অনলাইন ক্লাসের আড়ালে প্রযুক্তির ফাঁদে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা?
করোনা মহামারির সেই দীর্ঘ সময়—যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরজা বন্ধ, শ্রেণিকক্ষ নিঃশব্দ, আর শিক্ষার্থীরা বন্দি ছিল ঘরের ভেতর—সেই অভিজ্ঞতা এখনও খুব বেশি পুরোনো হয়ে যায়নি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, জ্বালানি সংকট মোকাবিলার যুক্তিতে আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস চালুর পরিকল্পনা সামনে আসছে। প্রশ্নটা তাই শুধু নীতিনির্ধারণের নয়, বরং বাস্তবতার—আমরা কি আবারও একই ভুলের পথে হাঁটছি? করোনার অভিজ্ঞতা কি আমরা ভুলে গেছি? করোনাকালে অনলাইন ক্লাস ছিল এক ধরনের বাধ্যতামূলক বাস্তবতা। তখন স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানোই ছিল প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু সেই সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার অভিজ্ঞতা কি ইতিবাচক ছিল? বাস্তবতা বলছে— না। শুরুর দিকে কিছুটা আগ্রহ থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন ক্লাসের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমতে থাকে। শেখার ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে, মনোযোগ কমে যায়, আর শিক্ষার মান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। শ্রেণিকক্ষের যে জীবন্ত যোগাযোগ—শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সরাসরি সম্পর্ক—তা ভার্চুয়াল পর্দায় আর ফিরে পাওয়া যায়নি। অনলাইন ক্লাস, নাকি অনলাইন বিভ্রান্তি? অনলাইন ক্লাসের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা ছিল—স্মার্টফোন নির্ভরতা। কিন্তু সেই স্মার্টফোন কতটা পড়
করোনা মহামারির সেই দীর্ঘ সময়—যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দরজা বন্ধ, শ্রেণিকক্ষ নিঃশব্দ, আর শিক্ষার্থীরা বন্দি ছিল ঘরের ভেতর—সেই অভিজ্ঞতা এখনও খুব বেশি পুরোনো হয়ে যায়নি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, জ্বালানি সংকট মোকাবিলার যুক্তিতে আবারও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনলাইন ক্লাস চালুর পরিকল্পনা সামনে আসছে। প্রশ্নটা তাই শুধু নীতিনির্ধারণের নয়, বরং বাস্তবতার—আমরা কি আবারও একই ভুলের পথে হাঁটছি?
করোনার অভিজ্ঞতা কি আমরা ভুলে গেছি? করোনাকালে অনলাইন ক্লাস ছিল এক ধরনের বাধ্যতামূলক বাস্তবতা। তখন স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়ানোই ছিল প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু সেই সময়ের শিক্ষাব্যবস্থার অভিজ্ঞতা কি ইতিবাচক ছিল? বাস্তবতা বলছে— না। শুরুর দিকে কিছুটা আগ্রহ থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন ক্লাসের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমতে থাকে। শেখার ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ে, মনোযোগ কমে যায়, আর শিক্ষার মান প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। শ্রেণিকক্ষের যে জীবন্ত যোগাযোগ—শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সরাসরি সম্পর্ক—তা ভার্চুয়াল পর্দায় আর ফিরে পাওয়া যায়নি।
অনলাইন ক্লাস, নাকি অনলাইন বিভ্রান্তি? অনলাইন ক্লাসের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা ছিল—স্মার্টফোন নির্ভরতা। কিন্তু সেই স্মার্টফোন কতটা পড়াশোনার জন্য ব্যবহার হয়েছে? প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা গেছে, অনলাইন ক্লাসের আড়ালে শিক্ষার্থীরা ডুবে গেছে ফেসবুক, ইউটিউব, গেমিংসহ নানা বিভ্রান্তিতে। অ্যাসাইনমেন্ট হয়েছে গুগল নির্ভর, শেখা হয়েছে কপি-পেস্ট নির্ভর। ফলে শিক্ষা হয়েছে যান্ত্রিক, আর চিন্তাশক্তি হয়েছে সীমাবদ্ধ। অনলাইন ক্লাস তখন আর শিক্ষার মাধ্যম ছিল না—বরং অনেক ক্ষেত্রে হয়ে উঠেছিল সময় কাটানোর একটি অজুহাত।
কোমলমতি শিক্ষার্থীরা কি প্রযুক্তির ফাঁদে আটকা পড়ছে? সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকটি এখানেই। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীরা এমন এক বয়সে থাকে, যেখানে তাদের মানসিক, সামাজিক ও শারীরিক বিকাশ সমান গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দীর্ঘদিন ঘরবন্দি জীবন এবং অনলাইন নির্ভরতা তাদের সেই স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করেছে। খেলাধুলা কমেছে, সামাজিক মেলামেশা কমেছে, বেড়েছে একাকিত্ব এবং প্রযুক্তিনির্ভরতা। অভিভাবকেরা অনেক ক্ষেত্রেই বাধ্য হয়ে সন্তানের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিয়েছেন, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেননি। ফলাফল— আসক্তি, অমনোযোগ, মানসিক অস্থিরতা। এটি শুধু শিক্ষার ক্ষতি নয়—এটি একটি প্রজন্মের সুস্থ বিকাশের জন্য হুমকি।
আবার কি সেই একই ঝুঁকির দিকে এগোচ্ছি? বর্তমানে জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্যে অনলাইন ও অফলাইন মিলিয়ে ‘হাইব্রিড’ শিক্ষাপদ্ধতির কথা বলা হচ্ছে। জোড়-বিজোড় দিনে ক্লাস নেওয়ার মতো পরিকল্পনাও আলোচনায় রয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো— এই পরিকল্পনায় কি আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়েছে? যদি একইভাবে অনলাইন ক্লাস চালু হয়, তবে কি আমরা আগের মতোই একই সমস্যার পুনরাবৃত্তি দেখব না? বাস্তবতা হলো, প্রযুক্তিগত সুযোগ-সুবিধা, পারিবারিক তদারকি এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতি—সবকিছুই সমান নয়। ফলে একই পদ্ধতি সবার জন্য সমান কার্যকর হবে—এমনটা ভাবা বাস্তবসম্মত নয়।
সমাধান কোথায়- প্রযুক্তি, নাকি বাস্তবতায়? প্রযুক্তি নিজে কোনো সমস্যা নয়—সমস্যা তার অপব্যবহার। অনলাইন ক্লাস কার্যকর করতে হলে প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা, নিয়মিত তদারকি এবং সচেতন অংশগ্রহণ। তবে বাস্তবতার জায়গা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট— কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনলাইন ক্লাস আংশিকভাবে কার্যকর হতে পারে। কারণ এই স্তরের শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে আত্মনিয়ন্ত্রিত এবং প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত। কিন্তু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে অনলাইন ক্লাস কখনোই কার্যকর বিকল্প নয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে—এই স্তরে অনলাইন শিক্ষার কার্যকারিতা অফলাইনের ২০ শতাংশের বেশি নয়। সুতরাং, যেকোনো পরিস্থিতিতেই এই স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য অফলাইন ক্লাস চালু রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। কারণ এই বয়সে শিক্ষা মানে শুধু পাঠ্যবই নয়—এটি শৃঙ্খলা, সামাজিকতা এবং মানসিক বিকাশের একটি প্রক্রিয়া।
শিক্ষা কি শুধুই বিকল্পে টিকে থাকবে? শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। এটি কেবল পাঠদান নয়, বরং একটি প্রজন্ম গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। যদি সেই প্রক্রিয়ায় বারবার আপস করা হয়, যদি বাস্তব অভিজ্ঞতা উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হবে। করোনাকাল আমাদের শিখিয়েছে— অনলাইন ক্লাস একটি জরুরি বিকল্প হতে পারে, কিন্তু স্থায়ী সমাধান নয়। তাই নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রয়োজন গভীরভাবে ভাবা— আমরা কি সত্যিই শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে চাই, নাকি শুধু পরিস্থিতি সামাল দিতে চাই? কারণ একটি ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য শুধু আজ নয়— পুরো একটি প্রজন্মকে দিতে হবে।
লেখক: রাশেদুল ইসলাম রাশেদ
সাংবাদিক ও শিক্ষক
(খোলা কলাম বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। বিডি২৪লাইভ ডট কম-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)
What's Your Reaction?