হামের উচ্চ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ: ডব্লিউএইচও

* বাংলাদেশ নিয়ে ডব্লিউএইচওর সতর্কতা * * ৫৮ জেলায় ছড়িয়েছে সংক্রমণ * * শিশুদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগজনক বিস্তার * বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটি দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই সতর্কতা জানানো হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় ইতোমধ্যে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিপুল-সংখ্যক শিশুর আক্রান্ত হওয়া, টিকাদানের ঘাটতি এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাগুলো এই উচ্চ ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি (আইএইচআর) ফোকাল পয়েন্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানায়, দেশে হামের রোগী সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জানুয়ারি থেকেই সংক্রমণ বাড়ার প্রবণতা স্পষ্ট হতে থাকে, যা মূলত অভ্যন্তরীণ সংক্রমণের ফল। আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ১৯ হাজার ১৬১ সন্দেহভাজন হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছ

হামের উচ্চ ঝুঁকিতে বাংলাদেশ: ডব্লিউএইচও
* বাংলাদেশ নিয়ে ডব্লিউএইচওর সতর্কতা *
* ৫৮ জেলায় ছড়িয়েছে সংক্রমণ *
* শিশুদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগজনক বিস্তার *

বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। সংস্থাটি দেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে জাতীয়ভাবে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছে। গত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই সতর্কতা জানানো হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় ইতোমধ্যে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। বিপুল-সংখ্যক শিশুর আক্রান্ত হওয়া, টিকাদানের ঘাটতি এবং হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাগুলো এই উচ্চ ঝুঁকি মূল্যায়নের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০২৬ সালের ৪ এপ্রিল বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি (আইএইচআর) ফোকাল পয়েন্ট বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে জানায়, দেশে হামের রোগী সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। জানুয়ারি থেকেই সংক্রমণ বাড়ার প্রবণতা স্পষ্ট হতে থাকে, যা মূলত অভ্যন্তরীণ সংক্রমণের ফল।

আক্রান্ত ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৫ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে মোট ১৯ হাজার ১৬১ সন্দেহভাজন হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছে দুই হাজার ৮৯৭ জন, যদিও বিস্তারিত অংশে এই সংখ্যা দুই হাজার ৯৭৩ উল্লেখ করা হয়েছে।

এই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ১৬৬ জন, যেখানে মৃত্যুহার (সিএফআর) ০.৯ শতাংশ। পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামের কারণে মৃত্যু হয়েছে ৩০ জনের, এ ক্ষেত্রে মৃত্যুহার ১.১ শতাংশ।

হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১২ হাজার ৩১৮ জন এবং সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে ৯ হাজার ৭৭২ জন।

কোন এলাকায় বেশি সংক্রমণ

সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ঢাকা বিভাগে—৮ হাজার ২৬৩ জন। এরপর রাজশাহী (৩,৭৪৭), চট্টগ্রাম (২,৫১৪) এবং খুলনা বিভাগে (১,৫৬৮) সংক্রমণ বেশি।

ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকায় সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলে।

শিশুদের মধ্যে বেশি ঝুঁকি

প্রতিবেদন অনুযায়ী, আক্রান্তদের বড় অংশই শিশু। আক্রান্তদের ৮৩ শতাংশের বয়স পাঁচ বছরের নিচে। হাসপাতালে যাওয়া রোগীদের মধ্যে ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী।

এর মধ্যে দুই বছরের কম বয়সী ৬৬ শতাংশ এবং ৯ মাসের কম বয়সী শিশু ৩৩ শতাংশ। সন্দেহভাজন ১৬৬ মৃত্যুর বেশিরভাগই টিকা না পাওয়া দুই বছরের কম বয়সী শিশু।

এছাড়া ৯১ শতাংশ রোগী এক থেকে ১৪ বছর বয়সী, যা এই বয়সী শিশুদের মধ্যে বড় ধরনের রোগপ্রতিরোধ ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়।

হামের প্রকৃতি ও ঝুঁকি

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাস ও ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রমণের ৭–২৩ দিনের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয়, যেমন জ্বর, সর্দি, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং মুখে সাদা দাগ। পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়।

ফুসকুড়ি ওঠার চার দিন আগে থেকে চার দিন পর পর্যন্ত রোগটি ছড়াতে পারে। যদিও নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই, বেশিরভাগ রোগী ২–৩ সপ্তাহে সুস্থ হয়। তবে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এনসেফালাইটিস, অন্ধত্ব এমনকি মৃত্যুঝুঁকিও রয়েছে।

টিকাদানে ঘাটতির প্রভাব

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, বাংলাদেশ একসময় হাম নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছিল। তবে ২০২৪–২৫ সালে এমআর টিকার ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানের ফাঁক এবং সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ থাকার কারণে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে।

ফলে টিকা না পাওয়া বা আংশিক টিকা পাওয়া শিশুর সংখ্যা বেড়ে যায়, যা বর্তমান প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ।

সরকারের পদক্ষেপ ও চলমান কার্যক্রম

জাতীয় টিকাদান কারিগরি উপদেষ্টা কমিটি (এনআইটিএজি) ৩০ মার্চ দেশব্যাপী এমআর টিকাদান কর্মসূচি অনুমোদন করে। ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় শুরু হয়ে ২০ এপ্রিল তা সারাদেশে বিস্তৃত হয়।

এছাড়া আরও যেসব কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়-

ভিটামিন এ সরবরাহ জোরদার করা হয়েছে
দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল (আরআরটি) সক্রিয় করা হয়েছে
হাসপাতালের প্রস্তুতি বাড়ানো হয়েছে
রোগ শনাক্ত ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে

সীমান্ত ও আন্তর্জাতিক ঝুঁকি

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে, সীমান্তবর্তী এলাকায় মানুষের চলাচলের কারণে সংক্রমণ অন্য দেশে ছড়ানোর ঝুঁকি রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও কক্সবাজার আন্তর্জাতিক যাতায়াতের কেন্দ্র হওয়ায় ঝুঁকি বাড়ছে।

ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলেও ঝুঁকি ‘উচ্চ’ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ

সংস্থাটি অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদান কভারেজ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি:

নজরদারি জোরদার
দ্রুত রোগ শনাক্ত
সীমান্ত এলাকায় সতর্কতা বৃদ্ধি
ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর টিকাদান
হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন

উল্লেখ্য, এই প্রাদুর্ভাবকে বাংলাদেশের আগের সাফল্যে বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে সতর্ক করা হয়েছে।

সূত্র: ডব্লিউএইচও

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow