৬ কোটি টাকার করোনা ইউনিট এখন পরিত্যক্ত, নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতি

করোনাভাইরাস মহামারির ভয়াবহ সময়ে রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজশাহীতে নির্মাণ করা হয়েছিল একটি বিশেষায়িত করোনা ইউনিট। কিন্তু সংক্রমণ কমে যাওয়ায় ইউনিটটি আর কাজে লাগানো হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ অবস্থায় থেকে নষ্ট হচ্ছে সেখানে স্থাপিত মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবে এ প্রকল্পে ব্যয় হওয়া বিপুল সরকারি অর্থ কার্যত অপচয়ের মুখে পড়েছে। ‘এটি একটি অপচয়। আপদকালীন সময়ে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ইউনিটটি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়েও আমরা এটি ব্যবহার করতে পারিনি। এখন এটি অরক্ষিত ও সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এসব যন্ত্রপাতি অন্য খাতে ব্যবহার করা যায়’ জানা গেছে, ২০২১ সালে করোনার ভয়াবহ সংক্রমণের সময় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে অক্সিজেন সংকট ও বেড স্বল্পতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এমন অবস্থায় রাজশাহী সদর হাসপাতালে একটি বিশেষায়িত করোনা ইউনিট চালুর সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য বিভা

৬ কোটি টাকার করোনা ইউনিট এখন পরিত্যক্ত, নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতি

করোনাভাইরাস মহামারির ভয়াবহ সময়ে রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যয়ে রাজশাহীতে নির্মাণ করা হয়েছিল একটি বিশেষায়িত করোনা ইউনিট। কিন্তু সংক্রমণ কমে যাওয়ায় ইউনিটটি আর কাজে লাগানো হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ অবস্থায় থেকে নষ্ট হচ্ছে সেখানে স্থাপিত মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যৎ ব্যবহার নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাবে এ প্রকল্পে ব্যয় হওয়া বিপুল সরকারি অর্থ কার্যত অপচয়ের মুখে পড়েছে।

‘এটি একটি অপচয়। আপদকালীন সময়ে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ইউনিটটি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়েও আমরা এটি ব্যবহার করতে পারিনি। এখন এটি অরক্ষিত ও সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এসব যন্ত্রপাতি অন্য খাতে ব্যবহার করা যায়’

জানা গেছে, ২০২১ সালে করোনার ভয়াবহ সংক্রমণের সময় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে অক্সিজেন সংকট ও বেড স্বল্পতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এমন অবস্থায় রাজশাহী সদর হাসপাতালে একটি বিশেষায়িত করোনা ইউনিট চালুর সিদ্ধান্ত নেয় স্বাস্থ্য বিভাগ। গণপূর্ত বিভাগের মাধ্যমে ৫ কোটি ৮৯ লাখ ৯ হাজার ৬৩ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় এই ইউনিট। সেখানে স্থাপন করা হয় সেন্ট্রাল অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা ও আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। পাশাপাশি ভবনটিরও সংস্কার করা হয়। তবে ইউনিটটি প্রস্তুত হওয়ার আগেই করোনা সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে এটি আর চালু করা হয়নি।

৬ কোটি টাকার করোনা ইউনিট এখন পরিত্যক্ত, নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতি

সেই সময় থেকেই পুরো ইউনিটটি তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। দীর্ঘদিন ব্যবহারের না হওয়ায় ইউনিটটির চিকিৎসা সরঞ্জামে ধুলা-ময়লা জমে এখন নষ্ট হওয়ার উপক্রম।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বাস্থ্যকর্মী এম এ জাহিদ বলেন, করোনার পর থেকে এই ইউনিটটি তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘ সময় ব্যবহার না করায় কক্ষের ভেতরে থাকা সরঞ্জামাদি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পথে। করোনার সময়ে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যায়ে এই ইউনিটটি তৈরি করা হয়। কিন্তু করোনার পর থেকে অযত্নে-অবহেলায় ভবনসহ যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। মেডিকেল কর্তৃপক্ষ থেকে পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলে এসব দামি যন্ত্রপাতি এভাবে নষ্ট হতো না।

আরও পড়ুন:
এক দশকেও শেষ হয়নি নির্মাণকাজ, চিকিৎসা সেবা সংকটে চার জেলা
হাসপাতালে স্যালাইন-ভ্যাকসিন সংকটে নাকাল রোগীরা
সিজার ছাড়া চিকিৎসাসেবা নেই মৌলভীবাজারে
‘উবারের মতো’ জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স পুল গঠনের চিন্তা সরকারের

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সামছুল আলম বলেন, এই যন্ত্রপাতি যেহেতু এখন সেখানে কোনো কাজে আসছে না, তাই এগুলো অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যায় কি না, তা বিবেচনা করতে হবে। টাকার অপচয় করা যাবে না। আমাদের দেশে কখন কোন রোগের প্রাদুর্ভাব হবে, তা বলা কঠিন। এজন্য এমন ইউনিট গড়ে তোলা উচিত, যা যেকোনো প্রাদুর্ভাবে কাজে লাগবে এবং অন্যান্য রোগের চিকিৎসাতেও ব্যবহার করা যাবে।

৬ কোটি টাকার করোনা ইউনিট এখন পরিত্যক্ত, নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতি
রাজশাহী মেডিকেলের ডেন্টাল ইউনিট/ ছবি: জাগো নিউজ

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি স্বাস্থ্য খাতের একটি বড় ধরনের অপচয়ের উদাহরণ। প্রকল্প গ্রহণের আগে বাস্তব চাহিদা ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের বিষয়টি যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন ছিল।

‘করোনার পর থেকে এই ইউনিটটি তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। দীর্ঘ সময় ব্যবহার না করায় কক্ষের ভেতরে থাকা সরঞ্জামাদি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পথে। করোনার সময়ে প্রায় ৬ কোটি টাকা ব্যায়ে এই ইউনিটটি তৈরি করা হয়। কিন্তু করোনার পর থেকে অযত্নে-অবহেলায় ভবনসহ যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। মেডিকেল কর্তৃপক্ষ থেকে পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নেওয়া হলে এসব দামি যন্ত্রপাতি এভাবে নষ্ট হতো না’

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, এটি একটি অপচয়। আপদকালীন সময়ে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য ইউনিটটি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সেই সময়েও আমরা এটি ব্যবহার করতে পারিনি। এখন এটি অরক্ষিত ও সম্পূর্ণ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এসব যন্ত্রপাতি অন্য খাতে ব্যবহার করা যায়।

বর্তমানে বিশেষায়িত এই ইউনিটটি রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল ইউনিটের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। এখানে থাকা সুবিধাগুলো ব্যবহার করে সংকটাপন্ন বিপুল সংখ্যক রোগীকে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। অথচ এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের তেমন কোনো তৎপরতা নেই।

রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এস. আই. এম. রাজিউল করিম জানান, বিশেষায়িত এই ইউনিটটি সিভিল সার্জন অফিসের তত্ত্বাবধানেই থাকার কথা। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে সেখানে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সে সময় ডেন্টাল ইউনিটের শিক্ষার্থীরা এটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। বর্তমানে তারাই ইউনিটটি পরিচালনা করছে।

আরও পড়ুন:
চাচার কোলে শিশুর মরদেহ, মৃত্যুসনদ পেতে দৌড়ঝাঁপ বাবার
সিলেটের স্বাস্থ্যখাতে বাড়ছে ভবন, কমছে আস্থা
আবেদন করলেই পরীক্ষা স্থগিত: ভেঙে পড়ছে শেকৃবির একাডেমিক শৃঙ্খলা
ভালো পদ পেতে ক্ষমতাবানদের কাছে কর্মকর্তাদের দৌড়ঝাঁপ

‘বিশেষায়িত এই ইউনিটটি সিভিল সার্জন অফিসের তত্ত্বাবধানেই থাকার কথা। তবে ২০২৪ সালের আগস্টে সেখানে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। সে সময় ডেন্টাল ইউনিটের শিক্ষার্থীরা এটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। বর্তমানে তারাই ইউনিটটি পরিচালনা করছে’

তিনি আরও বলেন, ভেতরের যন্ত্রপাতির অবস্থা দেখতে আমরা সেখানে যেতে চাইলেও সহযোগিতা পাইনি। যেহেতু ইউনিটটি এখন ব্যবহার হচ্ছে না, তাই এটি কীভাবে কাজে লাগানো যায় সে বিষয়ে সিদ্ধান্তের জন্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। সিদ্ধান্ত এলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

৬ কোটি টাকার করোনা ইউনিট এখন পরিত্যক্ত, নষ্ট হচ্ছে যন্ত্রপাতি

রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ডেন্টাল ইউনিট প্রধান ডা. মো. আবুল হোসেন বলেন, করোনা মহামারির সময় রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই বিশেষায়িত ইউনিটটি নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে সংক্রমণ কমে যাওয়ার পর ইউনিটটি আর আগের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে এটি ডেন্টাল ইউনিটের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। ভবনের অবকাঠামো ও স্থাপিত যন্ত্রপাতি সংরক্ষণের চেষ্টা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভবিষ্যতে যে সিদ্ধান্ত নেবে, সে অনুযায়ী ইউনিটটি জনস্বার্থে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এনএইচআর/জেআইএম

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow