১৭০ বছরের ইতিহাস ধরে রেখেছে দেশের একমাত্র চা জাদুঘর

চীন দেশের সীমানার বাইরে সর্বপ্রথম চা উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ১৮৩৫ সালে। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ১৮৫৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে সিলেটের মালিনীছড়া চা বাগানের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকে আর কখনো পেছনে তাকাতে হয়নি এই শিল্পের। প্রায় ১৭০ বছর আগে বৃটিশরা কীভাবে এই শিল্পকে গড়ে তুলেছিল এর ঐতিহাসিক বাস্তব চিত্র এখনও সংরক্ষণ আছে চায়ের রাজধানী খ্যাত শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত দেশের একমাত্র চা জাদুঘরে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র এই চা জাদুঘরটি ২০০৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ চা বোর্ডের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। এই জাদুঘরটি শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়কে অবস্থিত টি রিসোর্ট অ্যান্ড মিউজিয়ামের ভেতরে। এখানে বাংলাদেশের চা শিল্পের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সেই সময়ের ব্যবহৃত সরঞ্জাম সংরক্ষিত আছে। জীবনের প্রথম দেখাতে যে কেউ এই জাদুঘর দেখে চমকে উঠবেন। এই জাদুঘরে ব্রিটিশ আমলে কিভাবে চা উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত হতো সেসব প্রাচীন জিনিসপত্রসহ চা বাগান কেন্দ্রিক বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে। সরেজমিনে চা জাদুঘরের ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, টি রিসোর্ট অ্যান্ড মিউজিয়ামের চারটি কক্ষে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে চা শ

১৭০ বছরের ইতিহাস ধরে রেখেছে দেশের একমাত্র চা জাদুঘর

চীন দেশের সীমানার বাইরে সর্বপ্রথম চা উৎপাদনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ১৮৩৫ সালে। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবে ১৮৫৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে সিলেটের মালিনীছড়া চা বাগানের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকে আর কখনো পেছনে তাকাতে হয়নি এই শিল্পের। প্রায় ১৭০ বছর আগে বৃটিশরা কীভাবে এই শিল্পকে গড়ে তুলেছিল এর ঐতিহাসিক বাস্তব চিত্র এখনও সংরক্ষণ আছে চায়ের রাজধানী খ্যাত শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত দেশের একমাত্র চা জাদুঘরে।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বাংলাদেশের প্রথম এবং একমাত্র এই চা জাদুঘরটি ২০০৯ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ চা বোর্ডের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে। এই জাদুঘরটি শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়কে অবস্থিত টি রিসোর্ট অ্যান্ড মিউজিয়ামের ভেতরে। এখানে বাংলাদেশের চা শিল্পের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সেই সময়ের ব্যবহৃত সরঞ্জাম সংরক্ষিত আছে। জীবনের প্রথম দেখাতে যে কেউ এই জাদুঘর দেখে চমকে উঠবেন। এই জাদুঘরে ব্রিটিশ আমলে কিভাবে চা উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত হতো সেসব প্রাচীন জিনিসপত্রসহ চা বাগান কেন্দ্রিক বিভিন্ন নিদর্শন রয়েছে।

সরেজমিনে চা জাদুঘরের ভেতরে ঢুকে দেখা যায়, টি রিসোর্ট অ্যান্ড মিউজিয়ামের চারটি কক্ষে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে চা শিল্পের ঐতিহাসিক এই নিদর্শনগুলো। ছোট ছোট নিদর্শনগুলো চা-গাছের গুড়ি ও কাচের ফ্রেম দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এই জাদুঘরে রয়েছে বৃটিশ আমলে ব্যবহৃত রিং কেদাল, প্লান্টিং হোম যা দিয়ে বাগানে কাজ করা হতো। কয়েন বা মুদ্রা, যা দিয়ে শ্রমিকের বেতন দেওয়া হতো। বেতন বুক, বৃটিশ শাঠল, ঘটি-বাটি। যোগাযোগের জন্য টেলিফোন। গান শোনার জন্য কলের গান, রেডিও। চা বাগানে কাজ করার জন্য কলম দা, কাটা কোদাল। রয়েছে জীবাশ্মা নামে তিনটি কাঠের টুকরো যা পরবর্তীতে পাথরে রূপান্তর হয়েছে।

১৭০ বছরের ইতিহাস ধরে রেখেছে দেশের একমাত্র চা জাদুঘর

চা জাদুঘরে বৃটিশ আমলের আরও যেসব জিনিসপত্র দেখা যায় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে, সিরামকি ঝার, চেয়ার, টেবিল, বৃটিশ আমলের টেলিভিশন, ড্রেসিং টেবিল, জরিপ শিকল। রয়েছে প্রাচীন পি এইচ মিটার যা মাটি পরীক্ষার কাজে ব্যবহার করা হতো।

জাদুঘরে আরও রয়েছে আগুন নেভানোর জন্য ফায়ার বাক্স, টাকা জমা রাখার ক্যাশ বাক্স, জুতার ময়লা পরিষ্কারের জন্য লোহার পাপস, পানির পাম্প, কেরোশিন চালিত দুটি ফ্রিজ, বৈদ্যুতিক পাখা, তীর ধনুক, টিউবওয়েল, টেবিলের ফ্রেম, লাঙল, ঘড়ি, স্ট্যান্ড ও কলম। এছাড়া রয়েছে নিচ থেকে পানি ওপরে ওঠানোর জন্য পুরাতন লিফট পাম্প ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিধ্বস্ত হওয়া একটি যুদ্ধ বিমানের খণ্ডাংশ।

আরও পড়ুন-
লোডশেডিংয়ের বাগড়ায় ব্যাহত চা উৎপাদন
৫৮ চা বাগানের প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা বকেয়া, অনিশ্চয়তায় শ্রমিকরা
মদের নেশায় বেকারত্বে বাঁধা চা শ্রমিকদের ভাগ্য
রমজানে ভিন্ন ছন্দ মালিনীছড়া চা বাগানে

জাদুঘরে সবশেষে দেখা যায় মিনি চা কারখানা। বৃটিশ আমলের তৈরি চা কারখানায় চা প্রক্রিয়াজাত করা হতো। বর্তমান সময়ে বিশাল কারখানা থেকে চা প্রক্রিয়াজাত করা হলেও সেই সময়ে ছোট মেশিনের মাধ্যমে চা প্রক্রিয়াজাত করা হতো। এই মিনি কারখানা দেখলে যে কেউ ধারণা করতে পারবেন কীভাবে বৃটিশরা চায়ের বিস্তার করেছিল এই অঞ্চলে।

১৭০ বছরের ইতিহাস ধরে রেখেছে দেশের একমাত্র চা জাদুঘর

কারখানার ভেতর সেই সময়ের তৈরি একটি প্রচার পোস্টারও দেখা যায়। এই পোস্টেরে লেখা রয়েছে চা পান করলে কী কী উপকার হয়। পোস্টারের মাধ্যমে চা পান করার জন্য সেই সময় সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ চা বোর্ড সূত্রে জানা যায়, সারাদেশের বিভিন্ন চা বাগান থেকে বৃটিশ আমলে ব্যবহৃত এসব জিনিসপত্র সংরক্ষণ করা হয়। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ চা বোর্ড জাদুঘরটি চালু করে। এরপর জাদুঘরে এগুলো একত্রিত করা হয়। পর্যায়ক্রমে জাদুঘরটি আরও বিস্তৃত করা হবে।

স্থানীয়রা জানান, ২০০৮ সালে মৌলভীবাজারকে পর্যটন জেলা ঘোষণার পর ২০০৯ সালে চা জাদুঘর চালু করা হয়। তবে এই জাদুঘরে আরও অনেক কিছু যুক্ত করার প্রয়োজন। বৃটিশ আমলের জিনিসপত্রের পাশাপাশি আধুনিক চা শিল্পের যন্ত্রপাতি যুক্ত করলে পর্যটকরা আরও আকৃষ্ট হবেন চা জাদুঘর দেখার জন্য। এখান থেকে কিছু জিনিস সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে করে পর্যটকরা বাস্তব অনেক চিত্র দেখা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

১৭০ বছরের ইতিহাস ধরে রেখেছে দেশের একমাত্র চা জাদুঘর

চা জাদুঘর দেখতে আসা নাজমুল হক চৌধুরী বলেন, আমি চা শিল্পের ইতিহাস দেখা অবাক হয়েছি। যারা শ্রীমঙ্গল বা মৌলভীবাজারে ঘুরতে আসেন তাদের একবার হলেও এই চা জাদুঘর দেখা প্রয়োজন। আমি এই জাদুঘর না দেখলে কখনই চা শিল্পের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারতাম না। তবে এই জাদুঘরটি আরও বড় করা প্রয়োজন। আরও সুন্দরভাবে পর্যটকদের সামনে উপস্থাপন করা হলে মানুষ জানতে পারবে বৃটিশ আমলে কীভাবে চা উৎপাদন হতো। বিভিন্ন চা বাগানে এখনও বৃটিশ আমলের তৈরি জিনিসপত্র আছে। এগুলোও এনে এখানে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করি।

চা জাদুঘরের দায়িত্বে থাকা সহকারী কিউরেটর মো. ফয়জুর রহমান বলেন, এখানে চা জাদুঘর দেখতে অনেক পর্যটক আসেন। বিশেষ করে ছুটির সময় বেশি আসেন। চা জাদুঘর দেখে অনেকেই বিস্মিত হন। কীভাবে ১৭০ বছর ধরে চা শিল্প টিকে আছে, তা এই জাদুঘর দেখলে সহজেই বুঝতে পারেন।

বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও চা জাদুঘরের ব্যবস্থাপক রায়হান মুজিব হিমেল বলেন, বিভিন্ন চা বাগান থেকে এগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণ হলে জাদুঘরটি বড় করার চিন্তা রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।

চা জাদুঘরে যেভাবে যাবেন

ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে সরাসরি রেলপথে শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশনে নেমে শ্রীমঙ্গল থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ভানুগাছ রোডে অবস্থিত চা জাদুঘর। সিএনজি বা অটোরিকশা নিয়ে সহজেই যাওয়া যায়। শ্রীমঙ্গল থেকে রিকশা ও সিএনজি অটোরিকশার ভাড়া ২০-৫০ টাকা। এছাড়া সারাদেশে থেকে বাসে করে শ্রীমঙ্গল শহর নেমে সহজেই সিএনজি অটোরিকশায় করে যাওয়া যায় চা জাদুঘরে।

এফএ/এএইচ/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow