মাত্র চার বছর বয়সে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের ব্যস্ত প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যায় এক অসহায় শিশু। নাম-পরিচয়হীন সেই শিশুর নাম রাখা হয় স্বপ্না আক্তার। আশ্রয় দেওয়া হয় সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে। সেই স্বপ্না আক্তার জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করলেন বিয়ের মাধ্যমে।
বুধবার (১৩ মে) দুপুরে সিলেটের শিবগঞ্জ লামাপাড়ায় সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে তার বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। দীর্ঘ ১৪ বছরের আশ্রয়, লালন-পালন ও শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে স্বপ্না এখন গড়লেন নিজের নতুন সংসার।
জানা গেছে, ছোট্ট বয়সে তাকে পাওয়া যায় সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে। তখন তার পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। পরবর্তীতে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তার বাবা-মা দুজনেই মারা গেছেন। এরপর তাকে আশ্রয় দেওয়া হয় সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে। সেখানে বেড়ে ওঠা, পড়াশোনা শেষে ২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন স্বপ্না আক্তার। বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় এবং কোনো অভিভাবক না থাকায় তার সম্মতিতেই বিয়ের আয়োজন করা হয় বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
পাত্রও সিলেটেরই সন্তান। তিনি ইলেকট্রিকের ঠিকাদারি কাজ করেন। বিয়ের আয়োজনকে ঘিরে এগিয়ে আসেন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বিশিষ্ট ব্যক্তি ও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রায় দুই লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে, যা স্বপ্নার নামে এফডিআর করে রাখা হবে। স্থানীয় এক ব্যক্তি উপহার দিয়েছেন প্রয়োজনীয় সব আসবাবপত্র। পুনর্বাসন কেন্দ্রের পক্ষ থেকে অতিথি আপ্যায়নের আয়োজন করা হয়। এমনকি একটি মিষ্টি প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান উপহার হিসেবে দেয় ১০০ কাপ দই।
সব মিলিয়ে পুরো আয়োজন ছিল আনন্দমুখর ও হৃদয়স্পর্শী। কেউ বুঝতেই পারেননি, এটি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এক তরুণীর বিয়ে। বরং মনে হচ্ছিল, বহু আদরে বড় হওয়া কোনো মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান চলছে।
বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী, বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সুচিত্রা রায়, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আব্দুর রফিকসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
অনুষ্ঠানে আবেগাপ্লুত হয়ে সিসিক প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, আমার খুবই ভালো লেগেছে। সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র শুধু একটি পিতৃমাতৃহীন শিশুকে আশ্রয়ই দেয়নি, তাকে লেখাপড়া শিখিয়ে জীবন গড়ার সুযোগ করে দিয়েছে। আজ তাকে বিয়ে দিয়ে তার ভবিষ্যতের ভিত্তিও তৈরি করে দিল। নবদম্পতির সুখী ও সুন্দর জীবনের প্রত্যাশা করি আমি।
বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এসএম মোক্তার হোসেন বলেন, স্বপ্নার বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে। কোনো অভিভাবক না থাকায় এবং তার সম্মতি নিয়েই আমরা বিয়ের আয়োজন করেছি। আমরা চেয়েছি, তার ভবিষ্যৎ যেন নিরাপদ ও সুন্দর হয়।
সব মিলিয়ে হারানো সেই শিশুটির জীবনকাহিনি আজ পরিণত হয়েছে এক মানবিক সাফল্যের গল্পে।
উল্লেখ্য, ২০১২ সাল থেকে সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র দেশের বিভিন্ন স্থানে ১৭টি কেন্দ্রের মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত, পথশিশু, ঝুঁকিতে থাকা ও পিতৃহীন শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়, ভরণপোষণ এবং পুনর্বাসন সেবা দিয়ে আসছে। স্বপ্না আক্তারের গল্প সেই মানবিক উদ্যোগেরই এক জীবন্ত উদাহরণ।