সিলেটের শতবর্ষী বেতশিল্প, টিকে থাকার লড়াইয়ে কারিগররা

জীবন পালসিলেট নগরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের নদীর পাড় মোল্লাপাড়া এলাকায় এখনো টিকে আছে বাঁশ-বেতের আসবাবপত্র তৈরির শতবর্ষী ঐতিহ্য। কেউ বেত পানিতে ভিজিয়ে পরিষ্কার করছেন, কেউ আগুনের তাপে চেয়ারের ফ্রেম বাঁকাচ্ছেন, আবার কেউ ব্যস্ত মোড়া তৈরিতে। বারান্দায় শুকিয়ে রাখা বেত একদিন রূপ নেয় মোড়া, চেয়ার ও ঝুড়িতে, যা ব্যবহার হয় ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় আসবাবে। এখানকার কারিগররা বংশপরম্পরায় এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। মো. মাসুদ জানান, একটি নতুন ডিজাইনের মোড়া তৈরি করতে সময় লাগে প্রায় একদিন। তবে সাধারণ মোড়াগুলো কারিগররা দিনে চারটি পর্যন্ত তৈরি করতে পারেন। ধাপে ধাপে বাঁধাই, নকশা, সিট বসানো ও ফিনিশিংয়ের মধ্য দিয়ে এগোয় উৎপাদন প্রক্রিয়া। একই এলাকায় একাধিক কারিগরের সমন্বয়ে তৈরি হয় একটি চেয়ার। ফ্রেম তৈরি থেকে শুরু করে বাঁকানো, নকশা ও বার্নিশ সব মিলিয়ে একটি চেয়ার তৈরি হতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে চার দিন। তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে এই পেশার বাস্তবতা। তিন দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করা কারিগর মো. শাহিন জানান, আগে বেত সহজলভ্য ছিল এবং কম দামে পাওয়া যেত। কিন্তু এখন কাঁচামালের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। যে বেত একসময় ২০ টাকায় পাওয়া যেত, সেটি এখন ২৫০ ট

সিলেটের শতবর্ষী বেতশিল্প, টিকে থাকার লড়াইয়ে কারিগররা

জীবন পাল
সিলেট নগরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের নদীর পাড় মোল্লাপাড়া এলাকায় এখনো টিকে আছে বাঁশ-বেতের আসবাবপত্র তৈরির শতবর্ষী ঐতিহ্য। কেউ বেত পানিতে ভিজিয়ে পরিষ্কার করছেন, কেউ আগুনের তাপে চেয়ারের ফ্রেম বাঁকাচ্ছেন, আবার কেউ ব্যস্ত মোড়া তৈরিতে। বারান্দায় শুকিয়ে রাখা বেত একদিন রূপ নেয় মোড়া, চেয়ার ও ঝুড়িতে, যা ব্যবহার হয় ঘরের নিত্যপ্রয়োজনীয় আসবাবে।

এখানকার কারিগররা বংশপরম্পরায় এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। মো. মাসুদ জানান, একটি নতুন ডিজাইনের মোড়া তৈরি করতে সময় লাগে প্রায় একদিন। তবে সাধারণ মোড়াগুলো কারিগররা দিনে চারটি পর্যন্ত তৈরি করতে পারেন। ধাপে ধাপে বাঁধাই, নকশা, সিট বসানো ও ফিনিশিংয়ের মধ্য দিয়ে এগোয় উৎপাদন প্রক্রিয়া।

JAGONEWS

একই এলাকায় একাধিক কারিগরের সমন্বয়ে তৈরি হয় একটি চেয়ার। ফ্রেম তৈরি থেকে শুরু করে বাঁকানো, নকশা ও বার্নিশ সব মিলিয়ে একটি চেয়ার তৈরি হতে সময় লাগে প্রায় সাড়ে চার দিন।

তবে সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে এই পেশার বাস্তবতা। তিন দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করা কারিগর মো. শাহিন জানান, আগে বেত সহজলভ্য ছিল এবং কম দামে পাওয়া যেত। কিন্তু এখন কাঁচামালের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে। যে বেত একসময় ২০ টাকায় পাওয়া যেত, সেটি এখন ২৫০ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি পণ্যের দাম। ফলে অনেক ক্ষেত্রে টিকে থাকাই কঠিন হয়ে পড়ছে।

কারিগর মো. শাহিন বলেন, ‘চাহিদা আছে, কিন্তু লাভ কমে গেছে। আগে যেটা স্বাভাবিকভাবে চলতো, এখন সেটা টিকে থাকার লড়াই।’

পারিবারিকভাবে এই পেশা ধরে রেখেছেন রাজন আহমেদ বাবু। তিনি জানান, জব্বারের মেলাসহ বিভিন্ন মৌসুমি বাজারে তারা পণ্য বিক্রি করেন। প্রতিবছর চট্টগ্রামের জব্বারের মেলায় অংশ নিতে লাখ টাকার পণ্য নিয়ে যান তারা।

JAGONEWS

তবে তাদের অভিযোগ, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অনেকেই তাদের দোকান ও পণ্যের ছবি-ভিডিও ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয়ে ব্যবসা করছে। এতে প্রকৃত কারিগররা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কম দামে নিম্নমানের পণ্য দেখিয়ে গ্রাহক আকৃষ্ট করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।

প্রবীণ কারিগর মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘বাপ-দাদার কাছ থেকে পাওয়া এই পেশা ছোটবেলা থেকেই তিনি ধরে রেখেছেন। আগে যেখানে কাজের চাহিদা বেশি ছিল, এখন তা কমে গেছে।’ ত্বে কাঁচামালের দাম বাড়ায় আয় কমলেও এখনো দেশের বিভিন্ন স্থানে এবং প্রবাসী ক্রেতাদের কাছে এসব পণ্য যাচ্ছে বলে জানান তিনি।

ক্রেতাদের কেউ কেউ বলছেন, এখানকার বেতের আসবাব টেকসই ও মানসম্মত হওয়ায় এখনো এর চাহিদা রয়েছে। তবে বাজারে প্রতিযোগিতা ও দামের তারতম্য নিয়ে রয়েছে ভিন্ন মত।

তবে কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, বাজার সংকট এবং নতুন প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিযোগিতার মধ্যেও টিকে থাকার চেষ্টা করছেন সিলেটের বেতশিল্পীরা। শেকড়ের এই ঐতিহ্যবাহী পেশা ধরে রাখতে তারা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিদিন।

কেএসকে

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow