রাসেলের লেন্সে অনবদ্য মানবজীবনের প্রতিচিত্র

মুহাম্মদ শফিকুর রহমানবাংলাদেশের সমসাময়িক ফটোগ্রাফিতে মোঃ আবু রাসেল একটি পরিচিত মুখ। রায়েরবাজার বধ্যভূমিকে কেন্দ্র করে তার ধারাবাহিক কাজ তাকে এনে দিয়েছে ‘সেলিব্রেটিং লাইফ’-এর গ্র্যান্ড পুরস্কার এবং আইএবি গোল্ডেন জুবলি সেলিব্রেশনের শীর্ষ স্বীকৃতি। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, ধারাবাহিকতা এবং বিষয়বস্তুর প্রতি গভীর মনোযোগ তাকে আলাদা করেছে অন্যদের থেকে। মানুষের উপস্থিতি ও আবেগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তার ফটোগ্রাফি আজ দেশের ভেতরে বাইরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রকাশিত হয়। রাসেলের জন্ম কুষ্টিয়ায়। বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীতে। তাই শৈশব কেটেছে বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে। মাঠে খেলাধুলার দুনিয়াতেই ছিল তার বড় হওয়া। স্বপ্ন ছিল ক্রিকেটার হওয়ার। সারাদিন ব্যাট-বলেই কাটত সময়। ক্রিকেটে বেশ ভালো ছিলেন। জাতীয় দলে খেলার কল্পনাও করতেন। পরে পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াতে হয়। অ্যাকাউন্টিং বিভাগ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপর জীবন নেমে আসে কর্মজীবনের পথে। এখন ঢাকায় চাকরি ও পরিবার নিয়ে তার ব্যস্ত দিনযাপন। ফটোগ্রাফিতে পথচলার শুরু ২০১১ সালের দিকে। কুষ্টিয়ার ‘পাখিরবাসা’ নামে একটি সংগঠনের আড্ডা থেকেই প্রথম ছবি তোলার অনুপ্রেরণা পান তিনি।

রাসেলের লেন্সে অনবদ্য মানবজীবনের প্রতিচিত্র

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
বাংলাদেশের সমসাময়িক ফটোগ্রাফিতে মোঃ আবু রাসেল একটি পরিচিত মুখ। রায়েরবাজার বধ্যভূমিকে কেন্দ্র করে তার ধারাবাহিক কাজ তাকে এনে দিয়েছে ‘সেলিব্রেটিং লাইফ’-এর গ্র্যান্ড পুরস্কার এবং আইএবি গোল্ডেন জুবলি সেলিব্রেশনের শীর্ষ স্বীকৃতি।

দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, ধারাবাহিকতা এবং বিষয়বস্তুর প্রতি গভীর মনোযোগ তাকে আলাদা করেছে অন্যদের থেকে। মানুষের উপস্থিতি ও আবেগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা তার ফটোগ্রাফি আজ দেশের ভেতরে বাইরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রকাশিত হয়।

রাসেলের জন্ম কুষ্টিয়ায়। বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীতে। তাই শৈশব কেটেছে বিভিন্ন ক্যান্টনমেন্টে। মাঠে খেলাধুলার দুনিয়াতেই ছিল তার বড় হওয়া। স্বপ্ন ছিল ক্রিকেটার হওয়ার। সারাদিন ব্যাট-বলেই কাটত সময়। ক্রিকেটে বেশ ভালো ছিলেন। জাতীয় দলে খেলার কল্পনাও করতেন। পরে পড়াশোনায় মনোযোগ বাড়াতে হয়। অ্যাকাউন্টিং বিভাগ থেকে মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। এরপর জীবন নেমে আসে কর্মজীবনের পথে। এখন ঢাকায় চাকরি ও পরিবার নিয়ে তার ব্যস্ত দিনযাপন।

ফটোগ্রাফিতে পথচলার শুরু ২০১১ সালের দিকে। কুষ্টিয়ার ‘পাখিরবাসা’ নামে একটি সংগঠনের আড্ডা থেকেই প্রথম ছবি তোলার অনুপ্রেরণা পান তিনি। তখন প্রতি শুক্রবার সেই আড্ডায় হত ফটোগ্রাফির বিভিন্ন আলোচনা। সিনিয়ররা শেখাতেন খুঁটিনাটি। সবাই মিলে দলবেঁধে বের হতেন ছবি তুলতে। অনেকেই ফটোগ্রাফি ছেড়ে দিলেও রাসেল থেমে যাননি। আজও নিরবচ্ছিন্নভাবে ধরে রেখেছেন সেই যাত্রা।

প্রথমবার যখন ডিএসএলআর হাতে নেন, নতুন জগত খুলে যায় চোখের সামনে। ভিউফাইন্ডারের ভেতর এক অদ্ভুত সৌন্দর্য তাকে আকর্ষণ করে। তখনই ঠিক করেন ছবি তুলবেন নিয়মিত। অনেক কিছু থাকা সত্ত্বেও তিনি বেছে নেন এই সৃজনশীল মাধ্যম। তবে এটি এখনো তার পেশা নয়। চাকরি তার প্রধান কাজ। কিন্তু ছবি তোলা তার নেশা। দুটোকে একসঙ্গে সামলানো কঠিন হলেও তিনি চেষ্টা করেন দুই জায়গাতেই নিজেকে সৎভাবে ধরে রাখতে।

প্রথমদিকে বিভিন্ন রকম বিষয়েই ছবি তুলতেন। শহর, প্রকৃতি, জীবনযাপন সবকিছুর ওপরই কাজ করতেন সমান আগ্রহে। ২০১৩ সালের দিকে বুঝতে পারেন মানুষই তার ছবির প্রধান বিষয়। মানুষের মুখ, চোখ, ভঙ্গি আর আবেগ তাকে টানে। তাই চেষ্টা করেন ছবিতে মানুষের উপস্থিতি রাখতে। তার বিশ্বাস ইমোশনই ছবির প্রাণ। আর সেই আবেগ দিয়েই দর্শকের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা যায়।

ফটোগ্রাফিতে তার সরলতা যেন তার ব্যক্তিত্বের প্রতিচ্ছবি। তিনি বলেন জীবন যেমন সরল, ছবিও তেমনই রাখতে চান। অযথা সাজসজ্জা বা জটিলতার দিকে যান না। তিনি গল্প তুলে ধরতে ভালোবাসেন সহজভাবে।

ক্যামেরা হাতে নেওয়ার শুরুটা ক্যানন ১১০০ডি দিয়ে। পরে দীর্ঘদিন ব্যবহার করেন কাজিনের নিকন ডি৭০০০। বর্তমানে ব্যবহার করছেন ফুজিফিল্ম এক্সটি৩। নিজের টাকায় কেনা এটাই তার প্রথম বড় ক্যামেরা। ক্যামেরা নিয়ে তার জীবনে একটি মজার অভিজ্ঞতাও আছে। শুরুতে এক বড়ভাইয়ের কাছ থেকে একটি ফিল্ম ক্যামেরা নিয়ে ছবি তুলেছিলেন। সারাদিন ধরে শুট। রাতে ঘুম হয়নি ছবি কেমন হবে এই দুশ্চিন্তায়। পরের দিন ছবি হাতে পেয়ে আবিষ্কার করেন পুরো রোল সাদা। পরে জানা যায় ক্যামেরায় সমস্যা ছিল। ঠিক করার পর আবার ছবি তোলেন। তখনই প্রথম সঠিক ছবি পান হাতে। সেই মুহূর্ত তিনি এখনো ভুলতে পারেন না।

ছবি তুলতে গিয়ে তেমন কোনো চরম বিপদের মুখে পড়েননি তিনি, কারণ দূরে ভ্রমণ করা তার অভ্যাস নয়। তার বিশ্বাস ভালো ছবি প্রায়ই আশপাশেই লুকিয়ে থাকে। বিখ্যাত আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের একটি কথা তিনি মনে ধারণ করেন ‘ভালো ছবি নিজের ঘরের কাছেই থাকে।’ সেই দর্শন থেকেই তিনি কুষ্টিয়া ও ঢাকার আশেপাশেই কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। এতে সময় ও ব্যয়ের চাপও কমে আসে।

শেখার পথে তিনি বড় ফটোগ্রাফারদের অনুসরণ করেছেন। তাদের ছবি দেখে শিখেছেন। কয়েকটি কর্মশালায় অংশ নিয়েছেন দক্ষতা বাড়ানোর জন্য। তবে সবচেয়ে বেশি শিখেছেন হাসান চন্দন এর কাছ থেকে। তার সঙ্গে অনেক ছবি তুলেছেন। প্রতিটি সফরে নতুন কিছু শিখতে পেরেছেন।

রায়েরবাজার বধ্যভূমি তার কাজের অন্যতম প্রিয় জায়গা। ২০১৩ সাল থেকে সেখানে নিয়মিত ছবি তুলছেন। প্রতিটি ইট তার কাছে পরিচিত হয়ে গেছে। এখানকার দুইটি ছবি তাকে এনে দিয়েছে দেশের দুই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার। তার ইচ্ছা আছে একদিন রায়েরবাজার নিয়ে একটি বই প্রকাশ করার।

দেশের সংবাদমাধ্যমে তার ছবি ছাপা হয়েছে ডেইলি অবজারভার এবং ডেইলি ইন্ডিপেনডেন্ট-এ। দেশের বাইরে তাঁর কাজ প্রকাশ হয়েছে ১২১ ক্লিক্স এবং অস্ট্রেলিয়ার অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘ওয়েস্ট জোন’-এ।

একক ও যৌথ প্রদর্শনী মিলিয়ে ত্রিশের বেশি এক্সিবিশনে অংশ নিয়েছেন তিনি। ২০২৫ সালের ৮ ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে তার প্রথম একক প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয় যা তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতিগুলোর একটি।

তার মা ছেলের এই সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। বাবা বিষয়টি ভালোভাবে বুঝতেন না। তাই উৎসাহ দেওয়ার মতো কেউ বেশি ছিলেন না। কিন্তু এখন পরিবার সহধর্মিণী ও সন্তান তার শক্তি। তারা সমর্থন দেন, উৎসাহ দেন। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি খুব সাধারণ কথা বলেন, ‘শক্তি থাকা পর্যন্ত ছবি তুলতে চাই। নিজের মতো করে। আনন্দ নিয়ে।’

আরও পড়ুন
বিয়েতে পুরুষত্বের প্রমাণ দিতে সহ্য করতে হয় চাবুকের আঘাত
নতুন প্রজন্ম জানে না শহীদ আসাদের ইতিহাস!

কেএসকে/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow