রিলস বানাতে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে আসল আড্ডা?

একসময় বাংলাদেশের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের অন্যতম সৌন্দর্য ছিল আড্ডা। ঈদের ছুটি মানেই আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া, দুপুরের খাবারের পর গল্পে মেতে ওঠা, সন্ধ্যায় উঠানে বা বারান্দায় চায়ের কাপ হাতে দীর্ঘ আলাপ। দুর্গাপূজা, নববর্ষ, গরমের ছুটি কিংবা বর্ষার অলস বিকেল; প্রতিটি উপলক্ষই ছিল মানুষে মানুষে সংযোগের এক অনন্য মাধ্যম। পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের গল্প, ছোটদের হাসি-ঠাট্টা, মামা-খালা-ফুফুদের স্মৃতিচারণ; এসবই ছিল আমাদের সামাজিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপট বদলেছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, তবে এর কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বর্তমানে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার মানুষের অবসর সময়ের বড় একটি অংশ দখল করে নিয়েছে। বিশেষ করে রিলস বা স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও তৈরির প্রবণতা এমন এক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে মুহূর্ত উপভোগ করার চেয়ে সেটিকে ক্যামেরাবন্দি করে প্রকাশ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আজকাল দেখা যায়, ঈদের দিন পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসেছে ঠিকই, কিন্তু প্রাণবন্ত আল

রিলস বানাতে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে আসল আড্ডা?

একসময় বাংলাদেশের পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের অন্যতম সৌন্দর্য ছিল আড্ডা। ঈদের ছুটি মানেই আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে যাওয়া, দুপুরের খাবারের পর গল্পে মেতে ওঠা, সন্ধ্যায় উঠানে বা বারান্দায় চায়ের কাপ হাতে দীর্ঘ আলাপ। দুর্গাপূজা, নববর্ষ, গরমের ছুটি কিংবা বর্ষার অলস বিকেল; প্রতিটি উপলক্ষই ছিল মানুষে মানুষে সংযোগের এক অনন্য মাধ্যম। পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের গল্প, ছোটদের হাসি-ঠাট্টা, মামা-খালা-ফুফুদের স্মৃতিচারণ; এসবই ছিল আমাদের সামাজিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপট বদলেছে। প্রযুক্তির অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে ঠিকই, তবে এর কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বর্তমানে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক কিংবা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যাপক বিস্তার মানুষের অবসর সময়ের বড় একটি অংশ দখল করে নিয়েছে। বিশেষ করে রিলস বা স্বল্পদৈর্ঘ্য ভিডিও তৈরির প্রবণতা এমন এক সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে মুহূর্ত উপভোগ করার চেয়ে সেটিকে ক্যামেরাবন্দি করে প্রকাশ করাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

আজকাল দেখা যায়, ঈদের দিন পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসেছে ঠিকই, কিন্তু প্রাণবন্ত আলাপের পরিবর্তে অনেকেই ব্যস্ত মোবাইলের পর্দায়। কেউ ভিডিও ধারণ করছেন, কেউ ছবি তুলছেন, কেউ আবার সেই মুহূর্তটি সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশের জন্য সম্পাদনায় ব্যস্ত। একই ঘরে উপস্থিত থেকেও যেন মানুষ একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। বাস্তবের সম্পর্কের জায়গা দখল করছে ভার্চুয়াল উপস্থিতি।

প্রশ্ন হলো, এটি কি কেবল সময়ের পরিবর্তন নাকি সামাজিক অবক্ষয়ের লক্ষণ?

প্রযুক্তিকে কখনোই এককভাবে দায়ী করা যায় না। কারণ প্রযুক্তি নিজে ভালো বা মন্দ নয়; এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে এর প্রভাব। কিন্তু যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উপস্থিতি বাস্তব জীবনের সম্পর্কের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখন তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরিবারে একসঙ্গে বসেও যদি কথা না হয়, বন্ধুদের আড্ডা যদি কনটেন্ট তৈরির প্রকল্পে পরিণত হয়, তাহলে সম্পর্কের স্বাভাবিক উষ্ণতা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

মনোবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, মানুষের মানসিক সুস্থতার জন্য সরাসরি সামাজিক যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুখোমুখি কথোপকথন, অনুভূতি ভাগাভাগি এবং পারস্পরিক মনোযোগ মানুষের আবেগগত বন্ধনকে শক্তিশালী করে। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমনির্ভর জীবনধারা সেই জায়গাটিকে সংকুচিত করছে। মানুষ এখন অনেক সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার চেয়ে অনলাইন দর্শকের প্রতিক্রিয়া নিয়ে বেশি আগ্রহী হয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশের মতো পারিবারিক বন্ধননির্ভর সমাজে এই পরিবর্তন আরও তাৎপর্যপূর্ণ। আমাদের সংস্কৃতির শক্তি ছিল পারিবারিক ঐক্য, আন্তরিকতা এবং সামাজিক সম্প্রীতি। যদি নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীরে আড্ডার সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলে, তাহলে ভবিষ্যতে পারিবারিক সম্পর্কের গভীরতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। প্রবীণরা একাকী হয়ে পড়তে পারেন, শিশুদের সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের আবেগগত সংযোগ কমে যেতে পারে এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার ক্ষেত্র সংকুচিত হতে পারে।

তবে পরিস্থিতি অপরিবর্তনীয় নয়। সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করা যাবে, রিলসও তৈরি করা যাবে; কিন্তু বাস্তব সম্পর্কের মূল্য যেন বিস্মৃত না হয়। ঈদের দিন কিংবা পারিবারিক অনুষ্ঠানে কিছু সময় মোবাইল দূরে রেখে গল্পে মেতে ওঠা, পরিবারের প্রবীণদের কথা শোনা, শিশুদের সঙ্গে সময় কাটানো; এসব অভ্যাস ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন। কারণ একটি রিলস কয়েক সেকেন্ডের বিনোদন দিতে পারে, কিন্তু একটি আন্তরিক আড্ডা তৈরি করতে পারে আজীবনের স্মৃতি।

ডিজিটাল যুগের এই বাস্তবতায় আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য রক্ষা করা। প্রযুক্তি যেন মানুষের সম্পর্ককে সমৃদ্ধ করে, প্রতিস্থাপন না করে। কারণ জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান মুহূর্তগুলো অনেক সময় ক্যামেরার ফ্রেমে নয়, মানুষের হৃদয়ের ভেতরেই সবচেয়ে সুন্দরভাবে সংরক্ষিত থাকে। বাংলাদেশের সামাজিক ও পারিবারিক সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখতে হলে সেই সত্যটি নতুন করে মনে করার সময় এসেছে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow