সূর্যের দহন না কি নীতির ব্যর্থতা?

নওশাদের বয়স ৫৩ বছর। দুই দশক ধরে রাজশাহীতে রিকশা চালাচ্ছেন তিনি। এই শহরের প্রতিটি অলিগলি, প্রতিটি মোড় তাঁর হাতের তালুর মতো চেনা—যা কেবল সেই মানুষের পক্ষেই সম্ভব, যার জীবন কেটেছে এই তপ্ত পিচঢালা রাস্তায়। ২০২৬ সালের ২৩শে এপ্রিলের এক তপ্ত বিকেল। মাথায় গামছা জড়িয়ে নওশাদ বেরিয়েছিলেন একমুঠো অন্নের সন্ধানে, কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও কোনো যাত্রী মেলেনি। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সেদিন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল—যা ছিল বছরের সর্বোচ্চ। রাস্তাঘাট ছিল জনশূন্য। এই নিস্তব্ধতা কোনো ছুটির দিনের প্রশান্তি নয়, বরং এটি ছিল প্রকৃতির প্রচণ্ড প্রতাপের কাছে মানুষের পরাজয়ের নিস্তব্ধতা। নওশাদ বিশ্রাম নিচ্ছিলেন না; তিনি অপেক্ষা করছিলেন উত্তাপ কিছুটা কমার জন্য, যাতে অন্তত একজন যাত্রী পাওয়া যায়। কিন্তু তপ্ত বাতাস কমেনি, বরং সময়ের সাথে সাথে আগুনের হলকার মতো বিঁধছিল শরীরে। বাংলাদেশের ২০২৬ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহের আসল চিত্র এটিই। এটি কেবল আবহাওয়ার চার্ট, বিএমডি-র বুলেটিন কিংবা মন্ত্রীদের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সীমাবদ্ধ কোনো পরিসংখ্যান নয়। এটি ফ্লাইওভারের নিচে জিরিয়ে নেওয়া সেই তৃষ্ণার্ত মানুষের

সূর্যের দহন না কি নীতির ব্যর্থতা?

নওশাদের বয়স ৫৩ বছর। দুই দশক ধরে রাজশাহীতে রিকশা চালাচ্ছেন তিনি। এই শহরের প্রতিটি অলিগলি, প্রতিটি মোড় তাঁর হাতের তালুর মতো চেনা—যা কেবল সেই মানুষের পক্ষেই সম্ভব, যার জীবন কেটেছে এই তপ্ত পিচঢালা রাস্তায়। ২০২৬ সালের ২৩শে এপ্রিলের এক তপ্ত বিকেল। মাথায় গামছা জড়িয়ে নওশাদ বেরিয়েছিলেন একমুঠো অন্নের সন্ধানে, কিন্তু দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পরও কোনো যাত্রী মেলেনি। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সেদিন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছিল—যা ছিল বছরের সর্বোচ্চ। রাস্তাঘাট ছিল জনশূন্য। এই নিস্তব্ধতা কোনো ছুটির দিনের প্রশান্তি নয়, বরং এটি ছিল প্রকৃতির প্রচণ্ড প্রতাপের কাছে মানুষের পরাজয়ের নিস্তব্ধতা। নওশাদ বিশ্রাম নিচ্ছিলেন না; তিনি অপেক্ষা করছিলেন উত্তাপ কিছুটা কমার জন্য, যাতে অন্তত একজন যাত্রী পাওয়া যায়। কিন্তু তপ্ত বাতাস কমেনি, বরং সময়ের সাথে সাথে আগুনের হলকার মতো বিঁধছিল শরীরে।

বাংলাদেশের ২০২৬ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহের আসল চিত্র এটিই। এটি কেবল আবহাওয়ার চার্ট, বিএমডি-র বুলেটিন কিংবা মন্ত্রীদের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সীমাবদ্ধ কোনো পরিসংখ্যান নয়। এটি ফ্লাইওভারের নিচে জিরিয়ে নেওয়া সেই তৃষ্ণার্ত মানুষের প্রতিচ্ছবি, যার কোনো আয় নেই। বাতাসে আর্দ্রতার কারণে থার্মোমিটারের পাঠের চেয়েও অনুভূত তাপমাত্রা যখন চার-পাঁচ ডিগ্রি বেশি, তখন প্রতিটি নিঃশ্বাস নেওয়াও যেন এক যুদ্ধ। এই মানুষগুলো এমন এক সংকট থেকে মুক্তির পথ খুঁজছে, যে সংকটকে আমাদের দেশের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলো আজও একটি পূর্ণাঙ্গ 'দুর্যোগ' হিসেবে স্বীকার করে নিতে কুণ্ঠাবোধ করছে।

পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকানো আগুনের উত্তাপ

২৩শে এপ্রিল নাগাদ বাংলাদেশের ২৭টি জেলা তীব্র তাপপ্রবাহের কবলে পড়েছিল। রাজশাহীতে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠলেও এটি মোটেও কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এপ্রিলের শুরুতেই আবহাওয়া দপ্তর (বিএমডি) পূর্বাভাস দিয়েছিল যে, এই মাসে বেশ কয়েকটি মৃদু থেকে তীব্র তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। বাস্তবে ঘটেছেও তাই। চুয়াডাঙ্গায় মাসের শুরুতেই তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ঘর ছুঁয়েছিল এবং ২১শে এপ্রিল তা ৪২.৬ ডিগ্রিতে গিয়ে ঠেকে। রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য জেলাগুলোতে গড় তাপমাত্রা গত ৩০ বছরের স্বাভাবিক গড় তাপমাত্রার চেয়ে ৪ থেকে ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। গত তিন দশকে ২৩শে এপ্রিল ঢাকার গড় তাপমাত্রা যেখানে ৩৩.৬ ডিগ্রি থাকার কথা, সেখানে পারদ চড়েছিল ৩৮.৪ ডিগ্রিতে। দক্ষিণের খুলনায় এই বিচ্যুতি ছিল আরও ভয়াবহ—ঐতিহাসিক গড়ের চেয়ে ৫.৯ ডিগ্রি বেশি।

এই বিচ্যুতিগুলো আমাদের এক ভয়াবহ ভবিষ্যতের বার্তা দিচ্ছে। গত দুই দশকে ঢাকার গড় তাপমাত্রা বেড়েছে প্রায় ২.৭৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এটি বৈশ্বিক গড় উষ্ণায়নের হার (১.২ ডিগ্রি) এবং প্যারিস চুক্তির নির্ধারিত ১.৫ ডিগ্রির সীমাকেও অনেক আগে ছাড়িয়ে গেছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বিশ্বব্যাপী কার্বন নিঃসরণের নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশে অনেক বেশি প্রকট। বিএমডি-র নিজস্ব প্রকাশনা ‘বাংলাদেশের পরিবর্তিত জলবায়ু’ নিশ্চিত করে যে, আমাদের দেশে সর্বনিম্ন তাপমাত্রার চেয়ে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। আশির দশকে তাপপ্রবাহ বড়জোর দুই-তিন দিন স্থায়ী হতো, কিন্তু এখন তা সপ্তাহ ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল শেষ হওয়ার আগেই দেশে ২৩ দিন তাপপ্রবাহ রেকর্ড করা হয়েছে—যা ১৯৪8 সাল থেকে শুরু হওয়া রেকর্ডের ইতিহাসে ২০১৯ সালের পুরো বছরের রেকর্ডের সমান। এটি আর কেবল ‘আবহাওয়া’ নয়, এটি এক নতুন এবং বৈরী জলবায়ু যা আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে।

বৈষম্যের উত্তাপ: শহর ও গ্রাম

তাপের এই দুর্ভোগ সবার জন্য সমান নয়। ঢাকায় তাপের চরিত্র মূলত ‘শহুরে’। এখানকার কংক্রিটের জঙ্গল আর টিনের ছাদ দিনের বেলা তাপ শোষণ করে এবং সূর্যাস্তের অনেক পরেও তা বিকিরণ করতে থাকে। গাছপালার চরম অভাব এবং দীর্ঘস্থায়ী যানজট এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করে। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার তাপ সূচক জাতীয় গড়ের চেয়ে প্রায় ৬৫ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে বস্তি এলাকার বাসিন্দাদের জন্য, যেখানে বিদ্যুৎ নেই এবং টিনের চালের নিচে বাতাস চলাচলের কোনো পথ নেই, সেখানে ৩০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রায় একটি রাত কাটানো কেবল অস্বস্তিকর নয়, বরং জীবনের জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ।

আহমেদাবাদ বা এথেন্সের মতো শহরগুলো যদি তাপপ্রবাহ মোকাবিলা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে আমরা কেন নয়? আমাদের কারিগরি সক্ষমতা আছে, যা নেই তা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রাজশাহীর সেই রিকশাচালক নওশাদের কাছে এই সংকট কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়। প্রতিটি তপ্ত দিন মানেই তার পকেটে কম টাকা এবং ঘরে ক্ষুধার্ত মুখ। যে সংকট সে তৈরি করেনি, তার পুরো মূল্য তাকেই দিতে হচ্ছে নিজের শ্রম আর স্বাস্থ্য দিয়ে। আমরা যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি, তারা আর কতদিন অন্ধ সেজে থাকব?

অন্যদিকে গ্রামীণ বাংলাদেশে তাপপ্রবাহ ভিন্ন এক সংকটের জন্ম দিচ্ছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষকরা এখন সূর্য ওঠার আগেই মাঠে যাচ্ছেন কাজ শেষ করতে, যাতে দুপুরের আগুনের মতো রোদ এড়ানো যায়। পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় নলকূপ থেকে পানি উঠছে না, শুকিয়ে যাচ্ছে সেচের পুকুর। আমাদের কৃষি ব্যবস্থা—যা দেশের কর্মসংস্থানের ৪ শতাংশ এবং জিডিপির ১১ শতাংশ বহন করে—এখন চরম ঝুঁকির মুখে। ধান ও গমের জাতগুলো এই অস্বাভাবিক তাপমাত্রার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছে না, ফলে বাড়ছে ফসলের ক্ষতির আশঙ্কা।

অর্থনীতির রক্তক্ষরণ এবং জীবনের মূল্য

চরম তাপপ্রবাহ কেবল ঘাম আর ক্লান্তি আনে না, এটি আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। ২০২৫ সালের ‘ল্যানসেট কাউন্টডাউন’ প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০২৪ সালে তাপপ্রবাহের কারণে শ্রম উৎপাদনশীলতা কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ প্রায় ২৪ বিলিয়ন ডলার আয় হারিয়েছে, যা মোট জিডিপির পাঁচ শতাংশের সমান। এই ক্ষতির অর্ধেকেরও বেশি হয়েছে কৃষি খাতে। এছাড়া তাপজনিত শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার কারণে ২০২৪ সালে ২৫০ মিলিয়ন কর্মদিবস নষ্ট হয়েছে। এটি এক বিশাল অর্থনৈতিক রক্তক্ষরণ। যদি এই ক্ষতি অন্য কোনো কারণে হতো, তবে হয়তো জরুরি মন্ত্রিসভার বৈঠক বসত, কিন্তু যেহেতু এটি ‘আবহাওয়া’, তাই আমরা একে নিয়তি বলে মেনে নিচ্ছি।

তবে শ্রমজীবী মানুষের কাছে এটি কেবল পরিসংখ্যান নয়। মিরপুরের নির্মাণ শ্রমিক, মহাখালীর ডেলিভারি রাইডার কিংবা গাজীপুরের পোশাক শ্রমিকদের জন্য কোনো ‘ছুটি’ নেই। তাদের উপার্জন সরাসরি তাপমাত্রার সাথে জড়িত। ২০২৬ সালের ২ এপ্রিল বগুড়ায় এক রিকশাচালকের মৃত্যু দিয়ে শুরু হওয়া এই মিছিলটি ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হিটস্ট্রোকে মৃত্যুর হিসাব রাখা শুরু করলেও তা কেবল সরকারি হাসপাতালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে, যা প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় নগণ্য। হিটস্ট্রোক ছাড়াও পানিশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর তাপের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সমাজকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। চিকিৎসকরা ঘরে থাকার পরামর্শ দেন, কিন্তু যাদের জীবিকা রাস্তার ধুলোয়, তাদের জন্য এই পরামর্শ এক নিষ্ঠুর পরিহাসের মতো শোনায়।

বিদ্যুৎ ও শিক্ষা ব্যবস্থার নড়বড়ে কাঠামো

তাপপ্রবাহের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা, কিন্তু সরবরাহ ব্যবস্থা সেখানে মুখ থুবড়ে পড়ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ২,৫০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গিয়েছিল, আর গ্রামীণ এলাকায় এই ঘাটতি ছিল আরও প্রকট। আমদানিকৃত কয়লা বা বিদেশি বিদ্যুৎকেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণের ওপর আমাদের নির্ভরতা আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ভঙ্গুর করে তুলেছে। যখন তীব্র গরমে শিশুদের জীবন ওষ্ঠাগত, তখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং এই সংকটকে একটি মানবিক বিপর্যয়ে রূপ দিচ্ছে। একই চিত্র শিক্ষা ব্যবস্থাতেও। প্রতি বছর তাপপ্রবাহ শুরু হলে স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়, কিন্তু এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। আমাদের স্কুল ভবনগুলো এই তীব্র তাপমাত্রার কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়নি। টিনের চালের ক্লাসরুমে শিশুরা যে নরক যন্ত্রণায় ভোগে, তা নিরসনে স্থাপত্যশৈলীতে পরিবর্তন বা শিক্ষাবর্ষের ক্যালেন্ডারে কোনো সংস্কার আনা হয়নি। স্কুল বন্ধ করা কোনো সুনির্দিষ্ট ‘তাপ নীতি’ হতে পারে না; এটি আসলে দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাবেরই নামান্তর।

জলবায়ু অবিচার: দায় কার, শাস্তি কার?

সবকিছুর মূলে রয়েছে এক চরম বৈশ্বিক অবিচার। বাংলাদেশ বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের মাত্র ০.৫৬ শতাংশের জন্য দায়ী, অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় আমরা শীর্ষ সাতে। ১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশের অনুভূত তাপমাত্রা ৪.৫ ডিগ্রি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বিশ্বের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। আমরা এই সমস্যার স্রষ্টা নই, বরং ধনী দেশগুলোর অতি-ভোগবাদী জীবনযাত্রার বলি। আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় সমুদ্রের বালুকণার মতো। এটি এমন এক নৈতিক সংকট, যেখানে দরিদ্র দেশগুলো অন্যের পাপের শাস্তি ভোগ করছে।

উত্তরণের পথ: কী করা প্রয়োজন?

তাপপ্রবাহকে একটি নিয়মিত মৌসুমি ঘটনা হিসেবে না দেখে একে একটি ‘জাতীয় জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। আমাদের একটি কার্যকর ‘জাতীয় তাপপ্রবাহ মোকাবিলা পরিকল্পনা’ প্রয়োজন। এর মধ্যে থাকতে পারে প্রতিটি ইউনিয়ন ও নগরীর মোড়ে শীতলীকরণ কেন্দ্র (Cooling Centers) এবং সুপেয় পানি বিতরণ কেন্দ্র স্থাপন। চরম তাপমাত্রার সময় বাইরের শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক বিশ্রামের আইন প্রণয়ন করতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে রিয়েল-টাইমে তাপজনিত অসুস্থতা ও মৃত্যুর হিসাব রাখার সক্ষমতা প্রদান করতে হবে। নগর পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন এনে বৃক্ষরোপণ ও জলাশয় রক্ষা নিশ্চিত করা জরুরি। ভবন নির্মাণে প্রতিফলক ছাদ এবং উন্নত বায়ু চলাচল ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে হবে।

আহমেদাবাদ বা এথেন্সের মতো শহরগুলো যদি তাপপ্রবাহ মোকাবিলা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে, তবে আমরা কেন নয়? আমাদের কারিগরি সক্ষমতা আছে, যা নেই তা হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছা। রাজশাহীর সেই রিকশাচালক নওশাদের কাছে এই সংকট কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়। প্রতিটি তপ্ত দিন মানেই তার পকেটে কম টাকা এবং ঘরে ক্ষুধার্ত মুখ। যে সংকট সে তৈরি করেনি, তার পুরো মূল্য তাকেই দিতে হচ্ছে নিজের শ্রম আর স্বাস্থ্য দিয়ে। আমরা যারা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি, তারা আর কতদিন অন্ধ সেজে থাকব? সূর্য যখন শাসকের মতো শাস্তি দিতে শুরু করে, তখন কেবল ছাতা ধরে তা থেকে বাঁচা সম্ভব নয়; প্রয়োজন একটি সামগ্রিক ও সংবেদনশীল ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন। নওশাদদের টিকে থাকার লড়াই এখন আমাদের সবার অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।

এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য আমাদের উন্নয়ন ভাবনাকে নতুন করে সাজাতে হবে। কেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি দিয়ে জীবনের মান বিচার করলে এই তপ্ত রাজপথের হাহাকার অজানাই থেকে যাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই নতুন বাস্তবতায় আমাদের অভিযোজন ক্ষমতা বাড়াতে হবে এমনভাবে, যাতে সমাজের প্রান্তিকতম মানুষটিও যেন এই অসহ্য উত্তাপ থেকে সুরক্ষা পায়। রাষ্ট্র ও সমাজ যদি আজ এই নীরব ঘাতক তাপপ্রবাহের বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ায়, তবে আগামী বছরগুলোতে এই আগুন কেবল নওশাদদের নয়, গ্রাস করবে গোটা ব্যবস্থাকেই।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়ন পেশাজীবী।

এইচআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow