অস্থির বিশ্বে মহানবির সম্প্রীতির শিক্ষা
ইসলাম একে অপরের প্রতি পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতির শিক্ষা দেয়। বিশ্বজুড়ে মানুষ আজ অশান্তি আর অস্থিরতার মধ্যে সময় অতিবাহিত করছে। না ধর্মীয়ভাবে কেউ শান্তিতে আছে, না সামাজিকভাবে। এক ধর্মের অনুসারী অন্য ধর্মের মানুষের ওপর চড়াও হচ্ছে। বিশ্বজুড়ে মানুষ উপর্যুপরি দুঃখ-কষ্ট, সীমাহীন আজাব ও বিপদাপদের সম্মুখীন হচ্ছে এবং অনবরত সেসবের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। এসব পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু চেষ্টা যতই করা হচ্ছে, সমস্যা ততই বাড়ছে। প্রত্যেক নতুন বিপদ ও সমস্যা আগের তুলনায় অনেক বেশি কষ্টদায়ক ও উৎকণ্ঠাবর্ধক হয়ে উঠছে। এক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে সহস্র নতুন অস্থিরতার সৃষ্টি হচ্ছে। আর এমনটি নাকি শেষ জামানায় হওয়ারই কথা। কেননা, এসব অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠার কারণ পার্থিব নয়; বরং এর পেছনে কার্যকর রয়েছে ঐশী নিয়তি। এ বছর গ্রীষ্মে পরপর রেকর্ড তাপপ্রবাহ এবং কম বৃষ্টিপাতের পর ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ দাবানল দেখা দিয়েছে। ফ্রান্স ও স্পেনের বিভিন্ন গ্রাম ধ্বংস হয়েছে এবং কয়েক লাখ মানুষকে বাড়িঘর ও পর্যটনকেন্দ্র ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়েছে। ঐশী আজাব ও শাস্তি যেন বৃষ্টির ফোঁটার মতো
ইসলাম একে অপরের প্রতি পারস্পরিক ভালোবাসা ও সম্প্রীতির শিক্ষা দেয়। বিশ্বজুড়ে মানুষ আজ অশান্তি আর অস্থিরতার মধ্যে সময় অতিবাহিত করছে। না ধর্মীয়ভাবে কেউ শান্তিতে আছে, না সামাজিকভাবে। এক ধর্মের অনুসারী অন্য ধর্মের মানুষের ওপর চড়াও হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে মানুষ উপর্যুপরি দুঃখ-কষ্ট, সীমাহীন আজাব ও বিপদাপদের সম্মুখীন হচ্ছে এবং অনবরত সেসবের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। এসব পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু চেষ্টা যতই করা হচ্ছে, সমস্যা ততই বাড়ছে।
প্রত্যেক নতুন বিপদ ও সমস্যা আগের তুলনায় অনেক বেশি কষ্টদায়ক ও উৎকণ্ঠাবর্ধক হয়ে উঠছে। এক সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে সহস্র নতুন অস্থিরতার সৃষ্টি হচ্ছে। আর এমনটি নাকি শেষ জামানায় হওয়ারই কথা। কেননা, এসব অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠার কারণ পার্থিব নয়; বরং এর পেছনে কার্যকর রয়েছে ঐশী নিয়তি।
এ বছর গ্রীষ্মে পরপর রেকর্ড তাপপ্রবাহ এবং কম বৃষ্টিপাতের পর ইউরোপজুড়ে ভয়াবহ দাবানল দেখা দিয়েছে। ফ্রান্স ও স্পেনের বিভিন্ন গ্রাম ধ্বংস হয়েছে এবং কয়েক লাখ মানুষকে বাড়িঘর ও পর্যটনকেন্দ্র ছেড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হয়েছে।
ঐশী আজাব ও শাস্তি যেন বৃষ্টির ফোঁটার মতো বর্ষিত হচ্ছে। আর ব্যাধি যখন ঐশী হয়, তখন চিকিৎসকও ঐশী হওয়া প্রয়োজন—যিনি এসব দুঃখ-কষ্টের চিকিৎসা করতে পারেন। আজ উৎকণ্ঠিত বিশ্ববাসী এবং প্রাণ ওষ্ঠাগত আর্তমানবতার জন্য প্রয়োজন পবিত্র কোরআনের শিক্ষার ওপর আমল করা।
ব্যক্তিগত ও জাতীয় পর্যায়ে প্রত্যেক দেশের সরকার শান্তির সন্ধানে রয়েছে এবং তা অর্জনের জন্য সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নামকাওয়াস্তে যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা হয়, তার ভিত্তি সুবিবেচনা নয়। আন্তরিকতার সঙ্গে কৃত সুবিবেচনাই মূলত শান্তির ভিত্তি হতে পারে। পারস্পরিক ভালোবাসা ও প্রেম-প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সুবিবেচনার পরিচয় দেওয়া আবশ্যক। আর সুবিবেচনা হলো—মানুষের কথা ও কাজের মধ্যে যেন কোনো ভিন্নতা না থাকে এবং মানুষ যেন কখনো মিথ্যার আশ্রয় না নেয় বা অসত্য কথা না বলে। কিন্তু সাধারণভাবে আমরা সত্যের এমন উন্নত মান দেশীয় ও আন্তর্জাতিক—কোনো পরিমণ্ডলেই দেখতে পাই না।
আজ যদি বিশ্বের অবস্থা পর্যালোচনা করা হয়, তাহলে দেখা যাবে, একটি বিশাল জনগোষ্ঠী দারিদ্র্য ও অন্যায়-অবিচারের শিকার। পরিণতিতে এসব অবিচারই ঘৃণা ও ক্ষোভে রূপান্তরিত হয়।
মহানবি (সা.)-এর শিক্ষাগুলো আজ আমাদের জীবনে বাস্তবায়নের সময় এসেছে। মহানবি হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) সমাজের সর্বস্তরে এবং সব জাতির মধ্যে শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন। তিনি খ্রিষ্টানদের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকারও নিশ্চিত করেছিলেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত যেন তা বলবৎ থাকে, সেই ব্যবস্থাও করেছিলেন।
প্রশ্ন হলো, বিশ্বের শক্তিশালী জাতিগুলোর পক্ষে সীমাহীন দারিদ্র্য ও অন্যায়-অবিচারের কোনো কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা সম্ভব হচ্ছে না কেন? জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের সভা ডেকে অন্যায় ও অন্যায্য কার্যকলাপের বিরুদ্ধে শুধু দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা কোনো সমাধান নয়। ইসলামের মহান প্রতিষ্ঠাতা মহানবি (সা.) এ ক্ষেত্রে একটি নীতিগত নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তোমাদের হৃদয়গুলোকে ঘৃণা থেকে পুরোপুরি মুক্ত করো।’ তাই আমরা যদি পরস্পরকে ভালোবাসতে শিখি, তাহলে সারা বিশ্ব শান্তিময় হয়ে উঠতে পারে।
সমাজ ও রাষ্ট্রকে অশান্তি, জুলুম ও বিশৃঙ্খলামুক্ত করার নির্দেশ ইসলামে রয়েছে বলেই ইসলাম শান্তির ধর্ম।
মানুষ যদি শান্তি পেতে চায়, তাহলে তাকে নিজের ইচ্ছামতো জীবনযাপন না করে আল্লাহর দেওয়া বিধান মেনে চলতে হবে। তাই আল্লাহ তাঁর প্রেরিত বিধানের নাম রেখেছেন ইসলাম, যার অর্থই শান্তি। কম্পিউটারনির্ভর অত্যাধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার এ যুগে মানুষ কঠিন বাস্তবতার শিকার। সবাই চায় সচ্ছলতা, চায় শান্তি। বস্তুত মানুষ আত্মিক শান্তির পিয়াসী, আর বেঁচে থাকার জন্য এটি অপরিহার্য। মহান আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলাম সেই অনন্ত শান্তির বাণীই প্রচার করছে। তাই শাশ্বত ধর্ম ইসলামের অনিন্দ্যসুন্দর আদর্শে মানুষ যুগ যুগ ধরে ইসলাম গ্রহণ করে আসছে।
বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই শান্তি ও নিরাপত্তা চায়। কিন্তু বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, প্রকৃতপক্ষে অধিকাংশ মানুষ সেই পথ অবলম্বন করতে চায় না, যে পথে চললে প্রকৃত শান্তি অর্জন সম্ভব। কেননা, এ পথ যতটা সহজ, ততটাই বন্ধুর। এই নীতি ও সমাধানের কথা বিশ্বস্রষ্টা পবিত্র কোরআনেও বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘যারা ঈমান আনে এবং যাদের হৃদয় আল্লাহকে স্মরণ করে প্রশান্তি লাভ করে। জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা আর-রাদ, আয়াত: ২৮)
বাস্তবতা হলো, আজ মানবতা আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরে গেছে এবং আল্লাহ তাআলাকে ভুলে বসেছে। অনেকে তো আল্লাহর অস্তিত্বই অস্বীকার করে। আর এ কারণেই তারা এ বিষয়ে মনোযোগ দিতে চায় না। আবার যারা বিশ্বাস করে, তাদের মধ্যেও অনেকে ধর্মপ্রবর্তকদের সত্যিকার শিক্ষামালা বিকৃত করে মনগড়া ব্যাখ্যা উপস্থাপন করছে, যা সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে।
অথচ প্রত্যেক জাতির কাছেই নবি এসেছেন, আর সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্যই তাঁরা আবির্ভূত হয়েছেন।
সবশেষে বিশ্বের জন্য রহমতস্বরূপ আবির্ভূত হন সর্বশ্রেষ্ঠ মানবদরদি রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি বিশ্ববাসীকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য এসেছেন, যাতে তারা এক জাতিতে পরিণত হয় এবং পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন সব ধর্মের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান প্রদর্শন।
মহানবি (সা.)-এর শান্তি প্রতিষ্ঠার পদক্ষেপ ও পদ্ধতি ছিল অনন্য। তিনি যুদ্ধবাজ আরবদের শান্তির পতাকাতলে সমবেত করেন এবং বিবদমান গোত্রগুলোকে একটি সুসংহত জাতিতে রূপান্তরিত করেন।
বিশ্বনবি (সা.) তাঁর জীবন দ্বারা প্রমাণ করে গেছেন যে, ধর্মের নামে কোনো অন্যায়-অবিচারের স্থান নেই। সব ধর্মের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ এবং তাদের উপাসনালয় শ্রদ্ধার পাত্র।
মহানবি (সা.)-এর শিক্ষাগুলো আজ আমাদের জীবনে বাস্তবায়নের সময় এসেছে। মহানবি হজরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) সমাজের সর্বস্তরে এবং সব জাতির মধ্যে শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিলেন। তিনি খ্রিষ্টানদের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকারও নিশ্চিত করেছিলেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত যেন তা বলবৎ থাকে, সেই ব্যবস্থাও করেছিলেন।
খ্রিষ্টানদের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার নিশ্চিতকারী মহানবি (সা.) প্রদত্ত ৬২৮ খ্রিষ্টাব্দের ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে: ‘এটি মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ (সা.) কর্তৃক নিকট ও দূরের সব খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের জন্য প্রদত্ত ঘোষণাপত্র। আমরা তাদের সঙ্গে আছি। আমি, আমার সেবকবৃন্দ, মদিনার আনসার এবং আমার অনুসারীরা তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি। কেননা, খ্রিষ্টানরা আমাদের দেশেরই নাগরিক। আল্লাহর কসম! যা কিছু তাদের অসন্তুষ্টি ও ক্ষতির কারণ হয়, তার আমি ঘোর বিরোধী। তাদের প্রতি বলপ্রয়োগ করা যাবে না। তাদের বিচারকদের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা যাবে না এবং তাদের ধর্মযাজকদেরও তাদের আশ্রয়স্থল থেকে সরানো যাবে না। কেউ তাদের উপাসনালয় ধ্বংস বা ক্ষতিসাধন করতে পারবে না। কেউ যদি এর সামান্য অংশও আত্মসাৎ করে, তবে সে আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গকারী এবং তাঁর রাসুলের অবাধ্য হিসেবে গণ্য হবে।
নিশ্চয়ই তারা আমার মিত্র। তারা যেসব বিষয়ে শঙ্কিত, সেসব বিষয়ে আমার পক্ষ থেকে তাদের জন্য পূর্ণ নিরাপত্তা রয়েছে। কাউকে জোর করে বাড়িছাড়া করা যাবে না কিংবা যুদ্ধে অংশগ্রহণে বাধ্য করা যাবে না। বরং মুসলমানরা তাদের জন্য যুদ্ধ করবে। কোনো খ্রিষ্টান নারী যদি কোনো মুসলমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তবে তাঁর অনুমতি ছাড়া সেই বিবাহ সম্পন্ন করা যাবে না। তাঁকে তাঁর গির্জায় গিয়ে উপাসনা করতে বাধা দেওয়া যাবে না। তাদের গির্জাগুলোর পবিত্রতা অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। এগুলোর সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণে বাধা দেওয়া যাবে না। তাদের ধর্মীয় অনুশাসনের পবিত্রতাও ক্ষুণ্ন করা যাবে না। এ উম্মতের কোনো সদস্য কিয়ামত দিবস পর্যন্ত এ ঘোষণাপত্র লঙ্ঘন করতে পারবে না।’
[অগ্রপথিক সীরাতুন্নবী (সা.), ১৪১৬ হিজরি, ১০ বর্ষ, ৮ সংখ্যা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, প্রথম সংস্করণ, আগস্ট ১৯৯৫]
আমরা যদি মহানবি (সা.)-এর ধর্মীয় সম্প্রীতির অনুপম শিক্ষা অনুসরণ করি, তাহলে বিভক্ত ও অস্থির বিশ্বে প্রকৃত শান্তি, সহাবস্থান ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হবে, ইনশাআল্লাহ।
আজ বিশ্ববাসী যদি শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করতে চায়, তাহলে পরস্পরের মধ্যে সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, আন্তরিকতা ও বিশ্বস্ততার সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে।
আল্লাহ আমাদের প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও ইসলামী চিন্তাবিদ।
এইচআর/জেআইএম
What's Your Reaction?