‘১১ দিন পর স্কুলে পাঠিয়েছিলাম, সেদিনই লাশ হয়ে ফিরল আমার ছেলে’

“১১ দিন অসুস্থ থাকার পর ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়েছিলাম। স্কুল থেকে বারবার ফোন করে বলছিল, ‘স্কুলে দেন, স্কুলে দেন।’ আমি পাঠালাম। কিন্তু সেদিনই আমার ছেলেটা লাশ হয়ে বাসায় ফিরল।” কথাগুলো বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী মাহিত হাসান আরিয়ানের মা মনিকা আক্তার। মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্তি আজ। ২০২৫ সালের ২১ জুলাই দুপুর সোয়া ১টা নাগাদ উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের হায়দার আলী ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই মডেলের যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তেই এক মর্মান্তিক দৃশ্যের অবতারণা হয় সেখানে। দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে পুড়ে যায় ছোট শিশুদের কোমল শরীর। এ ঘটনায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকসহ অন্তত ৩৬ জন নিহত হয়। আহত হয় শতাধিক। হতাহতদের অধিকাংশই শিশু। সেদিন প্রাণ হারান পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামও। দিয়াবাড়ির তারারটেক মসজিদের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি শুয়ে আছে মাইলস্টোনে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত তিন ছাত্র/ছবি: জাগো নিউজ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় মাইলস

‘১১ দিন পর স্কুলে পাঠিয়েছিলাম, সেদিনই লাশ হয়ে ফিরল আমার ছেলে’

“১১ দিন অসুস্থ থাকার পর ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়েছিলাম। স্কুল থেকে বারবার ফোন করে বলছিল, ‘স্কুলে দেন, স্কুলে দেন।’ আমি পাঠালাম। কিন্তু সেদিনই আমার ছেলেটা লাশ হয়ে বাসায় ফিরল।”

কথাগুলো বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন রাজধানীর উত্তরায় মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী মাহিত হাসান আরিয়ানের মা মনিকা আক্তার।

মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির এক বছর পূর্তি আজ। ২০২৫ সালের ২১ জুলাই দুপুর সোয়া ১টা নাগাদ উত্তরার দিয়াবাড়িতে মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ক্যাম্পাসের হায়দার আলী ভবনে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এফ-৭ বিজিআই মডেলের যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়। মুহূর্তেই এক মর্মান্তিক দৃশ্যের অবতারণা হয় সেখানে।

দাউদাউ করে জ্বলে ওঠা আগুনে পুড়ে যায় ছোট শিশুদের কোমল শরীর। এ ঘটনায় শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকসহ অন্তত ৩৬ জন নিহত হয়। আহত হয় শতাধিক। হতাহতদের অধিকাংশই শিশু। সেদিন প্রাণ হারান পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলামও।

‘১১ দিন পর স্কুলে পাঠিয়েছিলাম, সেদিনই লাশ হয়ে ফিরল আমার ছেলে’দিয়াবাড়ির তারারটেক মসজিদের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি শুয়ে আছে মাইলস্টোনে বিমান দুর্ঘটনায় নিহত তিন ছাত্র/ছবি: জাগো নিউজ

যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় মাইলস্টোনের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র আরিয়ান (১০) এবং তার দুই চাচাতো ভাই বোরহান উদ্দিন বাপ্পি ও ওমায়ের নূর আসফিকও মারা যায়। তারা সবাই দিয়াবাড়ির তারারটেক মসজিদের পাশে বসবাস করতো। একসঙ্গে স্কুল যেতো, ফিরতোও একসঙ্গে। কিন্তু সেদিন চলে গেছে চিরতরে। এখন তারা পাশাপাশি কবরে শুয়ে আছে।

পরিবারের ছোট্ট সন্তানদের হারানোর ক্ষত এখনও জ্বলজ্বল করছে স্বজনদের বুকে। সেই দিনের দুঃসহ স্মৃতি মুছে যায়নি একটুও।

গত রোববার দিয়াবাড়ির তারারটেক মসজিদের পাশে আরিয়ানদের বাসায় গিয়ে দেখা যায় সেই চিত্র।

‘১১ দিন পর স্কুলে পাঠিয়েছিলাম, সেদিনই লাশ হয়ে ফিরল আমার ছেলে’আরিয়ানের মা মনিকা আক্তার/ছবি: জাগো নিউজ

একই দুর্ঘটনায় পরিবারের তিন সদস্যকে হারানোর বেদনা স্মরণ করে আরিয়ানের মা মনিকা আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘সরকার থেকে কেউ আসেনি, স্কুল থেকেও না। তিনটি প্রাণ হারানোর পরও আমরা একা হয়ে গেছি। এই কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।’

ছেলের শেষ মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে মনিকা বলেন, ‘আমার আরিয়ান খুব মেধাবী ছিল। আগুনে ওর পুরো শরীর পুড়ে গিয়েছিল। পা থেকে মাথা পর্যন্ত চামড়া আর মাংস ঝলসে গিয়েছিল। তারপরও ও আমাদের সঙ্গে কথা বলেছিল। সেই দৃশ্য কোনো দিন ভুলতে পারব না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার বুকের কলিজাটা আগুনে পুড়ে গেছে। প্রতি রাতে, প্রতি মুহূর্তে আমার ছেলেকে খুঁজি। এক সেকেন্ডের জন্যও ওকে ভুলতে পারি না। মানুষ বলে, কাল এক বছর হবে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় এখনো সেই দিনই চলছে।’

আরিয়ানের মা মনিকার অভিযোগ, দুর্ঘটনার পর থেকে আজ পর্যন্ত স্কুল কর্তৃপক্ষ কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে তাদের পরিবারের সঙ্গে কোনো কার্যকর যোগাযোগ করা হয়নি।

তিনি বলেন, ‘এই পর্যন্ত স্কুল থেকেও আমাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করা হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকেও কেউ আমাদের খোঁজ নিতে আসেনি। এতগুলো শিশু মারা গেল, কিন্তু তাদের মা-বাবা কেমন আছেন, সেটা দেখারও যেন কারও সময় হয়নি।’

‘একটা তদন্তের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু সেই তদন্তের কী হলো, কোনো বাস্তবায়ন আমরা দেখিনি। এত বড় একটা দুর্ঘটনার পরও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা দেখতে পাইনি।’ বলছিলেন মনিকা।

‘১১ দিন পর স্কুলে পাঠিয়েছিলাম, সেদিনই লাশ হয়ে ফিরল আমার ছেলে’মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা কর্নেল (অব.) নুরুন নবী/ছবি: জাগো নিউজ

এদিকে, মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা কর্নেল (অব.) নুরুন নবী বলেন, দুর্ঘটনার পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে আন্তরিকতা দেখানো হয়েছিল এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, ‘তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট সবাই আন্তরিক ছিলেন। তারা সমবেদনা জানিয়েছেন এবং একটি কমিটি গঠন করেছিলেন। সেই কমিটির সঙ্গে আমি বেশ কয়েকবার দেখা করেছি।’

তবে আহতদের চিকিৎসা ব্যয়ের তুলনায় আর্থিক সহায়তা পর্যাপ্ত ছিল না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

নুরুন নবী বলেন, ‘যে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, সেটা যথেষ্ট ছিল না। বিশেষ করে আহত শিশুদের ক্ষেত্রে পাঁচ লাখ টাকা দিয়ে চিকিৎসার ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়। বিমান দুর্ঘটনায় সৃষ্ট আগুনে পোড়া ক্ষত অত্যন্ত জটিল। একবার অস্ত্রোপচার করলেই শেষ হয় না। কয়েক মাস পর আবারও অস্ত্রোপচার করতে হয়। চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখনো আমাদের কয়েকজন অভিভাবক আছেন, যারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল। কেউ একক অভিভাবক, কেউ সিঙ্গেল মাদার। আমরা আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।’

এসএএফ/এমএমএআর

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow