পবিত্র ঈদুল ফিতরের বাকি আর মাত্র তিন দিন। তবে গাজীপুরের অনেক শিল্পকারখানার শ্রমিক এখনো পাননি তাদের ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন ও ঈদ বোনাস। ফলে ঈদের আনন্দের পাশাপাশি অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগও দেখা দিয়েছে শ্রমিকদের মাঝে।
শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের প্রায় ৫ শতাংশ কারখানার ফেব্রুয়ারি মাসের বেতন এবং প্রায় ৯ শতাংশ কারখানায় ঈদ বোনাস দেওয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, যেসব কারখানায় এখনো বেতন ও বোনাস দেওয়া হয়নি, সেগুলোও ঈদের ছুটির আগেই শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধ করবে। তবুও অনেক শ্রমিকের মধ্যে দুশ্চিন্তা কাজ করছে-কারণ বেতন-বোনাস ছাড়া গ্রামের বাড়িতে ঈদ করতে যাওয়া তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত চাপ ও যানজট এড়াতে গাজীপুরের পোশাক কারখানাগুলোতে এবারও ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়া হচ্ছে। সরকারি সাত দিনের ছুটি মঙ্গলবার থেকে শুরু হলেও অনেক পোশাক কারখানায় ছুটি হচ্ছে ৭ থেকে ১০ দিনের মতো। ফলে সোমবার বিকেল থেকেই অনেক শ্রমিক বাড়ির উদ্দেশে রওনা হতে শুরু করেছেন।
শিল্প পুলিশ জানায়, গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে সোমবার বিকেল থেকে পর্যায়ক্রমে কারখানাগুলো ছুটি ঘোষণা করা শুরু হয়েছে। সোমবার প্রায় ১০ শতাংশ কারখানা ছুটি দিয়েছে। মঙ্গলবার ছুটি দেবে প্রায় ২৫ শতাংশ, ১৮ মার্চ প্রায় ৪০ শতাংশ এবং বাকি কারখানাগুলো ১৯ মার্চ ছুটি ঘোষণা করবে।
সূত্র জানায়, গাজীপুরে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর আওতায় মোট ২ হাজার ৮৩৪টি কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে এবারের ঈদে ছুটি দেওয়া হবে ২ হাজার ৭৫৩টি কারখানায়। এছাড়া আংশিক ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে আরও ৮১টি কারখানায়। ধারাবাহিকভাবে সোমবার ৬২টি, মঙ্গলবার ৪৪৪টি, বুধবার এক হাজার ৪১৪টি এবং বৃহস্পতিবার ৮৩৩টি কারখানায় ছুটি দেওয়া হবে।
শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একযোগে ছুটি না দিয়ে ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়ার ফলে অনেকেই কিছুটা স্বস্তি বোধ করছেন। এতে একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক সড়কে নামবে না এবং যাত্রাপথে ভোগান্তিও কিছুটা কম হবে বলে আশা করছেন তারা।
গাজীপুরের একটি পোশাক কারখানার শ্রমিক মো. সোহেল রানা বলেন, আমাদের কারখানায় এখনো বেতন পাইনি। শুনছি আজ বা কাল দেবে। বেতন-বোনাস না পেলে তো গ্রামের বাড়িতে যাওয়া কঠিন হয়ে যায়। পরিবারের জন্য কিছু না নিয়ে গেলে খুব খারাপ লাগে।
শ্রমিক রুমানা আক্তার বলেন, ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়াটা ভালো হয়েছে। আগে যখন সবাই একদিনে ছুটি পেত, তখন বাস বা ট্রেনে জায়গা পাওয়া খুব কঠিন হয়ে যেত। এখন একটু ভাগ হয়ে গেলে হয়তো কষ্টটা কম হবে।
গাজীপুরের ভোগড়া এলাকার একটি কারখানার শ্রমিক আব্দুল করিম বলেন, আমি স্ত্রী ও সন্তানদের দুই দিন আগে গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছি। এখন শুধু বেতনটা পেলেই আমিও চলে যাব। ঈদের আগে টাকা না পেলে আমাদের মতো শ্রমিকদের ঈদ আনন্দ মাটি হয়ে যায়।
শ্রমিকদের কেউ কেউ আবার জানান, অনেকেই আগেভাগে পরিবারের সদস্যদের গ্রামে পাঠিয়ে দিচ্ছেন যাতে শেষ মুহূর্তের ভিড় এড়ানো যায়। সোমবার দুপুর পর্যন্ত গাজীপুরের সড়ক ও মহাসড়কে যান চলাচল তুলনামূলক স্বাভাবিক ছিল।
ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (ট্রাফিক) এস এম আশরাফুল আলম জানান, মহানগর এলাকায় যানজট নিরসনে পেট্রোল টিম ও মোবাইল টিম কাজ করবে। সাদা পোশাকসহ প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া মহাসড়কে বিকল যানবাহন দ্রুত সরিয়ে নিতে নয়টি রেকার প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গাজীপুরের চিরচেনা যানজটের স্থান চান্দনা চৌরাস্তার ঢাকামুখী উড়ালসড়ক চালু হওয়ায় এবার ওই এলাকায় যানজট অনেকটাই কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গাজীপুরের পুলিশ সুপার মো. শরিফ উদ্দিন জানান, ঢাকা–টাঙ্গাইল ও ঢাকা–ময়মনসিংহ মহাসড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে যানজট নিয়ন্ত্রণে আট শতাধিক পুলিশ সদস্য ট্রাফিক ডিউটিতে থাকবেন। বিশেষ করে কালীগঞ্জের বিশ্বরোড এলাকায় অতিরিক্ত নজরদারি রাখা হবে।
গাজীপুর শিল্পাঞ্চল পুলিশের পুলিশ সুপার মো. আমজাদ হোসেন বলেন, পোশাক শ্রমিকরা যেন ভোগান্তি ছাড়াই গ্রামের বাড়িতে যেতে পারেন এবং মহাসড়কে অতিরিক্ত চাপ তৈরি না হয়। সেই বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই কারখানাগুলোকে ধাপে ধাপে ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে কয়েক দিনে ভাগ হয়ে শ্রমিকরা বাড়ি ফিরতে পারবেন।
তিনি আরও বলেন, গাজীপুরের অধিকাংশ পোশাক তৈরি কারখানা শ্রমিকদের বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধ করেছে। যারা বাকি আছে আগামী দুইদিনের মধ্যে পরিশোধ করবে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে।