১৫ বছর ঝুলে আছে কাজ, গুলশান-বনানী-বারিধারার মানববর্জ্য এখনো পড়ছে লেকে
রাজধানীর পরিবেশগত উন্নয়ন, জলাধার সংরক্ষণ ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে ২০১০ সালে গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয় রাজউক। তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্প ১৫ বছরেও শেষ হয়নি। এরই মধ্যে প্রকল্পে ৩০৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।খনন, তীর সংরক্ষণ, ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও আংশিক সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হলেও তা সমানভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে কিছু এলাকায় উন্নয়নের প্রভাব দৃশ্যমান হলেও সামগ্রিকভাবে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না। এর মধ্যে বনানী কবরস্থান, নিকেতন-পুলিশ প্লাজা, বনানী ১১ নম্বর ব্রিজ, চেয়ারম্যানবাড়ী ও কড়াইল বস্তিসহ প্রায় সাতটি স্থান দিয়ে সরাসরি স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ লাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত মানববর্জ্য লেকে পড়ছে। এতে লেকের পানি কালো, দুর্গন্ধযুক্ত ও অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে। ফলে পরিবেশগত ভারসাম্য ও ব্যবহারযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যও ব্যাহত হচ্ছে। ‘গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের ধীরগতি ও কাঠামোগত দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায়। আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে
রাজধানীর পরিবেশগত উন্নয়ন, জলাধার সংরক্ষণ ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে ২০১০ সালে গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয় রাজউক। তিন বছর মেয়াদি এ প্রকল্প ১৫ বছরেও শেষ হয়নি। এরই মধ্যে প্রকল্পে ৩০৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
খনন, তীর সংরক্ষণ, ওয়াকওয়ে নির্মাণ ও আংশিক সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ হলেও তা সমানভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে কিছু এলাকায় উন্নয়নের প্রভাব দৃশ্যমান হলেও সামগ্রিকভাবে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না।
এর মধ্যে বনানী কবরস্থান, নিকেতন-পুলিশ প্লাজা, বনানী ১১ নম্বর ব্রিজ, চেয়ারম্যানবাড়ী ও কড়াইল বস্তিসহ প্রায় সাতটি স্থান দিয়ে সরাসরি স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ লাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত মানববর্জ্য লেকে পড়ছে। এতে লেকের পানি কালো, দুর্গন্ধযুক্ত ও অস্বাস্থ্যকর হয়ে উঠেছে। ফলে পরিবেশগত ভারসাম্য ও ব্যবহারযোগ্যতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যও ব্যাহত হচ্ছে।
‘গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন’ প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় ধরনের ধীরগতি ও কাঠামোগত দুর্বলতার চিত্র উঠে এসেছে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ সমীক্ষায়।
আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্পে ৯ লাখ ৫১ হাজার ৬৩৪ ঘনমিটার লেক খননের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এখন পর্যন্ত খনন হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫৮ হাজার ৭৬৭ ঘনমিটার, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ২৭ শতাংশ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী লেক খনন করা হলে এর সামগ্রিক অবস্থা আরও ভালো হতো। তবে বাস্তবে বনানী কবরস্থান থেকে বনানী ১১ নম্বর ব্রিজ এবং নিকেতন ব্রিজ থেকে গুলশান-মহাখালী লিংক রোড পর্যন্ত অংশে ২০১৮ সালে খননকাজ সম্পন্ন হয়। বনানী ও নিকেতন সংলগ্ন নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় কাজ সীমাবদ্ধ থাকায় লেকের বাইরের অংশগুলোতে প্রয়োজনীয় খনন করা হয়নি।
আইএমইডি জানায়, লেকে অবাধে প্লাস্টিক, গৃহস্থালি ও কঠিন বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবে এসব বর্জ্য জমে পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করছে। এতে লেকের নান্দনিকতা ও পরিবেশগত মানও কমছে। পুনঃখননের ফলে লেকের গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা বাড়লেও তলদেশে বিপুল পরিমাণ পলি ও বর্জ্য জমে আছে। এতে দীর্ঘমেয়াদে পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি লেকের প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে পানির গুণগত মানেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বরং পানিতে দুর্গন্ধ ও দূষণের মাত্রা বেশি থাকায় জলজ জীববৈচিত্র্য কমছে এবং দুর্বল হয়ে পড়ছে লেকের বাস্তুসংস্থান।
এ বিষয়ে বনানী-বারিধারা-গুলশান লেক উন্নয়ন প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক আমিনুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, বিভিন্নভাবে গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকার বাসাবাড়ির মানববর্জ্য লেকেই পড়ছে। লেক এলাকায় গেলেই এর চিত্র দেখা যায়। অথচ এসব মানববর্জ্য দাশেরকান্দি পয়ঃবর্জ্য শোধনাগারে যাওয়ার কথা ছিল।
গুলশান, বনানী ও বারিধারার বিভিন্ন বাসাবাড়ির মানববর্জ্য সরাসরি লেকে পড়ছে। অথচ এসব বর্জ্য দাশেরকান্দি পয়ঃবর্জ্য শোধনাগারে যাওয়ার কথা ছিল।— প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক আমিনুর রহমান
তিনি বলেন, বাড়িওয়ালাদের এসটিপি (পয়োবর্জ্য শোধন কেন্দ্র) স্থাপনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকার মধ্যে ছোট আকারের এসটিপি স্থাপন করা সম্ভব। এতে সরাসরি মানববর্জ্য লেকে পড়বে না এবং লেকও কিছুটা রক্ষা পাবে। জাপানে প্রতিটি বাড়িতে এ ধরনের ছোট এসটিপি রয়েছে। অন্যদিকে, কড়াইল বস্তিতে সেপটিক ট্যাংক স্থাপনের ব্যবস্থা করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দীর্ঘদিনের দখল, দূষণ ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকার প্রাকৃতিক লেকগুলো তাদের স্বাভাবিক পরিবেশগত কার্যকারিতা হারাতে থাকে। এতে পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি জলাবদ্ধতা বাড়ে এবং নাগরিকদের যাতায়াত ও চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয়। এ পরিস্থিতিতে পরিবেশ উন্নয়ন, জলাধার সংরক্ষণ ও নাগরিক সুবিধা বাড়াতে গৃহায়ন এবং গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন রাজউক ‘গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন প্রকল্প (প্রথম সংশোধিত)’ নেয়।
২০১০ সালের জুলাইয়ে ৪১০ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেয় একনেক। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন (জিওবি) ৩১৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা এবং রাজউকের নিজস্ব অর্থায়ন ৯৫ কোটি ৬২ লাখ টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছিল ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৩ সালের জুন পর্যন্ত। তবে প্রথম সংশোধনীতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এর মধ্যে শুধু রাজউকের নিজস্ব অর্থায়নই বেড়েছে ১৪৫ কোটি টাকা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের গুলশান, বনানী ও বাড্ডা থানার এলাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির ক্রমপুঞ্জিত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ৩০৬ কোটি ৭ লাখ টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৭৪ দশমিক ৬০ শতাংশ। এ সময়ে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি ছিল ৭৫ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের এডিপিতেও প্রকল্পটি ৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দসহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতে মূল প্রাক্কলিত ব্যয়ের তুলনায় প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে ৩৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ। একই সঙ্গে ব্যয় না বাড়িয়ে একাধিকবার প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে, যা মূল মেয়াদের তুলনায় ৪৫০ শতাংশ বেশি।
গুলশান-বারিধারা লেক
প্রকল্পের আওতায় লেক খনন, দূষণমুক্তকরণ, লেক ড্রাইভ সড়ক ও ওয়াকওয়ে নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ এবং বিদ্যুতায়নসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নাগরিকদের নিরাপদ ও উন্নত যাতায়াত সুবিধা নিশ্চিত করার কথা ছিল। তবে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনায় আর্থিক অগ্রগতি ৫৬ শতাংশ এবং ভৌত অগ্রগতি ৮২ শতাংশ পাওয়া গেছে।
আইএমইডি জানিয়েছে, নতুন সংযোজিত ৩ দশমিক ২১ একর জমি বাদ দিয়ে আগে নির্ধারিত ১০ দশমিক ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে। একই সঙ্গে মেরামত প্যাকেজের কাজ সম্পন্ন করে ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে প্রকল্প শেষ করার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেও প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না করেই এটি সমাপ্তির পথে এগোচ্ছে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ড. সাবের আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, গুলশান, বারিধারা ও বনানী এলাকায় রাজউকের পক্ষ থেকে সার্ভে করা হচ্ছে। প্রতিটি বাড়িতে সেপটিক ট্যাংক আছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। যেসব বাড়িতে নেই, সেসব বাড়ির মালিককে এক মাসের মধ্যে সেপটিক ট্যাংক স্থাপনের জন্য নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি এসটিপি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে আলোচনা চলছে। বারিধারা এলাকায় ওয়াসার কোনো স্যুয়ারেজ লাইন নেই। এই কাজ ওয়াসা করবে তবেই মুক্তি পাবে এ লেক।’
গুলশান, বনানী ও বারিধারায় সেপটিক ট্যাংক আছে কি না, তা যাচাইয়ে রাজউকের সার্ভে চলছে। যেসব বাড়িতে নেই, তাদের এক মাসের মধ্যে ট্যাংক স্থাপনের নোটিশ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি এসটিপি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বারিধারায় ওয়াসার স্যুয়ারেজ লাইন না থাকায়, এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে ওয়াসার উদ্যোগ জরুরি।— বনানী-বারিধারা-গুলশান লেক উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক ড. সাবের আহমেদ
তিনি বলেন, ২০২৬ সালেই প্রকল্পের কাজ শেষ হবে।
প্রকল্পটি গুলশান, বনানী ও বারিধারা এলাকার ৮ দশমিক ৮০ কিলোমিটার লেক উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া হলেও ডিপিপিতে নির্ধারিত লক্ষ্য অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গভাবে কাজ বাস্তবায়িত হয়নি। ডিপিপি অনুযায়ী, প্রায় ৮ দশমিক ৮ কিলোমিটার লেকের মধ্যে ৬০ শতাংশ অংশ উন্নয়নের জন্য সংস্থান রাখা হয়েছিল। তবে বাস্তবে উন্নয়নকাজ সম্পন্ন হয়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৮০ কিলোমিটার এলাকায়, যা পরিকল্পিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় কম।
দলিলপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ডিপিপির তুলনায় কাজের পরিমাণ কমলেও প্রকল্পের ব্যয় কমেনি। এর অন্যতম কারণ, প্রকল্প প্রণয়নের সময় কোনো বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়নি। ফলে খাতভিত্তিক কাজের পরিমাণ ও ব্যয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকায় পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।

গুলশান-বনানী লেকে নৌ চলাচল কবে?
প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণ ছাড়া অন্যান্য কার্যক্রম সম্পন্ন হলেও এ কাজটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। এমনকি ভূমি অধিগ্রহণ শেষ হওয়ার আগেই প্রস্তাবিত জমিতে ২০১৯ সালে লেক ড্রাইভ সড়ক নির্মাণ করা হয়। এরপর ২০২০ সাল থেকে প্রকল্পের কার্যক্রম মূলত ভূমি অধিগ্রহণেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, যা প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দূরদর্শিতার ঘাটতি তুলে ধরে।
আইএমইডি জানায়, লেকের পূর্ণাঙ্গ উন্নয়ন প্রয়োজন হলেও প্রকল্পের কাজ আংশিকভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য অর্জনে লেক খনন, তীর সংরক্ষণ ও ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ সমন্বিতভাবে সম্পন্ন করা জরুরি। পাশাপাশি ওয়াকওয়ে ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আলোকসজ্জার ব্যবস্থাও করা হয়নি। ফলে সেখানে নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। সার্বিকভাবে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য আংশিকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
অন্যদিকে, প্রকল্প শুরুর আগে সম্ভাব্যতা যাচাই না করা, সময়মতো ভূমি অধিগ্রহণ শেষ করতে না পারা, একাধিকবার প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন, মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নে ধীরগতি, দরপত্র ও চুক্তি প্রক্রিয়ায় বিলম্ব, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগে ব্যর্থতা, নিয়মিত সভা ও সমন্বয়ের অভাব এবং মাঠপর্যায়ে দুর্বল মনিটরিংকে প্রকল্পের প্রধান দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইএমইডি। তবে ইকো-ট্যুরিজম ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে টেকসই নগর মডেল গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে লেকের পরিবেশ উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসনেও প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে আইনি জটিলতা, দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং নিরাপত্তাঝুঁকি প্রকল্পের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রকল্পের সার্বিক পর্যবেক্ষণে আইএমইডি জানায়, লেক খনন, ওয়াকওয়ে ও সড়ক নির্মাণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে প্রকৌশল মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে। প্রায় ৯ কিলোমিটার লেকের মধ্যে ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার অংশের তলদেশ থেকে ক্ষতিকর স্লাজ, পলি ও বর্জ্য অপসারণ করে ঢাকার বাইরে নির্দিষ্ট স্থানে স্থানান্তর করা হয়েছে। এতে লেকের পানি ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি শহরের পরিবেশ উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তবে পুনঃখনন করা অংশের বাইরে লেকের তলদেশে বিপুল পরিমাণ পলি ও বর্জ্য জমে থাকায় দীর্ঘমেয়াদে পানি ধারণক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে লেকের প্রাকৃতিক পুনর্ভরণ প্রক্রিয়াও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এছাড়া লেকের স্যুয়ারেজ লাইন বিচ্ছিন্ন করা ও বিকল্প নিষ্কাশন ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ঢাকা ওয়াসার পূর্বপরিকল্পনা বাস্তবায়িত না হওয়ায় বর্জ্য প্রবাহ নিয়ন্ত্রণেও ঘাটতি রয়েছে। তবে ওয়াসার চলমান পানি শোধনাগার প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এ সমস্যার আংশিক সমাধান হতে পারে।
আইএমইডি সুপারিশ করেছে, প্রকল্পের অবশিষ্ট ভূমি অধিগ্রহণ দ্রুত শেষ করতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, রাজউক ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জোরদার করতে হবে। ক্ষতিপূরণ প্রদানসহ সব জটিলতা নিরসন করে ডিসেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করতে হবে। পাশাপাশি লেকপাড়ের ক্ষতিগ্রস্ত ওয়াকওয়ে জরুরি ভিত্তিতে মেরামত এবং ভবিষ্যতে তা পরিকল্পিতভাবে উভয় পাশে সম্প্রসারণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পানির গুণগত মান রক্ষায় স্যুয়ারেজ ও ড্রেনেজ লাইন পৃথক করা, ট্র্যাশ ট্র্যাপ স্থাপন এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বৃক্ষরোপণে দেশীয় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি স্মার্ট বিন ও পরিবেশবান্ধব গণশৌচাগার স্থাপনেরও সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া লেক এলাকাকে সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক ও হকারমুক্ত করে সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবেশগত স্থায়িত্ব বজায় রাখতে বার্ষিক পরিবেশগত অডিট চালু, পর্যাপ্ত আলোকায়ন, সীমানা বেষ্টনী ও সিসিটিভি স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছে আইএমইডি। একই সঙ্গে অনিষ্পন্ন অডিট আপত্তি দ্রুত নিষ্পত্তি, প্রকল্প পরিচালকের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত এবং ভবিষ্যৎ প্রকল্পে বাধ্যতামূলক ফিজিবিলিটি স্টাডি ও সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে ১৪ দশমিক ০৪ একর ভূমি অধিগ্রহণ ও স্থাপনার ক্ষতিপূরণে ৪৪৭ কোটি টাকা, ২ লাখ ৫৮ হাজার ৭৬৭ দশমিক ৪৩ ঘনমিটার লেক খননে ৩৯ কোটি ৩২ লাখ টাকা, ২ হাজার ৪৩৮ দশমিক ৪১ মিটার তীর সংরক্ষণে ৮ কোটি ২৩ লাখ টাকা এবং ১ লাখ ৬১ হাজার ৩৬২ দশমিক ০৯ ঘনমিটার মাটি ভরাটে ৭ কোটি ৪৬ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া ২ হাজার ৪৩৮ মিটার লেক ড্রাইভ সড়ক নির্মাণে ১৫ কোটি ৫৮ লাখ, ৮ হাজার ৮৫৮ দশমিক ৩৬ মিটার ওয়াকওয়ে নির্মাণে ১ কোটি ৬৭ লাখ, ৩৭৩ দশমিক ৪৮ মিটার কজওয়ে নির্মাণে ৬৩ লাখ, ৪ হাজার গাছ রোপণ ও পরিচর্যায় ১৯ লাখ ৫৪ হাজার, একটি যানবাহন ক্রয়ে ৪৯ লাখ এবং ২ হাজার ৫০০ বৈদ্যুতিক সড়কবাতি স্থাপনে ৪ কোটি ১০ লাখ টাকা ব্যয়ের সংস্থান রাখা হয়েছে।
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল লেক উন্নয়ন এবং লেকসংলগ্ন সড়ক ও ওয়াকওয়ে নির্মাণের মাধ্যমে রাজধানীর পরিবেশগত উন্নয়ন, জলাধার সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় জানায়, গুলশান মডেল টাউন বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে বনানী-বারিধারা এলাকায় প্রায় ১ হাজার একর জমি আবাসিক ব্যবহারের জন্য উন্নয়ন করা হয়। ১৯৯২ সালের মধ্যে ‘১ হাজার একর ভূমি উন্নয়ন’ প্রকল্পের আওতায় গুলশান মডেল টাউন এবং আংশিক বনানী ও বারিধারা আবাসিক এলাকার উন্নয়নকাজ শেষ হলেও প্রায় ২০০ একর এলাকাজুড়ে থাকা দুটি লেকের উন্নয়ন করা হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে ময়লা-আবর্জনা ও জৈব মাটি জমে লেকগুলোর পানির ধারণক্ষমতা কমতে থাকে। এ অবস্থায় লেকের পানি ধারণক্ষমতা পুনরুদ্ধার, জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিবেশ উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধন এবং নগরবাসীর বিনোদন সুবিধা বাড়ানোর লক্ষ্যেই গুলশান-বনানী-বারিধারা লেক উন্নয়ন প্রকল্প নেওয়া হয়।
এমওএস/এমএএইচ/ এমএফএ
What's Your Reaction?



