অস্ট্রেলিয়ার বহুসাংস্কৃতিক মুসলিম সমাজের সুপরিচিত ইসলামী দাঈ, তাবলিগ জামাতের প্রবীণ মুরুব্বি এবিএম শাহাবুদ্দীন আর নেই।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, গত ২২ জুলাই সিডনির লাকেম্বায় নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। সম্প্রতি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর বাসায় ফিরে আসেন। সেখানেই তার জীবনাবসান ঘটে।
১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেন এবিএম শাহাবুদ্দীন। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) থেকে প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পেশাগত জীবনে সফলতা অর্জনের পাশাপাশি ইসলামের দাওয়াহ, মানবকল্যাণ এবং নৈতিক সমাজ গঠনের কাজে নিজেকে নিবেদিত করেন।
১৯৯১ সালের দিকে স্থায়ীভাবে অস্ট্রেলিয়ায় বসবাস শুরু করার পর তিনি দেশটির মুসলিম সমাজে একজন পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। সিডনির লাকেম্বাকে কেন্দ্র করে তার দাওয়াহ কার্যক্রম ধীরে ধীরে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বিস্তৃত হয়। বাংলাদেশি কমিউনিটির পাশাপাশি আরব, পাকিস্তানি, ভারতীয়, আফ্রিকান, তুর্কি ও সোমালিসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মুসলমানদের কাছেও তিনি ছিলেন সমানভাবে সম্মানিত।
ধর্মীয় শিক্ষা ও দাওয়াহর পাশাপাশি পারিবারিক মূল্যবোধ, তরুণ প্রজন্মের নৈতিক বিকাশ, সামাজিক সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার বিষয়েও তিনি নিয়মিত দিকনির্দেশনা দিতেন। তার বিনয়, আন্তরিকতা ও সহজ-সরল জীবনযাপন তাকে সবার কাছে আপন করে তুলেছিল। অনেকের কাছে তিনি ছিলেন একজন অভিভাবক, পরামর্শদাতা এবং আস্থার প্রতীক।
গত ২৩ জুলাই সিডনির অবার্নে অবস্থিত ওমর মসজিদে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় সিডনি ছাড়াও ক্যানবেরা, মেলবোর্ন, ব্রিসবেন, অ্যাডিলেড ও ডারউইন থেকে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি, আলেম, কমিউনিটি নেতা এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। পরে তাঁকে রুকউড জেনারেল কবরস্থানের মুসলিম সেকশনে দাফন করা হয়।
জানাজায় অংশ নেওয়া অনেকেই বলেন, মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও নিঃস্বার্থ সেবার স্বীকৃতিই ছিল এই বিপুল উপস্থিতি। ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য, জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি আল্লাহর স্মরণে ছিলেন এবং ইসলামের দাওয়াহর কাজ নিয়েই ভাবতেন।
এবিএম শাহাবুদ্দীনের মৃত্যুতে অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন ইসলামী ও সামাজিক সংগঠন, আলেম, কমিউনিটি নেতা এবং সর্বস্তরের মানুষ গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও অসংখ্য মানুষ তার স্মৃতিচারণ করে লিখেছেন, তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ, যিনি জ্ঞান, প্রজ্ঞা, বিনয় ও মানবিক গুণাবলির মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী স্থান করে নিয়েছেন।
কমিউনিটি নেতাদের মতে, অস্ট্রেলিয়ায় ইসলামী দাওয়াহ, বহুসাংস্কৃতিক সম্প্রীতি এবং মুসলিম সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় এবিএম শাহাবুদ্দীনের অবদান দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। তার জীবন ও কর্ম শুধু অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম সমাজেই নয়, প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির ইতিহাসেও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।