অনুগল্প: এ ঋণ কী করে শোধ করবো

আশরাফুল ইসলাম আকাশ ছোটবেলা থেকেই আমি একটু রোগাটে ছিলাম। অপুষ্টির কারণে নানান অসুখে ভুগেছি। ক’দিন পরপরই হাসপাতালের আউটডোরে ছুটতে হয়েছে চিকিৎসার জন্য। একসময় অবস্থা এতটাই খারাপ হয়েছিল যে, মনে হয়েছিল হয়তো আর বাঁচবো না। বগুড়ায় সবধরনের চিকিৎসা নেওয়ার পরও রোগ ধরা পড়ছিল না। শেষমেশ আমাকে ঢাকায় ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে নিয়ে আসা হলো। ইইজি পরীক্ষার পর শুরু হলো চিকিৎসা। কিন্তু এই দীর্ঘ পথচলার সবচেয়ে বড় ধকলটা গেছে একজন মানুষের ওপর দিয়েই। তিনি আমার মা। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার সময়ের কথা। অ্যাকাউন্টিং পরীক্ষার আগের রাত। মৌসুম পরিবর্তনের সেই সময়ে হঠাৎ তীব্র জ্বরে কাঁপতে শুরু করলাম। সারারাত মা এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করেননি। কখনো মাথায় পানি দিচ্ছেন, কখনো কপালে ভেজা কাপড় রেখে জ্বর কমানোর চেষ্টা করছেন, আবার কখনো ভেজা তোয়ালে দিয়ে পুরো শরীর মুছে দিচ্ছেন। সন্তানের কষ্ট যেন নিজের শরীরে অনুভব করছিলেন তিনি। এভাবেই রাত পেরিয়ে ভোর হলো। চারপাশে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। মা জায়নামাজে বসে দু’হাত তুলে কান্নাভেজা কণ্ঠে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। তারপর আমার শরীরে ফুঁ দিলেন। কিছুক্ষণ পরই শরীর ঘামতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে

অনুগল্প: এ ঋণ কী করে শোধ করবো

আশরাফুল ইসলাম আকাশ

ছোটবেলা থেকেই আমি একটু রোগাটে ছিলাম। অপুষ্টির কারণে নানান অসুখে ভুগেছি। ক’দিন পরপরই হাসপাতালের আউটডোরে ছুটতে হয়েছে চিকিৎসার জন্য। একসময় অবস্থা এতটাই খারাপ হয়েছিল যে, মনে হয়েছিল হয়তো আর বাঁচবো না। বগুড়ায় সবধরনের চিকিৎসা নেওয়ার পরও রোগ ধরা পড়ছিল না। শেষমেশ আমাকে ঢাকায় ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে নিয়ে আসা হলো। ইইজি পরীক্ষার পর শুরু হলো চিকিৎসা। কিন্তু এই দীর্ঘ পথচলার সবচেয়ে বড় ধকলটা গেছে একজন মানুষের ওপর দিয়েই। তিনি আমার মা।

ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার সময়ের কথা। অ্যাকাউন্টিং পরীক্ষার আগের রাত। মৌসুম পরিবর্তনের সেই সময়ে হঠাৎ তীব্র জ্বরে কাঁপতে শুরু করলাম। সারারাত মা এক মুহূর্তের জন্যও চোখ বন্ধ করেননি। কখনো মাথায় পানি দিচ্ছেন, কখনো কপালে ভেজা কাপড় রেখে জ্বর কমানোর চেষ্টা করছেন, আবার কখনো ভেজা তোয়ালে দিয়ে পুরো শরীর মুছে দিচ্ছেন। সন্তানের কষ্ট যেন নিজের শরীরে অনুভব করছিলেন তিনি।

এভাবেই রাত পেরিয়ে ভোর হলো। চারপাশে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। মা জায়নামাজে বসে দু’হাত তুলে কান্নাভেজা কণ্ঠে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। তারপর আমার শরীরে ফুঁ দিলেন। কিছুক্ষণ পরই শরীর ঘামতে শুরু করলো। ধীরে ধীরে জ্বর নেমে গেল। আজও সেই মুহূর্ত মনে পড়লে বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শান্তি আর ভালোবাসা কাজ করে।

প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষা থেকে শুরু করে জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি—প্রতিটি পরীক্ষার সময় মায়ের এই নির্ঘুম দুশ্চিন্তা ছিল নিত্যসঙ্গী। যতদিন মায়ের আঁচলের নিচে ছিলাম, ততদিন বুঝিনি তার মমতার গভীরতা কতটা। ঢাকায় পড়তে আসার পর বুঝেছি, মা আসলে কী এক আশ্রয়ের নাম। দূরে থেকেও প্রতিদিন তার একটাই চিন্তা ছিল, ঠিকমতো খেয়েছি কি না, পড়াশোনা করছি কি না, অসুস্থ হচ্ছি কি না। মায়ের ভালোবাসা কখনো দূরত্ব মানে না।

সন্তানের সামান্য কষ্টেও যে মানুষটা ছুটে আসেন, নিজের ঘুম-শান্তি ভুলে সেবায় ডুবে যান, তিনি মা। এমন ঘটনা আমার জীবনে একবার নয়, শত শত বার ঘটেছে। মা শুধু জন্ম দেন না, তিনি মানুষ গড়েন। তার শেখানো আদব, তার দেখানো পথ, তার ত্যাগ আর মমতাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

পৃথিবীর সব পাঠশালা হয়তো জীবনের পাঠ শেখায়, কিন্তু একজন মা হলেন প্রথম এবং সবচেয়ে সত্যিকারের জীবন্ত পাঠশালা। যে পাঠশালার কোনো ছুটি নেই, কোনো বেতন নেই, কোনো স্বার্থ নেই। আছে শুধু নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, অফুরন্ত মমতা আর সন্তানের জন্য নিঃশব্দ ত্যাগ।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow