সরকারি অফিস যেন আবাসিক হোটেল, চলছে রান্না-রাত্রিযাপন
অফিসেই নির্বাহী প্রকৌশলীর রাত্রিযাপন সরকারি কার্যালয়েই রান্নাবান্নার আয়োজন কর্মচারীদেরও অফিসে থাকার ব্যবস্থা নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের ভিন্ন ব্যাখ্যা বাইরে থেকে দেখলে এটি একটি সাধারণ সরকারি কার্যালয়। দরজায় সরকারি সাইনবোর্ড, ভেতরে দাপ্তরিক কক্ষ। কিন্তু একটু ভেতরে গেলেই দৃশ্য পাল্টে যায়। অফিসের কক্ষেই বিছানা, রান্নাঘরের সরঞ্জাম, বাজারের ব্যাগ, বিশ্রামকক্ষ—সব মিলিয়ে যেন সরকারি অফিস নয়, একটি আবাসিক ব্যবস্থাই গড়ে উঠেছে। লালমনিরহাটে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) জেলা (রিজিয়ন) কার্যালয় ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে কয়েকজন কর্মচারী নিয়মিত অফিসেই অবস্থান করছেন। রান্নাবান্না থেকে রাত্রিযাপন—সবই চলছে সরকারি অফিসের ভেতরে। ‘আমি আগে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতাম। কিন্তু স্যার আমাকে ওই বাসা ছেড়ে দিয়ে অফিসে থাকতে বলেছেন। এ নিয়ে স্যারের সঙ্গে আমার প্রায়ই কথা হয়, আমি সেখানে থাকতে চাই না। কিন্তু স্যার থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন বলেই সেখানে থাকি ও রান্না করে খাই’ সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিজস্ব ভবন না থাকায় একটি দোতলা ভবন ভাড়া নিয়ে বিএমডিএ-এর কার্য
- অফিসেই নির্বাহী প্রকৌশলীর রাত্রিযাপন
- সরকারি কার্যালয়েই রান্নাবান্নার আয়োজন
- কর্মচারীদেরও অফিসে থাকার ব্যবস্থা
- নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের ভিন্ন ব্যাখ্যা
বাইরে থেকে দেখলে এটি একটি সাধারণ সরকারি কার্যালয়। দরজায় সরকারি সাইনবোর্ড, ভেতরে দাপ্তরিক কক্ষ। কিন্তু একটু ভেতরে গেলেই দৃশ্য পাল্টে যায়। অফিসের কক্ষেই বিছানা, রান্নাঘরের সরঞ্জাম, বাজারের ব্যাগ, বিশ্রামকক্ষ—সব মিলিয়ে যেন সরকারি অফিস নয়, একটি আবাসিক ব্যবস্থাই গড়ে উঠেছে।
লালমনিরহাটে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) জেলা (রিজিয়ন) কার্যালয় ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে কয়েকজন কর্মচারী নিয়মিত অফিসেই অবস্থান করছেন। রান্নাবান্না থেকে রাত্রিযাপন—সবই চলছে সরকারি অফিসের ভেতরে।
‘আমি আগে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতাম। কিন্তু স্যার আমাকে ওই বাসা ছেড়ে দিয়ে অফিসে থাকতে বলেছেন। এ নিয়ে স্যারের সঙ্গে আমার প্রায়ই কথা হয়, আমি সেখানে থাকতে চাই না। কিন্তু স্যার থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন বলেই সেখানে থাকি ও রান্না করে খাই’
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিজস্ব ভবন না থাকায় একটি দোতলা ভবন ভাড়া নিয়ে বিএমডিএ-এর কার্যক্রম চলছে। অফিসের নিচতলায় মালামাল রাখার জন্য একটি স্টোর রুম বানানো হলেও সেখানে সরকারি মালামালের চেয়ে সাংসারিক জিনিসপত্রই বেশি। সাজানো বিছানা থেকে শুরু করে রান্নার সব ধরনের আসবাবপত্র সেখানে বিদ্যমান। নিচতলার এই কক্ষটি ব্যবহার করছেন খাইরুল ইসলাম নামের এক চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী। তিনি মূলত সদর বিএমডিএ-এর দায়িত্বে থাকলেও, অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে জেলা অফিসের হিসাব নিয়ন্ত্রণের জন্য তাকে এখানে রাখা হয়েছে।
অফিসের দোতলায় গেলে যে কেউ চমকে উঠবেন। সামনে দুটি টেবিল, ভেতরে হিসাবরক্ষকের কক্ষ এবং নির্বাহী প্রকৌশলী কক্ষ তার পাশেই রয়েছে থাই গ্লাস দিয়ে ঘেরা নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হুদার একটি সুসজ্জিত বিশ্রামকক্ষ। বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী যোগদানের পর থেকেই সেই কক্ষে তার রাত্রিযাপন ও রান্নাবান্না চলছে। তাকে রান্না করে খাওয়ানোর জন্য পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে একজন বুয়াকে, যার বেতন দেওয়া হচ্ছে সরকারি কোষাগার থেকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, অফিসে এ নির্বাহী প্রকৌশলীর দেখভালের জন্য মাস্টার রোলে আরও তিনজন অস্থায়ী কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দিনে ও রাতে তারা পালাক্রমে ডিউটি করেন। এছাড়া, সরকারের দেওয়া গাড়িটি তিনি অনায়াসেই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজে বগুড়া পর্যন্ত যাতায়াতে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘আমি অফিসে রান্না করি। মিটিং থেকে শুরু করে স্যারের খাবার প্রয়োজন হলে রান্না করতে হয়। ওপরের রুমটিতে স্যার রেস্ট করেন এবং রাতে ঘুমান’
অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর রফিকুল ইসলাম বলেন, অফিসটি ভাড়া নেওয়া হয়েছে তিন বছর আগে। স্যার মাঝেমধ্যে ভেতরের কক্ষটি রেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহার করেন। তিনি আশপাশে কোনো বাসা ভাড়া নেননি, যেদিন অফিস করেন সেখানেই থাকেন। আমাদের রান্না করার জন্য একজন খালা আছেন।
খাইরুল ইসলামের বিষয়ে তিনি জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জে তার বাড়ি, তিনিও বাসা ভাড়া না নিয়ে অফিসের নিচতলায় থাকেন এবং অতিরিক্ত দায়িত্বে ক্যাশ শাখা নিয়ন্ত্রণ করেন। এবং রাতে অফিস পাহারা দেন।
অস্থায়ী কর্মচারী মিঠুন চন্দ্র রায় জানান, আমরা চারজন অস্থায়ী কর্মী এখানে আছি। সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা এবং রাত ৮টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত পালাক্রমে ডিউটি করি। স্যারের কক্ষের পাশে থাকা-খাওয়ার যে সুব্যবস্থা রয়েছে, মূলত সেখানেই নির্বাহী প্রকৌশলী থাকেন। আর নিচের রুমে আমাদের অ্যাকাউন্ট্যান্ট থাকেন।
রান্নার দায়িত্বে থাকা অস্থায়ী কর্মী ময়না বেগম বলেন, আমি অফিসে রান্না করি। মিটিং থেকে শুরু করে স্যারের খাবার প্রয়োজন হলে রান্না করতে হয়। ওপরের রুমটিতে স্যার রেস্ট করেন এবং রাতে ঘুমান।
অফিসের সামনের কাঁচামাল ব্যবসায়ী মানিক মিয়া জানান, খাইরুল ইসলাম ও ময়না বেগম প্রায়ই তার দোকান থেকে অফিসের জন্য শাকসবজি ও বাজার নিয়ে যান। নির্বাহী প্রকৌশলী যোগদানের পর থেকেই এ কেনাকাটা চলছে।
অফিসে গিয়ে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী খাইরুল ইসলামকে পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি ছুটি নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ এসেছি। আমি আগে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতাম। কিন্তু স্যার আমাকে ওই বাসা ছেড়ে দিয়ে অফিসে থাকতে বলেছেন। এ নিয়ে স্যারের সঙ্গে আমার প্রায়ই কথা হয়, আমি সেখানে থাকতে চাই না। কিন্তু স্যার থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন বলেই সেখানে থাকি ও রান্না করে খাই।
প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও ব্যবহারবিধি অনুযায়ী, সরকারি অফিস কক্ষ বা চত্বর কোনোভাবেই বসবাসের স্থান নয়। সেখানে রান্নার সরঞ্জাম বা শোয়ার ব্যবস্থা রাখা সরকারি স্থাবর সম্পত্তি ও কর্মপরিবেশের নিয়মের চরম বরখেলাপ। অফিসে রান্নার চুলা ব্যবহার মারাত্মক অগ্নিঝুঁকি তৈরি করে, যা সরকারি নিরাপত্তা বিধানের পরিপন্থি। দাপ্তরিক জরুরি ডিউটি বা নাইট গার্ড ছাড়া অন্য কোনো কর্মীর অননুমোদিত রাত্রিযাপন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
এ বিষয়ে লালমনিরহাট বিএমডিএ-এর নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হুদা বলেন, আমরা কর্তৃপক্ষের কাছে ভূমি বরাদ্দের আবেদন করেছি, তাই আপাতত ভাড়া ভবনে আছি। জনবল সংকটের কারণে অফিস পাহারার জন্য কয়েকজনকে মাস্টার রোলে রাখা হয়েছে।
থাকা ও রান্নার বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়টি এমন নয়। দূর থেকে কোনো অফিসার আসলে বা রাত হয়ে গেলে তাদের থাকার জন্য এ ব্যবস্থা। ওপরের ও নিচের বেডরুমগুলো আমার নয়, গেস্টদের জন্য রাখা হয়েছে। আমার থাকার বিষয়টি সঠিক নয়, তবে অফিস চলাকালীন দুপুরে বাইরের হোটেলের খাবার খাই না বলে এখানে রান্না হয়।
উল্লেখ্য, কৃষকদের সেচ ও ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে কুড়িগ্রাম থেকে আলাদা করে ২০২৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে লালমনিরহাটে বিএমডিএ-এর জেলা কার্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু সেবার মান বাড়ানোর বদলে সরকারি অফিসের এমন অপব্যবহার সচেতন মহলে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
এমআইএসএন/কেএইচকে/জেআইএম
What's Your Reaction?