হিমালয়ে ওঠেও বাবার মতো উঁচু কিছু দেখেননি বাবর আলী

পাহাড় জয় নেশা তার। চূড়ায় ওঠে নিচের দিকে তাকালে সব ছোট থেকে আরো ছোট মনে হয়। আর নিচ থেকে তাকালে মনে হয়, এত উঁচু পাহাড় জয় করতেই হবে। পাহাড় জয়ের এ নেশা পর্বতারোহী বাবার আলীকে নিয়ে গেছে দুর্গম ও টেকনিক্যাল শৃঙ্গ আমা দাবলাম থেকে শুরু করে হিমালয় হয়ে মানাসলু পর্যন্ত। কিন্তু বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে ওঠেও নিজের বাবার চেয়ে উঁচু কোনো কিছু দেখেননি ডা. বাবর আলী। বাবা দিবসে বাবাকেই তাই সবার উঁচুতে রাখতে চান ডা. বাবর আলী। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‌আমার জীবনের প্রতিটি ধাপে বাবার প্রভাব ছিল গভীর ও নির্ধারক। পরিবারের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আমি চিকিৎসা পেশা বেছে নিয়েছি, তবে পাহাড়ের প্রতি আমার টান কখনোই কমেনি। বাবার ইচ্ছাতেই আমি ডাক্তার হয়েছি এবং সেই দায়িত্ব আমি সম্মান রেখে পালন করেছি। একই সঙ্গে নিজের ভেতরের পাহাড়প্রেমও আমি ধরে রেখেছি। বাবর আলী বলেন, তার শৈশব ও বেড়ে ওঠার সময় বাবার জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা তার চিন্তাভাবনায় গভীর ছাপ ফেলে। বাবার কর্মজীবনের কারণে বছরে সীমিত সময় প্রায় ৪৫ দিন তিনি পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। সেই সময়গুলোই তার কাছে ছিল সবচেয়ে মূল্যবান, যেখানে বাবার গল্প কর্মজীবনের অভিজ্ঞ

হিমালয়ে ওঠেও বাবার মতো উঁচু কিছু দেখেননি বাবর আলী

পাহাড় জয় নেশা তার। চূড়ায় ওঠে নিচের দিকে তাকালে সব ছোট থেকে আরো ছোট মনে হয়। আর নিচ থেকে তাকালে মনে হয়, এত উঁচু পাহাড় জয় করতেই হবে। পাহাড় জয়ের এ নেশা পর্বতারোহী বাবার আলীকে নিয়ে গেছে দুর্গম ও টেকনিক্যাল শৃঙ্গ আমা দাবলাম থেকে শুরু করে হিমালয় হয়ে মানাসলু পর্যন্ত। কিন্তু বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টে ওঠেও নিজের বাবার চেয়ে উঁচু কোনো কিছু দেখেননি ডা. বাবর আলী।

বাবা দিবসে বাবাকেই তাই সবার উঁচুতে রাখতে চান ডা. বাবর আলী। কালবেলাকে তিনি বলেন, ‌আমার জীবনের প্রতিটি ধাপে বাবার প্রভাব ছিল গভীর ও নির্ধারক। পরিবারের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আমি চিকিৎসা পেশা বেছে নিয়েছি, তবে পাহাড়ের প্রতি আমার টান কখনোই কমেনি। বাবার ইচ্ছাতেই আমি ডাক্তার হয়েছি এবং সেই দায়িত্ব আমি সম্মান রেখে পালন করেছি। একই সঙ্গে নিজের ভেতরের পাহাড়প্রেমও আমি ধরে রেখেছি।

বাবর আলী বলেন, তার শৈশব ও বেড়ে ওঠার সময় বাবার জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা তার চিন্তাভাবনায় গভীর ছাপ ফেলে। বাবার কর্মজীবনের কারণে বছরে সীমিত সময় প্রায় ৪৫ দিন তিনি পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। সেই সময়গুলোই তার কাছে ছিল সবচেয়ে মূল্যবান, যেখানে বাবার গল্প কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা এবং বাইরের পৃথিবীর নানা বাস্তবতা শোনার সুযোগ তৈরি হতো।

২০১৪ সালে পর্বতারোহণে যাত্রা শুরু করেন বাবর আলী। চট্টগ্রামের ‘ভার্টিক্যাল ড্রিমার্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও বর্তমান সাধারণ সম্পাদক তিনি। ২০১৭ সালে ভারতের উত্তরকাশীর নেহরু ইনস্টিটিউট অব মাউন্টেনিয়ারিং থেকে মৌলিক প্রশিক্ষণ নেন। ২০২২ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে দুর্গম ও টেকনিক্যাল শৃঙ্গ আমা দাবলাম জয় করেন। ২০২৪ সালে একই অভিযানে জয় করেন বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ এভারেস্ট ও চতুর্থ সর্বোচ্চ শৃঙ্গ লোৎসে। গত বছর প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আরোহণ করেন অন্নপূর্ণা-১ এবং একই বছরের সেপ্টেম্বরে কৃত্রিম অক্সিজেন ছাড়াই জয় করেন মানাসলু।

বাবর আলী বলেন, এভারেস্ট জয়ের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই পরিবারে তৈরি হয় আবেগঘন পরিবেশ। দীর্ঘ প্রস্তুতি, ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান এবং সন্তানের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষা মিলিয়ে পরিবারটি এক ধরনের চাপ, গর্ব ও উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে সময় পার করেছে। সেই আবেগের কেন্দ্রে ছিলেন একজন বাবা, যিনি সন্তানের স্বপ্ন ও বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রেখে তাকে বড় করেছেন।

তিনি আরও বলেন, পরিবারে যখন দাদা অসুস্থ ছিলেন, তখন বাবা মনে করেছিলেন পরিবারের বাস্তব প্রয়োজন থেকেই একজন ডাক্তার দরকার। সেই জায়গা থেকেই আমার চিকিৎসক হওয়ার পথ শুরু হয়। মূলত বাবার সেই সিদ্ধান্ত ও স্বপ্নই আমাকে এই পথে এগিয়ে দিয়েছে।

তিনি বলেন, তার জীবনের অন্যতম শক্তি ছিল পারিবারিক শাসন ও ভালোবাসা। বিশেষ করে মায়ের কঠোর শাসন এবং বাবার দিকনির্দেশনা তাকে শৃঙ্খলিত ও লক্ষ্যনিষ্ঠ করে তুলেছে। শৈশবের বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বুঝেছেন, একটি পরিবারে শুধু নিয়ম-শাসন নয় সন্তানের স্বপ্ন ও আগ্রহকে গুরুত্ব দেওয়াও সমানভাবে জরুরি।

নিজের অভিজ্ঞতা থেকে এ পর্বতারোহী বলেন, আমি এখন নিজেও একজন বাবা। তখন বুঝতে পারি শুধু শাসন নয়, সন্তানের স্বপ্ন বোঝাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই বোঝাপড়াই সন্তানের ভেতরের ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে এবং তাকে সঠিক পথে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখে। এভারেস্ট জয় তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলোর একটি।

গর্বিত সন্তান ডা. বাবর আলীর বাবা লিয়াকত আলী বলেন, তার ছেলে ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ও পরিশ্রমী ছিল। পড়ালেখায় ভালো হলেও তার মধ্যে ভিন্ন ধরনের স্বপ্ন ও আগ্রহ কাজ করত। তিনি বলেন, আমার ছেলে পড়ালেখায় খুব ভালো ছিল। যা পড়ত সহজেই মনে রাখতে পারত। আমরা চেয়েছিলাম সে ডাক্তার হোক, সেই ইচ্ছাতেই সে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছে। কিন্তু তার ভেতরে ঘুরে বেড়ানোর, পাহাড় দেখার একটা টান ছিল।

তিনি আরও বলেন, পরিবারের ইচ্ছার প্রতি সম্মান রেখেই বাবর আলী চিকিৎসা পেশায় যুক্ত হন, তবে নিজের ভেতরের স্বপ্ন তিনি কখনো থামাননি। আমরা তাকে ডাক্তারি পড়তে চাপ দিয়েছিলাম। সে আমাদের ইচ্ছা পূরণ করেছে। কিন্তু তার নিজের স্বপ্ন ছিল পাহাড় জয় করা। সে ঘুরতে ভালোবাসত, বিভিন্ন জায়গার গল্প শুনত। সেখান থেকেই এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন তৈরি হয়।

লিয়াকত আলী জানান, শৈশব থেকেই তিনি সন্তানের প্রতি শাসন ও ভালোবাসার ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে শাসন যেমন প্রয়োজন, তেমনি তার স্বপ্ন বোঝাও জরুরি। আমার ছেলে আমাদের খুব বেশি কিছু বলত না, কিন্তু ভাই-বোনদের সঙ্গে তার স্বপ্নের কথা শেয়ার করত। আমরা শাসন করতাম, আবার ভালোও বাসতাম। সেই দুইয়ের ভারসাম্যেই সে বড় হয়েছে।

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow