রাষ্ট্র কেন নাগরিককে প্রতিটি সংকটে একা ছেড়ে দেয়?
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখা গেল, বাসায় গ্যাস নেই। রান্না হয়নি। সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে হবে, অফিসে যেতে হবে। বাধ্য হয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার কিনতে হলো। দুপুরে অফিসে যাওয়ার পথে যানজট। গণপরিবহন অনিয়মিত। কোথাও বিদ্যুৎ নেই, কোথাও পানির সংকট। সন্ধ্যায় বাজারে গিয়ে দেখা গেল, নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। রাতে বাড়ি ফিরে বিদ্যুৎ চলে গেল। ফ্রিজের খাবার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা, শিশুর পড়াশোনা বন্ধ, অসুস্থ বৃদ্ধের কষ্ট—সব মিলিয়ে একটি সাধারণ পরিবারের একটি দিন যেন একাধিক সংকটের সমষ্টি। এই সংকটগুলোর কোনোটি হয়তো একা খুব বড় নয়। কিন্তু একটির সঙ্গে আরেকটি যুক্ত হয়ে যখন নাগরিকের জীবনকে প্রতিদিনের উদ্বেগ, বাড়তি খরচ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্র কেন নাগরিককে প্রতিটি সংকটে প্রায় একা ছেড়ে দেয়? বাংলাদেশে এই প্রশ্নটি এখন আর কেবল রাজনৈতিক বা দার্শনিক প্রশ্ন নয়; এটি সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাপনের প্রশ্ন। গ্যাস নেই—বিকল্প ব্যবস্থা করুন। বিদ্যুৎ নেই—আইপিএস বা জেনারেটর কিনুন। পানি নেই—জার কিনুন। গণপরিবহন নেই—রাইড শেয়ারিং ব্যবহার করুন। চিকিৎসা ব্যয়বহুল—বিমা করুন। শিক্ষার মান নিয়ে সমস্যা—কোচ
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখা গেল, বাসায় গ্যাস নেই। রান্না হয়নি। সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে হবে, অফিসে যেতে হবে। বাধ্য হয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার কিনতে হলো। দুপুরে অফিসে যাওয়ার পথে যানজট। গণপরিবহন অনিয়মিত। কোথাও বিদ্যুৎ নেই, কোথাও পানির সংকট। সন্ধ্যায় বাজারে গিয়ে দেখা গেল, নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। রাতে বাড়ি ফিরে বিদ্যুৎ চলে গেল। ফ্রিজের খাবার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা, শিশুর পড়াশোনা বন্ধ, অসুস্থ বৃদ্ধের কষ্ট—সব মিলিয়ে একটি সাধারণ পরিবারের একটি দিন যেন একাধিক সংকটের সমষ্টি।
এই সংকটগুলোর কোনোটি হয়তো একা খুব বড় নয়। কিন্তু একটির সঙ্গে আরেকটি যুক্ত হয়ে যখন নাগরিকের জীবনকে প্রতিদিনের উদ্বেগ, বাড়তি খরচ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—রাষ্ট্র কেন নাগরিককে প্রতিটি সংকটে প্রায় একা ছেড়ে দেয়?
বাংলাদেশে এই প্রশ্নটি এখন আর কেবল রাজনৈতিক বা দার্শনিক প্রশ্ন নয়; এটি সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনযাপনের প্রশ্ন।
গ্যাস নেই—বিকল্প ব্যবস্থা করুন। বিদ্যুৎ নেই—আইপিএস বা জেনারেটর কিনুন। পানি নেই—জার কিনুন। গণপরিবহন নেই—রাইড শেয়ারিং ব্যবহার করুন। চিকিৎসা ব্যয়বহুল—বিমা করুন। শিক্ষার মান নিয়ে সমস্যা—কোচিংয়ে ভর্তি করুন। বাজারে পণ্যের দাম বেশি—কম কিনুন। নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—নিজের নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিজেই করুন।
রাষ্ট্রের প্রকৃত মানবিকতা বোঝা যায় তার স্বাভাবিক সময়ে নয়; সংকটের সময়ে। স্বাভাবিক সময়ে সবাই উন্নয়নের কথা বলতে পারে। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে একজন সাধারণ নাগরিকের পাশে দাঁড়ানোর সামর্থ্যই বলে দেয়, রাষ্ট্র কতটা সক্ষম, কতটা দায়িত্বশীল এবং কতটা মানবিক। আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি বা দ্রব্যমূল্যের সংকট নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো—নাগরিকের মনে এই বিশ্বাস জন্ম নেওয়া যে, বিপদে পড়লে তাঁকে নিজের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হবে।
রাষ্ট্রের সেবার ঘাটতি পূরণ করতে করতে নাগরিকের জীবনে এমন এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে নাগরিক শুধু রাষ্ট্রকে করই দিচ্ছেন না; রাষ্ট্রের ব্যর্থতার মূল্যও দিচ্ছেন।
সাম্প্রতিক গ্যাস সংকটের কথাই ধরা যাক। পাইপলাইনে গ্যাস নেই, কিন্তু গ্যাসের বিল আছে। রান্না করা যাচ্ছে না, তাই রেস্টুরেন্টে খেতে হচ্ছে। কেউ ইলেকট্রিক চুলা ব্যবহার করছেন, ফলে বিদ্যুৎ বিল বাড়ছে। কেউ সিলিন্ডার কিনছেন, বাড়ছে বাড়তি খরচ। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় সেবার ঘাটতির কারণে নাগরিককে একই প্রয়োজনের জন্য একাধিকবার অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
এটি শুধু গ্যাসের ক্ষেত্রে নয়। বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত হলে নাগরিককে আইপিএস বা জেনারেটর কিনতে হয়। পানি সরবরাহ অনির্ভরযোগ্য হলে বোতলজাত পানি কিনতে হয়। গণপরিবহন দুর্বল হলে মানুষকে ব্যক্তিগত যানবাহন বা ব্যয়বহুল বিকল্প পরিবহন ব্যবহার করতে হয়। সরকারি হাসপাতালের সেবায় আস্থা না থাকলে বেসরকারি হাসপাতালে যেতে হয়। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার ঘাটতি পূরণ করতে পরিবারকে কোচিং, প্রাইভেট টিউশন ও নানা অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা বহন করতে হয়।
এভাবে নাগরিকের আয় বাড়ার আগেই তাঁর জীবনযাপনের ব্যয় বাড়তে থাকে।
অর্থনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা আছে—‘কস্ট অব লিভিং’ বা জীবনযাপনের ব্যয়। কিন্তু বাংলাদেশের নাগরিকের জন্য শুধু জীবনযাপনের ব্যয় নয়, ‘রাষ্ট্রের ব্যর্থতার ব্যয়’ও বহন করতে হয়। একটি সেবা রাষ্ট্র দিতে না পারলে তার বিকল্প কিনতে হয় নাগরিককে। ফলে রাষ্ট্রীয় সেবার ঘাটতি শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিগত ব্যয়ে পরিণত হয়।
প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের দায়িত্ব কী?
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, কর আদায় বা প্রশাসনিক কাঠামো পরিচালনা নয়। আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো নাগরিকের মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা। নিরাপদ পানি, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, কার্যকর গণপরিবহন, সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা—এসব কোনো বিলাসিতা নয়; এগুলো নাগরিক অধিকারের অংশ।
কিন্তু আমাদের বাস্তবতা অনেক সময় উল্টো কথা বলে। নাগরিক রাষ্ট্রকে কর দেন, বিল দেন, নানা ধরনের ফি দেন, নিয়ম মানেন। বিনিময়ে তিনি এমন সেবা পান, যার জন্য তাঁকে আবার ব্যক্তিগতভাবে অর্থ ব্যয় করতে হয়।
এখানেই রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের একটি মৌলিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে।
সংকটের সময় এই ভারসাম্যহীনতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোনো পণ্যের দাম বাড়লে সাধারণ মানুষকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়। জ্বালানি সংকট হলে বলা হয়, বিকল্প ব্যবহার করুন। বিদ্যুৎ সংকট হলে বলা হয়, বিদ্যুৎ সাশ্রয় করুন। পানি সংকট হলে বলা হয়, পানির অপচয় বন্ধ করুন। অবশ্যই নাগরিকেরও দায়িত্ব আছে। কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়?
নাগরিককে সাশ্রয়ী হতে বলা সহজ। কিন্তু রাষ্ট্র কি তার নিজস্ব অপচয় কমায়? সরকারি প্রকল্পে ব্যয় বাড়ে, প্রশাসনিক অপচয় হয়, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে—এসবের মূল্য শেষ পর্যন্ত কে দেয়? জনগণই দেয়। করের মাধ্যমে, মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে, সেবার নিম্নমানের মাধ্যমে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সংকটের সঙ্গে যখন ব্যবসায়িক স্বার্থ যুক্ত হয়, তখন নাগরিকের অসহায়ত্ব আরও বাড়ে। কোনো সংকট দেখা দিলে বাজারে গুজব ছড়ায়, পণ্য মজুত হয়, কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, দাম বাড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়লেই মানুষ পাম্পে ছুটে যায়, বাজারে ছুটে যায়। আতঙ্ক নিজেই তখন বাজারের একটি পণ্য হয়ে ওঠে।
এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু ‘সংকট নেই’ বলে বিবৃতি দেওয়া নয়। রাষ্ট্রকে নাগরিকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ আস্থার ঘাটতি থেকেই গুজবের জন্ম হয়। মানুষ যখন জানেন না আগামীকাল গ্যাস থাকবে কি না, বিদ্যুৎ থাকবে কি না, পণ্যের দাম কত হবে—তখন গুজবই তাঁর তথ্যের বিকল্প হয়ে ওঠে।
একটি কার্যকর রাষ্ট্র সংকটকে অস্বীকার করে না; সংকটের আগেই প্রস্তুতি নেয়।
জ্বালানি খাতে আমাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি এর একটি বড় উদাহরণ। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, জ্বালানি মজুত, আমদানির বৈচিত্র্য, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার—এসব বিষয়ে ধারাবাহিক পরিকল্পনা না থাকলে একটি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি বা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি পুরো অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলে। একইভাবে খাদ্য, পানি, স্বাস্থ্য ও নগর ব্যবস্থাপনায়ও সংকট মোকাবিলার স্থায়ী প্রস্তুতি প্রয়োজন।
বিশ্বের অনেক দেশ সংকট ব্যবস্থাপনাকে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি, জ্বালানি সংকট বা অর্থনৈতিক মন্দা—কোনো সংকটই পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। কিন্তু একটি সক্ষম রাষ্ট্র নাগরিককে বলে না, ‘আপনার সমস্যা আপনি সমাধান করুন।’ বরং রাষ্ট্র সংকটের সময়ে মানুষের ওপর চাপ কমানোর ব্যবস্থা করে।
এখানেই আমাদের পরিবর্তন দরকার।
রাষ্ট্রকে ‘সংকট-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া’ থেকে ‘সংকট-পূর্ব প্রস্তুতি’র দিকে যেতে হবে। গ্যাস শেষ হয়ে গেলে বিকল্প খোঁজা নয়; আগে থেকেই সরবরাহের ঝুঁকি বিশ্লেষণ করতে হবে। বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দিলে লোডশেডিং নয়; উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে হবে। বাজারে দাম বাড়ার পর অভিযান নয়; সরবরাহব্যবস্থা, মজুত, আমদানি ও বাজার তদারকির কার্যকর ব্যবস্থা আগে থেকেই থাকতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নাগরিককে শুধু ভোক্তা হিসেবে দেখলে চলবে না। তিনি রাষ্ট্রের মালিকও। তাঁর করের অর্থে রাষ্ট্র পরিচালিত হয়। তাঁর শ্রমে অর্থনীতি সচল থাকে। তাঁর ভোটে সরকার ক্ষমতায় আসে। ফলে সংকটের সময়ে নাগরিককে পরিত্যক্ত বা অসহায় ভোক্তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের জীবনকে সহজ করা। সব সংকট দূর করা রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সংকটের অভিঘাত কমানো সম্ভব। সব সময় গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়তো কঠিন; কিন্তু বিকল্প জ্বালানি, জরুরি সরবরাহ ও ক্ষতিপূরণমূলক ব্যবস্থার পরিকল্পনা করা সম্ভব। সব সময় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা হয়তো কঠিন; কিন্তু সিন্ডিকেট, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। সব সময় যানজট দূর করা হয়তো সম্ভব নয়; কিন্তু একটি কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব।
রাষ্ট্রের সক্ষমতা শুধু তার বড় বড় প্রকল্পে নয়; নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে কতটা স্বস্তি তৈরি করতে পারে, তার মধ্যেই রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য।
একজন সাধারণ মানুষ যেন গ্যাসের জন্য রাত জাগতে না হয়, পানির জন্য লাইনে দাঁড়াতে না হয়, চিকিৎসার খরচে সর্বস্বান্ত না হন, সন্তানের শিক্ষা নিয়ে উদ্বেগে না থাকেন, বাজারে গিয়ে প্রতিদিন নতুন দামের ধাক্কা না খান—এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে বড় মানদণ্ড।
কারণ উন্নয়ন শুধু উড়ালসড়ক, সেতু বা বড় অবকাঠামোর নাম নয়। উন্নয়ন হলো—একজন নিম্নআয়ের মানুষ মাসের শেষে কিছু টাকা সঞ্চয় করতে পারছেন কি না; একটি পরিবার অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য ঋণগ্রস্ত হচ্ছে কি না; একজন মা নিশ্চিন্তে সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে পারছেন কি না; একজন নাগরিক রাষ্ট্রের সেবা পেতে গিয়ে অপমানিত, হয়রান বা নিঃস্ব হচ্ছেন কি না।
রাষ্ট্র যদি প্রতিটি সংকটে নাগরিককে নিজের ব্যবস্থা নিজে করতে বলে, তবে একসময় নাগরিকের মনে একটি বিপজ্জনক প্রশ্ন জন্ম নেয়—তাহলে রাষ্ট্রের প্রয়োজন কী?
এই প্রশ্নের উত্তর কোনো সরকারই এড়িয়ে যেতে পারে না।
রাষ্ট্রের শক্তি শুধু তার আইন, প্রশাসন বা বাজেটে নয়; রাষ্ট্রের শক্তি নাগরিকের আস্থায়। নাগরিক যদি বিশ্বাস করেন, বিপদের সময়ে রাষ্ট্র তাঁর পাশে দাঁড়াবে, তাহলে তিনি সংকট মোকাবিলা করতে পারেন। কিন্তু যদি তাঁর অভিজ্ঞতা হয়—সংকট এলেই তাঁকে একা দাঁড়াতে হবে, নিজের অর্থে নিজের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, পানি, জ্বালানি ও পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে—তাহলে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক ধীরে ধীরে আস্থার সম্পর্ক থেকে কেবল লেনদেনের সম্পর্কে পরিণত হয়।
একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে সফল, যখন নাগরিককে প্রতিটি বিপদের মুহূর্তে বলতে হয় না—‘নিজের ব্যবস্থা নিজে করুন।’
বরং নাগরিক জানেন, সংকট যত বড়ই হোক, রাষ্ট্র তাঁকে একা ছেড়ে যাবে না।
এই আস্থাই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ। আর সেই আস্থা হারিয়ে গেলে কোনো উন্নয়ন, কোনো পরিসংখ্যান, কোনো বড় প্রকল্পই নাগরিকের নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে পারে না।
আজ তাই প্রশ্নটি শুধু ‘সংকট কেন হচ্ছে’—এটি নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সংকটের পুরো দায় কেন বারবার নাগরিকের ঘাড়ে এসে পড়ে?
যে রাষ্ট্র নাগরিকের কাছ থেকে কর নেয়, আইন মানতে বলে, দায়িত্ব পালন করতে বলে, ভোট চায়—সেই রাষ্ট্রেরও নাগরিকের প্রতি একটি অঙ্গীকার আছে। সেই অঙ্গীকার হলো—বিপদের সময় পাশে থাকা, সংকটের অভিঘাত কমানো এবং নাগরিককে তার নিজের ভাগ্যের ওপর সম্পূর্ণ ছেড়ে না দেওয়া।
রাষ্ট্রের প্রকৃত মানবিকতা বোঝা যায় তার স্বাভাবিক সময়ে নয়; সংকটের সময়ে। স্বাভাবিক সময়ে সবাই উন্নয়নের কথা বলতে পারে। কিন্তু সংকটের মুহূর্তে একজন সাধারণ নাগরিকের পাশে দাঁড়ানোর সামর্থ্যই বলে দেয়, রাষ্ট্র কতটা সক্ষম, কতটা দায়িত্বশীল এবং কতটা মানবিক।
আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট হয়তো গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি বা দ্রব্যমূল্যের সংকট নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো—নাগরিকের মনে এই বিশ্বাস জন্ম নেওয়া যে, বিপদে পড়লে তাঁকে নিজের ব্যবস্থা নিজেকেই করতে হবে।
এই বিশ্বাস বদলাতে না পারলে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের দূরত্ব আরও বাড়বে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।
[email protected]
এইচআর/এমএফএ/এএসএম
What's Your Reaction?