সে প্রশ্ন কিন্তু আছে। তবে মনে হয় না। যদি তা করে, তাহলে চীনকে বৈশ্বিক প্রভাব তৈরির পথ থেকে পিছিয়ে যেতে হবে। ট্রাম্পের এই সফরের ফলাফল এখনই পুরোপুরি জানা যাবে না। তবে দুই দেশের মধ্যে যে তিক্ততা চলছে, তা কতটা প্রশমিত হবে, তা বোঝা যাবে ট্রাম্প ফিরে যাওয়ার পর।

লেখক: সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশ্লেষক।

এইচআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow