যে বয়সে ছেলের হাত ধরে হাঁটার কথা সে বয়সে করছেন বাঁচার লড়াই
একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বদলে দিয়েছে ৩৫ বছর বয়সি হাসানুজ্জামান রুবেলের জীবন। একসময় নিজের উপার্জনে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চলা রুবেল এখন নিজেই অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। প্রায় আট মাস ধরে চিকিৎসার পেছনে নিজের সর্বস্ব হারিয়েছেন। শরীরে একাধিক জটিলতা নিয়ে এখন অসহ্য যন্ত্রণায় দিন কাটছে তার। দুর্ঘটনার পর মেরুদণ্ড ও স্নায়ুর জটিলতার পাশাপাশি রুবেল আক্রান্ত হয়েছেন PLID (Prolapsed Lumbar Intervertebral Disc) রোগে। এতে কোমর ও মেরুদণ্ডে তীব্র ব্যথা, স্নায়ুতে চাপ এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। দিন-রাত প্রায় একই অবস্থায় কাটছে তার। কখনো ব্যথা এতটাই বেড়ে যায় যে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। উন্নত চিকিৎসার জন্য রুবেলকে বিদেশে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। দিল্লি অথবা থাইল্যান্ডে উন্নত চিকিৎসা করানো গেলে তার কিছুটা সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেই চিকিৎসার ব্যয় বহন করার সামর্থ্য নেই পরিবারের। সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয়, যে বয়সে বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার কথা পাঁচ বছরের ছোট্ট ছেলেটির, সেই ছেলেকেই এখন অসুস্থ বাবাকে সান্ত্বনা দিতে হয়। চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার গোরস্
একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই বদলে দিয়েছে ৩৫ বছর বয়সি হাসানুজ্জামান রুবেলের জীবন। একসময় নিজের উপার্জনে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে চলা রুবেল এখন নিজেই অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল। প্রায় আট মাস ধরে চিকিৎসার পেছনে নিজের সর্বস্ব হারিয়েছেন। শরীরে একাধিক জটিলতা নিয়ে এখন অসহ্য যন্ত্রণায় দিন কাটছে তার।
দুর্ঘটনার পর মেরুদণ্ড ও স্নায়ুর জটিলতার পাশাপাশি রুবেল আক্রান্ত হয়েছেন PLID (Prolapsed Lumbar Intervertebral Disc) রোগে। এতে কোমর ও মেরুদণ্ডে তীব্র ব্যথা, স্নায়ুতে চাপ এবং শরীরের বিভিন্ন অংশে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। দিন-রাত প্রায় একই অবস্থায় কাটছে তার। কখনো ব্যথা এতটাই বেড়ে যায় যে যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
উন্নত চিকিৎসার জন্য রুবেলকে বিদেশে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। দিল্লি অথবা থাইল্যান্ডে উন্নত চিকিৎসা করানো গেলে তার কিছুটা সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেই চিকিৎসার ব্যয় বহন করার সামর্থ্য নেই পরিবারের।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক বিষয়, যে বয়সে বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার কথা পাঁচ বছরের ছোট্ট ছেলেটির, সেই ছেলেকেই এখন অসুস্থ বাবাকে সান্ত্বনা দিতে হয়।
চুয়াডাঙ্গা পৌর এলাকার গোরস্থান পাড়ার একটি ভাড়া বাসায় স্ত্রী তানিয়া সুলতানা ও পাঁচ বছরের সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন হাসানুজ্জামান রুবেল।
এক সময় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে চাকরি করতেন তিনি। নিজের উপার্জনেই চলত সংসার। স্বপ্ন ছিল ছেলেকে স্কুলে ভর্তি করবেন, তার সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে দেবেন। কিন্তু একটি সড়ক দুর্ঘটনা মুহূর্তেই থামিয়ে দিয়েছে সেই স্বপ্ন।
২০২৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর বিকেলে যশোর থেকে কোম্পানির টাকা সংগ্রহ করে মোটরসাইকেলে বাড়ি ফিরছিলেন রুবেল। মোবারকগঞ্জ চিনিকলের সামনে পৌঁছালে একটি ট্রাকের সঙ্গে তার মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান তার চাচাতো ভাই ৩৫ বছর বয়সি আরিফ হোসেন। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রাণে বেঁচে যান রুবেল।
দুর্ঘটনার পর খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৬ থেকে ১৭ দিন চিকিৎসা নেন তিনি। এরপর দেশের বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা করিয়েছেন। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে চলেছে তার দীর্ঘ চিকিৎসার লড়াই।
ঘাড়ের নার্ভ ছিঁড়ে যাওয়ায় তার একটি হাত প্রায় পুরোপুরি প্যারালাইজড হয়ে গেছে। এর সঙ্গে PLID-এর কারণে মেরুদণ্ড ও স্নায়ুতে তৈরি হয়েছে তীব্র চাপ ও ব্যথা। ফলে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরাতো দূরের কথা, দিনের বেশিরভাগ সময়ই অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে কাটাতে হয় তাকে। চিকিৎসকদের আশঙ্কা, দ্রুত উন্নত চিকিৎসা করাতে না পারলে হাতটির কার্যকারিতা চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। এরই মধ্যে রুবেলের হার্টে পাঁচটি ব্লকও ধরা পড়েছে।
চিকিৎসা করাতে গিয়ে পরিবারের যা কিছু সহায়-সম্বল ছিল, তার প্রায় সবই শেষ হয়ে গেছে। অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকা, তার ওপর ভাড়া বাসায় সংসার খরচ ও ওষুধের ব্যয় মেটাতেই এখন হিমশিম খেতে হচ্ছে পরিবারটিকে। এমন অবস্থায় বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করানো তাদের কাছে যেন অসম্ভব এক স্বপ্ন।
রুবেলের স্ত্রী তানিয়া সুলতানা বলেন, আমাদের যা কিছু ছিল, সবকিছু দিয়েই এতদিন ওর চিকিৎসা চালিয়ে গেছি। এখন আমাদের হাতে আর কিছুই নেই। চিকিৎসার খরচতো দূরের কথা, সংসার চালিয়ে খেয়ে বেঁচে থাকাটাই কঠিন হয়ে পড়েছে। আমাদের ছোট ছেলেটাকে স্কুলে ভর্তি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ওর বাবারও অনেক স্বপ্ন ছিল ছেলেকে নিয়ে। কিন্তু দুর্ঘটনার পর সবকিছু থেমে গেছে। আমার স্বামী প্রতিদিন প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছেন। একজন স্ত্রী হিসেবে তার এই কষ্ট আর অসহায়ত্ব দেখে নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। সমাজের বিত্তবান ও সামর্থ্যবান মানুষ যদি আমাদের পাশে দাঁড়ান, তাহলে হয়ত আমার স্বামী আবার সুস্থ জীবনে ফিরতে পারবেন।
অসহ্য যন্ত্রণায় ভেঙে পড়েছেন রুবেল। PLID-এর তীব্র ব্যথা ও শারীরিক যন্ত্রণা কখনো কখনো তাকে এমন অবস্থায় নিয়ে যায় যে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। নিজের কষ্টের কথা জানাতে কখনো ফেসবুক লাইভেও আসেন।
রুবেল বলেন, আমি আর এই কষ্ট সহ্য করতে পারছি না। প্রতিদিন মনে হয় শরীরের ভেতরটা কেউ যেন ছিঁড়ে ফেলছে। আমার হাতটা ঠিকমতো কাজ করে না, সারাক্ষণ ব্যথা থাকে। ডাক্তার বলেছে খুব দ্রুত চিকিৎসা না করাতে পারলে চিরতরে হাতটা কার্যকারিতা হারাবে। দেশে চিকিৎসা করাতে গিয়েই আমার যা কিছু ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। এখন বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানোর কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু সেই টাকা আমি ও আমার পরিবারের পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব নয়। এসব সহ্য করতে না পেরে এর আগে কয়েকবার নিজেকে শেষ করার চিন্তা করেছি। আমি মরতে চাই না, আমি বাঁচতে চাই। আমার ছোট ছেলেটার জন্য বাঁচতে চাই। ও আমাকে বলে, ‘বাবা, আমি তো আছি, তোমার কিছু হবে না।’ ওর এই কথাটা শুনলে মনে হয়, আমাকে বাঁচতেই হবে। আমি আবার ছেলের হাত ধরে হাঁটতে চাই, তাকে স্কুলে নিয়ে যেতে চাই। সমাজের মানুষ যদি আমার পাশে দাঁড়ান, তাহলে হয়ত আমি আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব।
চুয়াডাঙ্গা জেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক জাকির হোসেন বলেন, হাসানুজ্জামান রুবেলের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন করা হলে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আর্থিক সহায়তার বিষয়টি যাচাই করে দেখা হবে। অসহায় ও দুস্থ রোগীদের চিকিৎসায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন কর্মসূচি ও তহবিল থেকে সহায়তার সুযোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পরিবারকে সব ধরনের দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে।
হুসাইন মালিক/এফএ/জেআইএম
What's Your Reaction?