হজ-পরবর্তী জীবনের পথরেখা

ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিধান হজ। হজ কেবল একটি সফর নয়, বরং আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং মহান সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য অর্জনের অনন্য অনুশীলন। একজন সামর্থ্যবান মুমিনের ওপর জীবনে মাত্র একবার হজ ফরজ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘হজ একবারই ফরজ, যে ব্যক্তি এর চেয়ে বেশি করবে, তা নফল হিসেবে গণ্য হবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১৭২১)। এই একটিমাত্র হজের প্রভাব যেন সারা জীবন পরিব্যাপ্ত থাকে, সে লক্ষ্যেই হজ সম্পাদন করা উচিত। হজের সফর থেকে ফিরে আসার পর হজের শিক্ষাকে জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে বাস্তবায়ন করাই হলো হজের মূল সার্থকতা। হজ থেকে নিষ্পাপ হয়ে ফেরা: হজ থেকে ফিরে আসা কোনো সাধারণ পর্যটনকেন্দ্র থেকে ফেরার মতো নয়; বরং এটি আল্লাহর ঘর জিয়ারত করে এক নতুন পবিত্র জীবন নিয়ে ফিরে আসা। যে ব্যক্তি নিষ্ঠার সঙ্গে হজ পালন করে, সে যেন নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করল এবং তাতে অশ্লীল কথা বা গুনাহের কাজে লিপ্ত হলো না, সে ওইদিনের মতো (নিষ্পাপ হয়ে) ফিরে আসবে, যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিলেন।’ (বুখারি, হাদিস : ১৫২১)। সুতরাং এ অনন্য সম্মানের মর্যাদা র

হজ-পরবর্তী জীবনের পথরেখা

ইসলামের অন্যতম মৌলিক বিধান হজ। হজ কেবল একটি সফর নয়, বরং আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং মহান সৃষ্টিকর্তার নৈকট্য অর্জনের অনন্য অনুশীলন। একজন সামর্থ্যবান মুমিনের ওপর জীবনে মাত্র একবার হজ ফরজ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘হজ একবারই ফরজ, যে ব্যক্তি এর চেয়ে বেশি করবে, তা নফল হিসেবে গণ্য হবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১৭২১)। এই একটিমাত্র হজের প্রভাব যেন সারা জীবন পরিব্যাপ্ত থাকে, সে লক্ষ্যেই হজ সম্পাদন করা উচিত। হজের সফর থেকে ফিরে আসার পর হজের শিক্ষাকে জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে বাস্তবায়ন করাই হলো হজের মূল সার্থকতা।

হজ থেকে নিষ্পাপ হয়ে ফেরা: হজ থেকে ফিরে আসা কোনো সাধারণ পর্যটনকেন্দ্র থেকে ফেরার মতো নয়; বরং এটি আল্লাহর ঘর জিয়ারত করে এক নতুন পবিত্র জীবন নিয়ে ফিরে আসা। যে ব্যক্তি নিষ্ঠার সঙ্গে হজ পালন করে, সে যেন নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করল এবং তাতে অশ্লীল কথা বা গুনাহের কাজে লিপ্ত হলো না, সে ওইদিনের মতো (নিষ্পাপ হয়ে) ফিরে আসবে, যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছিলেন।’ (বুখারি, হাদিস : ১৫২১)। সুতরাং এ অনন্য সম্মানের মর্যাদা রক্ষা করা ও গুনাহমুক্ত জীবন অতিবাহিত করা একজন হাজির প্রধান দায়িত্ব।

ইমান ও বিশ্বাসের চেতনা: হজের প্রতিটি পরতে পরতে তাওহিদের শিক্ষা বিদ্যমান। ইহরাম বাঁধার পর থেকেই হাজির মুখে উচ্চারিত হয় ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা-শারিকা লাকা লাব্বাইক...।’ এই তালবিয়া হলো আল্লাহর একত্ববাদের এক বলিষ্ঠ স্বীকৃতি। এর শিক্ষা হলো মুমিনের তাওহিদ শুধু বিশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা তার কর্ম, আচরণ ও চরিত্রে মিশে যেতে হবে। আল্লাহ ছাড়া আর কারও কাছে সাহায্য না চাওয়া এবং সব ইবাদত শুধু তারই জন্য নিবেদন করা হজের প্রধান সবক।

আত্মসমর্পণ ও আনুগত্য: হজ হলো যুক্তির চেয়ে হুকুমের প্রাধান্য দেওয়ার নাম। কেন কাবাঘর প্রদক্ষিণ করতে হবে, কেন হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করতে হবে কিংবা কেন জনমানবহীন মরুপ্রান্তরের মিনায় গিয়ে অবস্থান করতে হবে, এসবে জাগতিক কোনো যুক্তি নয়, বরং রবের নির্দেশ পালনই মুখ্য। ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইলের (আ.) সেই অনুপম আত্মত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যে মুমিন হলো সে-ই, যে আল্লাহর আদেশের সামনে নিজের ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দেয়। কোরআনে এসেছে, ‘যখন তার পালনকর্তা তাকে বললেন, অনুগত হও, তখন তিনি বললেন, আমি বিশ্বজগতের প্রতিপালকের অনুগত হলাম।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত : ১৩১)।

ধৈর্য, ত্যাগ ও অবিচলতা: হজের সফর শারীরিক ও মানসিকভাবে যথেষ্ট শ্রমসাধ্য। বিবি হাজেরা (রা.) ও ইসমাইলের (আ.) সেই অবর্ণনীয় ত্যাগ ও ধৈর্য হজের প্রতিটি পদক্ষেপে হাজিদের প্রেরণা জোগায়। সাফা-মারওয়া পাহাড়ে সাতবার দৌড়ানো সেই ত্যাগেরই স্মৃতিচারণা। হাজিকে হজ থেকে এই শিক্ষা নিতে হবে যে, দ্বিনের পথে চলতে গেলে কষ্ট আসবে, কিন্তু ধৈর্য ও অবিচলতা হারানো যাবে না। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত : ১৫৩)।

আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্টি: তাকদিরের ভালো-মন্দের ওপর সন্তুষ্ট থাকা ইমানের অংশ। হজের সফরে অনেক সময় অনেক প্রতিকূলতা দেখা দেয়। মক্কা-মদিনায় নবী-রাসুল ও তাদের পরিজনরা যে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন, তা স্মরণ করলে হাজির মনে এ বিশ্বাস জন্মে যে, আল্লাহ যা করেন তার মধ্যেই কল্যাণ নিহিত। হজ-পরবর্তী জীবনে অভাব-অনটন বা রোগ-শোকে আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থাকা হজেরই এক বিশেষ শিক্ষা।

উম্মাহর ঐক্য ও সাম্য: আরাফার ময়দান হলো বিশ্ব-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক। সেখানে রাজা-প্রজা, ধনী-দরিদ্র, সাদা-কালো সবাই এক পোশাকে আল্লাহর দরবারে হাজির হয়। এখানে কোনো আভিজাত্যের লড়াই নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) তার বিদায় হজের ভাষণে বলেছিলেন, ‘হে লোকসকল! তোমাদের পালনকর্তা এক এবং তোমাদের পিতাও এক। কোনো আরবের ওপর কোনো অনারবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই এবং কোনো অনারবের ওপর কোনো আরবের শ্রেষ্ঠত্ব নেই।’ (বায়হাকি)। এ সাম্যের শিক্ষা হাজিকে সমাজ থেকে বর্ণবাদ ও ভেদাভেদ দূর করতে উৎসাহিত করে।

ইসলামের নিদর্শনের প্রতি শ্রদ্ধা: আল্লাহতায়ালা হজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোকে তার ‘নিদর্শন’ বা ‘শাআয়ের’ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে কোরআন, বাইতুল্লাহ, সাফা-মারওয়া ও হজের পবিত্র দিনগুলো। কোরআনুল কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘কেউ আল্লাহর নিদর্শনাবলির প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলে তা তো তার অন্তরের তাকওয়া থেকেই উদ্ভূত।’ (সুরা : হজ, আয়াত : ৩২)। হজ করে আসা ব্যক্তি ইসলামের প্রতিটি প্রতীকের প্রতি অন্যদের তুলনায় বেশি শ্রদ্ধাশীল হবেন, এটাই স্বাভাবিক।

বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ পবিত্রতা: হজ আমাদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও আধ্যাত্মিক পবিত্রতার শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ ইবরাহিম (আ.) ও ইসমাইলকে (আ.) আদেশ করেছিলেন, ‘তোমরা উভয়ে আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, ইতিকাফকারী এবং রুকু ও সেজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখো।’ (সুরা বাকারাহ, আয়াত : ১২৫)। ঘর যেমন পবিত্র রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তেমনি মুমিনের অন্তরকেও হিংসা, গিবত ও অহংকার থেকে পবিত্র রাখতে হবে। হজের শিক্ষা হলো মার্জিত ভাষা ও ভদ্র আচরণ দিয়ে নিজেকে সজ্জিত করা।

হালাল জীবিকার গুরুত্ব: হজ কবুল হওয়ার অন্যতম প্রধান শর্ত হলো হালাল উপার্জন। হারাম টাকা দিয়ে হজের সফর করা বা হারাম খাদ্য গ্রহণ করে দোয়া করা আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন যে দীর্ঘ সফর করে ধুলামলিন অবস্থায় আসমানের দিকে হাত তুলে ডাকছে ‘হে রব! হে রব!’ অথচ তার খাদ্য হারাম, পানীয় হারাম, পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারাই পুষ্টি লাভ করেছে, তবে কীভাবে তার দোয়া কবুল হবে? (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০১৫)। সুতরাং হজ-পরবর্তী জীবনে সুদ, ঘুষ এবং সব অনৈতিক আয় বর্জন করা ইমানি দাবি।

পারিবারিক দায়িত্ব ও তরবিয়ত: ইসমাইলের (আ.) আদর্শ থেকে সন্তানদের জন্য শিক্ষা হলো পিতা-মাতার আনুগত্য। আর অভিভাবকদের শিক্ষা হলো সন্তানদের আখিরাতমুখী করে গড়ে তোলা। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্পর্কের বিষয়ে রাসুল (সা.) হজের সময়েও গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের (স্ত্রীর) কাছে সর্বোত্তম।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)। হজের আধ্যাত্মিক আবহ যেন হাজির পরিবারেও বিরাজ করে, সেদিকে বিশেষ নজর দিতে হবে। হজের বরকত ও শিক্ষা তখনই সার্থক হবে, যখন তা হাজির দৈনন্দিন জীবনে ফুটে উঠবে। হজ শেষে বাড়ি ফিরে ইবাদতে অলসতা নয়, বরং আরও বেশি একাগ্রতা আসা প্রয়োজন। যদি কারও চরিত্রে হজের পর ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, তবেই তা ‘হজে মাবরুর’ বা কবুল হজের লক্ষণ। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে হজের মহান শিক্ষাগুলো সারা জীবন ধারণ করার তওফিক দান করুন।

লেখক: ইমাম ও খতিব

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow