আধুনিক নগরজীবনের ব্যস্ততার মাঝেও সিডনিতে এমন কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে, যেখানে দাঁড়ালে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে যেন সরাসরি পরিচয় ঘটে। সিডনির রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনের মনোরম পরিবেশে অবস্থিত গভর্নমেন্ট হাউস তেমনই একটি ঐতিহাসিক ও নান্দনিক স্থাপনা। দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্য, সবুজ বাগান, মূল্যবান শিল্পকর্ম এবং প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস এই ভবনকে সিডনির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যস্থানে পরিণত করেছে।
সিডনির ম্যাককোয়ারি স্ট্রিটে রয়্যাল বোটানিক গার্ডেনের ভেতরে অবস্থিত গভর্নমেন্ট হাউস নিউ সাউথ ওয়েলসের গভর্নরের সরকারি বাসভবন ও কার্যালয়। ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক গুরুত্বের এই ভবনটি বর্তমানে শুধু সরকারি ও আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের স্থান নয়, নির্ধারিত সময়ে সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্যও উন্মুক্ত থাকে। বিনামূল্যে ভবন ও এর মনোরম প্রাঙ্গণ ঘুরে দেখার সুযোগ থাকায় ইতিহাস, স্থাপত্য ও সংস্কৃতিতে আগ্রহী মানুষের কাছে গভর্নমেন্ট হাউস সিডনির অন্যতম আকর্ষণীয় ঐতিহাসিক স্থাপনা।
প্রায় দুই শতাব্দীর ইতিহাস
বর্তমান গভর্নমেন্ট হাউসের নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৮৩৬ সালে। ভবনটির নকশা করেন বিখ্যাত ব্রিটিশ স্থপতি এডওয়ার্ড ব্লোর। তিনি তৎকালীন রাজা উইলিয়াম চতুর্থ ও রানি ভিক্টোরিয়ার স্থাপত্যকার হিসেবে কাজ করেছেন এবং বাকিংহাম প্যালেস ও উইন্ডসর ক্যাসলের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য প্রকল্পের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত বেলেপাথর দিয়ে নির্মিত ভবনটি গথিক পুনর্জাগরণ বা টিউডর-গথিক স্থাপত্যশৈলীর একটি অনন্য উদাহরণ। দুর্গসদৃশ দেয়াল, উঁচু টাওয়ার, কেল্লার মতো অলংকরণ এবং সূক্ষ্ম স্থাপত্যশৈলী ভবনটিকে সিডনির অন্যান্য স্থাপনা থেকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে।
নির্মাণকাজে দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধির কারণে প্রকল্পটি শেষ হতে কয়েক বছর সময় লাগে। অবশেষে ১৮৪৫ সালে ভবনটির নির্মাণ সম্পন্ন হয় এবং একই বছর নিউ সাউথ ওয়েলসের তৎকালীন গভর্নর স্যার জর্জ গিপস সেখানে বসবাস শুরু করেন।
প্রথম গভর্নমেন্ট হাউস কোথায় ছিল?
বর্তমান ভবনের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও পুরোনো একটি অধ্যায়। ১৭৮৮ সালে নিউ সাউথ ওয়েলসের প্রথম গভর্নর আর্থার ফিলিপ সিডনি কোভের কাছে প্রথম গভর্নমেন্ট হাউসের ভিত্তি স্থাপন করেন। এটি ছিল নবগঠিত উপনিবেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামাজিক ও আনুষ্ঠানিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। প্রায় ৫০ বছর ব্যবহারের পর ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে এবং নতুন গভর্নমেন্ট হাউস নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়।
প্রথম গভর্নমেন্ট হাউসটি বর্তমান ব্রিজ ও ফিলিপ স্ট্রিটের সংযোগস্থলে, যেখানে এখন মিউজিয়াম অব সিডনি অবস্থিত। ১৮৪৫ সালে নতুন গভর্নমেন্ট হাউস সম্পন্ন হওয়ার পর পুরোনো ভবনটি পরিত্যক্ত ও পরে ভেঙে ফেলা হয়। ১৮৯৯ সালে খননকাজের সময় পুরোনো ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর পুনরাবিষ্কৃত হয়। বর্তমানে সেই স্থানের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মিউজিয়াম অব সিডনির অংশ হিসেবে সংরক্ষিত।
স্থাপত্যে অনন্য সৌন্দর্য
গভর্নমেন্ট হাউসের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর স্থাপত্য। স্থানীয় বেলেপাথরের তৈরি ভবনটির নকশায় মধ্যযুগীয় দুর্গের নানা বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। উঁচু টাওয়ার, কেল্লার মতো দেয়াল ও অলংকরণ ভবনটিকে সিডনি হারবারের তীরের একটি বিশেষ স্থাপত্যচিহ্নে পরিণত করেছে।
নির্মাণের পর বিভিন্ন সময়ে ভবনটিতে সংযোজন ও সংস্কার করা হয়েছে। ১৮৭৩ সালে সামনের প্রবেশপথে একটি পোর্টিকো, ১৮৭৯ সালে পূর্বদিকে বারান্দা এবং ১৯০০-০১ সালে বলরুম ও গভর্নরের স্টাডিতে সম্প্রসারণ করা হয়।
ভবনের ভেতরে রয়েছে বিভিন্ন সময়ের গভর্নরদের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিকৃতি, ঐতিহাসিক আসবাব, অলংকারশিল্প ও স্মারক সংগ্রহ। স্টেট রুমসহ বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক কক্ষের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা ভবনটির ঐতিহাসিক মর্যাদা ও সৌন্দর্য আরও বাড়িয়েছে।
পাঁচ হেক্টরের মনোরম প্রাঙ্গণ
শুধু ভবন নয়, গভর্নমেন্ট হাউসের চারপাশের প্রাঙ্গণও দর্শনার্থীদের অন্যতম আকর্ষণ। নিউ সাউথ ওয়েলস পার্লামেন্টের তথ্য অনুযায়ী, গভর্নমেন্ট হাউসের নিজস্ব বাগান প্রায় পাঁচ হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত। এর পাশেই রয়েছে বিশাল রয়্যাল বোটানিক গার্ডেন। ফলে এখানে ইতিহাস, স্থাপত্য ও প্রকৃতির এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায়।
পরিবার নিয়ে ঘোরাঘুরি, শিশুদের নিয়ে খোলা সবুজ জায়গায় সময় কাটানো, ঐতিহাসিক স্থাপত্য দেখা কিংবা বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য জায়গাটি বিশেষ আকর্ষণীয়। বিশেষ আয়োজনের সময় দর্শনার্থীরা ভবনের অভ্যন্তরের ঐতিহাসিক কক্ষ দেখার পাশাপাশি বাগানে হাঁটাহাঁটি ও সাংস্কৃতিক আয়োজন উপভোগ করতে পারেন।
জ্যাজের সুরে উন্মুক্ত হয় ঐতিহ্যের দরজা
গভর্নমেন্ট হাউসের বিশেষ আকর্ষণগুলোর একটি হলো ‘জ্যাজ অ্যাট দ্য হাউস’ আয়োজন। সাধারণত মাসে এক রোববার এখানে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সেবাবাহিনীর জ্যাজ দল সংগীত পরিবেশন করে। দুপুর ১২টা, ১টা ও ২টায় পরিবেশিত এসব সংগীতানুষ্ঠান দর্শনার্থীদের জন্য বিনামূল্যে উন্মুক্ত থাকে। একই সঙ্গে ভবনের স্টেট রুম ঘুরে দেখা, বাগানে ভাস্কর্য পরিদর্শন এবং সবুজ প্রাঙ্গণে সময় কাটানোর সুযোগও থাকে।
যারা গভর্নমেন্ট হাউস দেখতে চান, তাদের জন্যও সুযোগ রয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট শুক্র, শনি ও রোববার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ভবনটি দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে এবং বিনামূল্যে নির্দেশিত ভ্রমণের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতিটি ভ্রমণে সর্বোচ্চ ২০ জন দর্শনার্থী অংশ নিতে পারেন এবং আসন সাধারণত আগে আসলে আগে পাওয়ার ভিত্তিতে দেওয়া হয়। সময়সূচিতে পরিবর্তন হতে পারে, তাই যাওয়ার আগে সরকারি ওয়েবসাইটে সর্বশেষ তথ্য দেখে নেওয়া ভালো।
ইতিহাসের সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয়
বর্তমান গভর্নমেন্ট হাউস শুধু একটি পুরোনো ভবন নয়। এটি নিউ সাউথ ওয়েলসের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী। ১৮৪৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত ২৮ জন গভর্নর এই ভবনে বসবাস করেছেন। ১৯০১ থেকে ১৯১৪ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার প্রথম পাঁচজন গভর্নর-জেনারেলও এই ভবনকে সরকারি বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
বর্তমান গভর্নর মার্গারেট বেজলি এসি কেসি নিউ সাউথ ওয়েলসের ৩৯তম গভর্নর এবং ২০১৯ সালের ২ মে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি এই গভর্নমেন্ট হাউসে বসবাসকারী ২৮তম গভর্নর।
সিডনিতে বসবাসকারী বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন অভিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য গভর্নমেন্ট হাউস হতে পারে অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস ও রাষ্ট্রীয় ঐতিহ্য জানার একটি চমৎকার স্থান। বিশেষ করে সন্তানদের নিয়ে এমন ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শন তাদের বসবাসের দেশের ইতিহাস, স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার বাস্তব সুযোগ তৈরি করে।
একবার ঘুরে দেখার মতো স্থান
সিডনির ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও গভর্নমেন্ট হাউস যেন ইতিহাসের একটি খোলা দরজা। একদিকে প্রায় ১৮০ বছরের পুরোনো স্থাপত্য, অন্যদিকে সবুজ বাগান ও সিডনি হারবারের মনোরম পরিবেশ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিল্প, সংগীত ও অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রীয় ইতিহাস।
তাই সিডনিতে বসবাসকারী কিংবা বেড়াতে আসা মানুষের জন্য গভর্নমেন্ট হাউস হতে পারে একটি স্মরণীয় ভ্রমণগন্তব্য। বিনামূল্যে উন্মুক্ত দিনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে পরিবার ও সন্তানদের নিয়ে এই ঐতিহাসিক স্থাপনা ঘুরে দেখা যেমন আনন্দদায়ক, তেমনি অস্ট্রেলিয়ার ইতিহাস জানার ক্ষেত্রেও হতে পারে মূল্যবান অভিজ্ঞতা।
লেখক: মোহাম্মাদ আব্দুল মতিন, সিডনি প্রবাসী সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ ও লেখক।