আহমদ রাজুর গল্প : গহরজান
তিন ছেলে মিলে মায়ের জমিটা লিখে নেয়ার আগের দিন পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। আজ সকালের সূর্যটা অন্যরকম। কেউ যেন তাকে পাত্তাই দিতে চায় না। অথচ গতপরশু সকালে তবির বউ ঘরে নিয়ে কাঠের চেয়ারটাতে বসিয়ে খাওয়ালো! হবির বউ তখন বলে, ‘ইস! মা’র চুলির কী অবস্থা! খাওয়া হয়ে গিলি চুলি তেল দিয়ে দিবানে। মেঝো তোরে তো কওয়াই হইনি, মা কিন্তু দুপুরি আমাগ্যের ওহানে খাবেনে।’ কোথায় ছিল রবির বউ কে জানে। সে হঠাৎ এসে বলে, ‘কী লো বু, মা কী ত্যোগের একার? তুমাগের দেবর কাল রাত্তিরি হাটেত্তে নলা মাছ আনিছিল। মা’রে খাওয়াবো বলেইতো পেঁপোলি শাঁক দিয়ে রান্দিছি। মা’র আবার পেঁপোলি শাঁক দিয়ে নলা মাছ খুব পছন্দ।’ তিন ছেলে আর তাদের বউয়ের এমন আদর-আপ্যায়ন শুধু যে একদিন তা নয়, বেশ ক’দিন থেকে চলছিল এমন প্রতিযোগিতা। শাশুড়ি কী খেতে ভালোবাসে আর বাসে না তা অকপটে তারা বলে যাচ্ছে! এই যে পেঁপোলি শাঁক আর নলা মাছের কথা বললো ছোট বউ, কই কোনোদিন তো কাউকে বলেনি এমন কথা। সে পেঁপোলি শাঁক ভালোবাসে এটা সত্য, তার সাথে ঢাসা পুঁটি মানায়। কেন এমন ভালোবাসার ঢেউ শুরু হয়েছিল তাকে কেন্দ্র করে, গতকাল সকাল পর্যন্ত তার উত্তর খুঁজে পায়নি গহরজান। স্বামী মারা গেছে বহু
তিন ছেলে মিলে মায়ের জমিটা লিখে নেয়ার আগের দিন পর্যন্ত সব ঠিকই ছিল। আজ সকালের সূর্যটা অন্যরকম। কেউ যেন তাকে পাত্তাই দিতে চায় না। অথচ গতপরশু সকালে তবির বউ ঘরে নিয়ে কাঠের চেয়ারটাতে বসিয়ে খাওয়ালো! হবির বউ তখন বলে,
‘ইস! মা’র চুলির কী অবস্থা! খাওয়া হয়ে গিলি চুলি তেল দিয়ে দিবানে। মেঝো তোরে তো কওয়াই হইনি, মা কিন্তু দুপুরি আমাগ্যের ওহানে খাবেনে।’
কোথায় ছিল রবির বউ কে জানে। সে হঠাৎ এসে বলে, ‘কী লো বু, মা কী ত্যোগের একার? তুমাগের দেবর কাল রাত্তিরি হাটেত্তে নলা মাছ আনিছিল।
মা’রে খাওয়াবো বলেইতো পেঁপোলি শাঁক দিয়ে রান্দিছি। মা’র আবার পেঁপোলি শাঁক দিয়ে নলা মাছ খুব পছন্দ।’
তিন ছেলে আর তাদের বউয়ের এমন আদর-আপ্যায়ন শুধু যে একদিন তা নয়, বেশ ক’দিন থেকে চলছিল এমন প্রতিযোগিতা। শাশুড়ি কী খেতে ভালোবাসে আর বাসে না তা অকপটে তারা বলে যাচ্ছে! এই যে পেঁপোলি শাঁক আর নলা মাছের কথা বললো ছোট বউ, কই কোনোদিন তো কাউকে বলেনি এমন কথা। সে পেঁপোলি শাঁক ভালোবাসে এটা সত্য, তার সাথে ঢাসা পুঁটি মানায়। কেন এমন ভালোবাসার ঢেউ শুরু হয়েছিল তাকে কেন্দ্র করে, গতকাল সকাল পর্যন্ত তার উত্তর খুঁজে পায়নি গহরজান।
স্বামী মারা গেছে বহু বছর আগে। তখন ইয়াসমিন পেটে। চৈত্রের কড়া দুপুর, সূর্য তখন মাথার ওপর। মালেক ফকির বেগুন ক্ষেতের আগাছা নিংড়িয়ে বাড়িতে এসে বারান্দার খুঁটিতে হেলান দিয়ে বসে পড়ে। তিন ছেলে তখন খুব ছোট। তারা পাশের বাঁশ ঝাড়ের নিচে খেলাধুলায় মগ্ন।
‘গহরজান এক গ্যালাস পানি দিবা।’ হাঁক ছাড়ে মালেক ফকির।
অপেক্ষাকৃত দূরত্বে রান্নাঘর। সেখান থেকে উত্তর দেয় গহরজান, ‘এট্টু বসো, আমি কলেত্তে ঠান্ডা পানি আনতিছি।’
‘ঠান্ডা লাগবে না, যা আছে তাই দাও।’ মালেক ফকিরের কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন।
স্বামীর এমন কথায় মনে খটকা লাগে গহরজানের। সে তাড়াতাড়ি মাটির কলসি থেকে গ্লাসে পানি নিয়ে স্বামীর হাতে দেয়। গ্লাস হাতে নিয়ে মুখের কাছে নিতেই হাত থেকে গ্লাসটা নিচে পড়ে যায়। সাথে সাথে মালেক ফকিরও মাটিতে ঢলে পড়ে। গহরজানের সামনে মুহূর্তেই ঘটে যায় ঘটনাটা। যা আজও কোটরাবদ্ধ চোখের সামনে ভাসে তার। এক ভরা ভাদ্রের মতো যৌবনে স্বামীকে হারিয়ে মহা সংগ্রাম শুরু করে সে। একদিকে ছোট ছোট তিন ছেলে আর পেটে আগত সন্তান; অন্যদিকে দ্যারিদ্রতা। তাছাড়া গ্রামের মাতব্বর শ্রেণি, পাতি মাস্তান আর উঠতি বয়সী নেতারা তো রয়েছে। তাদের থেকে নিজেকে রক্ষা করে চলাটাও তো চাট্টিখানি কথা না।
গহরজানের অদম্য ইচ্ছাশক্তি গ্রামের মহিলাদের কাছে অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। স্বামীর যৎসামান্য জমিতে নিজেই হাল চাষ করে ফসল ফলায়। ছেলেদের মইয়ের ওপর উঠিয়ে জমি সমান করে সংসারটাকে কোনো রকম দাঁড় করায়। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করিয়েছে যতদূর সম্ভব। তাদের বিয়ে দিয়েছে; আর কি? পুরানো স্মৃতি রোমস্থন করে চোখের কোণে জলের একটা কণা উপস্থিত হয় যা বুঝতে পারে গহরজান। শুধু সুখের স্মৃতি কেন, দুঃখের স্মৃতি কম ছিল না তার জীবনে। আজকাল অনেক কিছু মনে করতে পারে না। যৌবনে অকথ্য খাঁটুনি আর বয়স তার চোখের সামনে থেকে বিদায় নিচ্ছে পুরানো অনেক কিছু।
সকাল-দুপুর-বিকেল গড়িয়ে রাত হয়ে গেলেও তার খোঁজ কেউ খুব একটা নেয় না। বাড়ির সামনের আম গাছের নিচে বাঁশের মাঁচায় শুয়ে বসে দিন কাটে তার। মাচার ওপর টিনের ছাউনি; সেখানে রোদ বৃষ্টি খুব একটা স্পর্শ করে না। রাতে কারো দয়া হলে পূর্বদিকের ঘরের বারান্দায় হাত ধরে নিয়ে যায়। একা একা ঘরের বারান্দায় যাওয়া অনেকটা কঠিন তার জন্যে। গত বছর ফাল্গুন মাসে একবার উঠানে পড়ে যেয়ে মাজায় যে ব্যথা পেয়েছিল তা বোধকরি মৃত্যুর আগপর্যন্ত মনে থাকবে। ভাগ্যিস গোলাম ডাক্তার মাজায় একটা ইনজেকশন দিয়েছিল। তারপর থেকে আর নিজে নিজে হাঁটার চেষ্টাও করে না সে। আর করলে যে হাঁটতে পারবে না সেটা নিশ্চিত।
সবার খাওয়া শেষ হলে হাঁড়ির তলানির ভাত আর সামান্য তরকারি থালায় পুরে গহরজানের সামনে রেখে যায় হবির বউ। অধিকাংশ দিন হবির বউ তার শাশুড়িকে খাবার দেয়। অন্য দুই বউ কোনো খবরই নেয় না। তাদের ধারণা শাশুড়ির ওপর যতটুকু কর্তব্য তা বড় বউয়ের।
‘ও বউ; হবিরেতো দেখলাম হাটেরতে মাছ আনতি? কই আমারে তো ইট্টুও দিলি নে। সুদো ভাত আর গিলতি ভালো লাগে না।’ পা নিচে ঝুলিয়ে মাচার ওপর বসেছিল গহরজান। পা উঠিয়ে অপেক্ষাকৃত একটু ঝুঁকে ভাতের থালা কাছে এগিয়ে নিতে নিতে কথাগুলো বলে সে।
হবির বউ খেঁকিয়ে ওঠে, ‘ঢং দেহে আর বাঁচিনে। দুই পা কবরে চলে গেছে তাও খাওয়া কমলো না। খায়ে খায়ে শুধু ছেড়োবানে। ও পাট করে কিডা কওদিনি?’
ছেলে বউয়ের কথায় গলার স্বর কমে আসে গহরজানের। সে নরম স্বরে বলে, ‘আর খাওয়া; তিন ছুয়ালরাই আমারে গলার কাঁটা ভাবতি শুরু করেছে। আর তুরাতো থাকলি পরের মায়ে।’
‘বুড়ির কতো কতা আসপেনে। যদি কাজ করে খাওয়া লাগদো তালি অতো কতা আসতো না।’ কথাগুলো বলতে বলতে ঘরের ভেতর চলে যায় হবির বউ।
গহরজান আর কথা বাড়ায় না। তার চোখ কেবলই ক্ষণে ক্ষণে চলে যায় পুরানো দিনে। কী চেয়েছিল আর কী হলো! মাঝে মাঝে মনে হয়, এই সময় অতিবাহিত করা মানেই বুঝি সুখ।
২০১৯ সালের ডিসেম্বর। করোনা ভাইরাসের প্রকোপ শুরু হয়েছে বিশ্বজুড়ে। বাদ যায় না বাংলাদেশও। ২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়। তারপর দিন বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে রোগী, মৃত্যুর মিছিলে যোগ হয় গুণের নামতা। শহর-গ্রাম সব জায়গার চিত্র একই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা, অফিস আদালত সবকিছু অনির্দিষ্টকালের জন্যে বন্ধ। চারদিকে হাহাকার, মৃত্যুর মিছিলে প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে হাজারো নাম। অতি প্রয়োজন ছাড়া হাটে, মাঠে, ঘাটে যাওয়া বারণ। গেলেও মুখোশ পরে যেতে হচ্ছে। সরকারি বাহিনীর সাথে সামরিক বাহিনীও তৎপর। দোকানপাট নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বন্ধ করতে সরকার অধ্যাদেশ জারি করেছে। এর ব্যত্যয় ঘটলে জরিমানা গুনতে নয়তো লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে। একজন আরেকজনের সাথে কথা বলতেও দ্বিধাবোধ করে। টাকা-পয়সায় হাত দিলেও হাত জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করার চল শুরু হয়েছে। কেউ কেউ মুখের সামনে লেমিনেটিং পেপার টাঙিয়ে বাড়ি থেকে বের হচ্ছে। কী এক কিম্ভুতকিমাকার! বাসগাড়ি, ট্রেন এমনকি বিমানে মাঝের একটি আসন খালি রাখা হচ্ছে। টাকাওয়ালা যারা আছে, তারা পরিবার এবং আগামীদিনের কথা চিন্তা করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি মজুদ করা শুরু করেছে।
গ্রামের চিত্র আরো অন্যরকম। গ্রামে ঢোকার মূল রাস্তায় আড়াআড়ি বাঁশ বেঁধে রেখেছে এলাকার লোকজন। অপরিচিত কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না। জ্বর, সর্দি, গলায় ব্যথা হলেই তাকে আলাদা থেকে করোনা পরীক্ষা করতে হচ্ছে। পরীক্ষায় করোনা ভাইরাসের উপস্থিতি থাকলে তাকে অন্তত চৌদ্দ দিন সবার থেকে আলাদা থেকে চিকিৎসকের পরামর্শমত চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা সাধ্যমত চাল-ডাল নিয়ে তার বাড়ি যেয়ে লাল ফ্লাগ টাঙিয়ে দিয়ে আসে। কেউ আইন অমান্য করলেই তার বাড়ি পুলিশ যেয়ে শাসিয়ে আসছে। পৃথিবীর এই অসুখকে পুঁজি করে সুবিধাভোগীরা যার যার অবস্থানে থেকে সুবিধা ভোগ করছে দেদারছে।
সকাল থেকে গহরজানের জ্বর বেশ বেড়েছে। সাথে শুকনো কাশি। গলাব্যথার কারণে সকালে পান্তা ভাতও খেতে পারেনি। এখন জ্বর মানে করোনা ভাইরাস, এমন ভয় মনের মধ্যে সবার। সাথে শুকনো কাশি আর গলাব্যথা হলেতো কথায় নেই। নিশ্চিত করোনা। গ্রামের সহজ-সরল মানুষের মনে এমন ধারণা আসতেই পারে। সত্যটা হলো, এমন ধারণা গ্রামের চেয়ে শহরের মানুষের মধ্যে বেশি দেখা দিয়েছে।
‘ও বউ, আমারে এট্টু পানি দিবা?’ মাচার ওপর কাত হয়ে শুয়েছিল গহরজান। দূরে হবির বউকে যেতে দেখে হাঁক ছাড়ে সে।
কথাটা হবির বউয়ের কানে গেলেও সে ভ্রুক্ষেপ করে না।
কেন যেন মনে হয়, হবির বউ তাকে পানি দিতে আসবে না। তাইতো বলে, ‘আল্লাহ যদি আমারে নিয়ে যাতো তালি বাঁচতাম। আল্লাহ তুমি আমারে নিয়ে যাও। কেন আমারে নিয়ে যাও না?’ কোটরাবদ্ধ চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে কিনা তা বোঝা যায় না। তবে চোখ যে তার ছল ছল করে উঠেছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। তৃষ্ণার মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় সে আবারো হাঁক ছাড়ে, ‘তুমাগের আল্লার কিরে লাগে, আমারে এটটু পানি দিয়ে যাও। আমি তো আর বাঁচতিছি নে।’
রবি ফসলের ক্ষেত থেকে এইমাত্র বাড়িতে এসে মায়ের হাঁকডাক শুনতে পেয়ে সেদিকে এগিয়ে যায়। দশ/বারো হাত দূরত্বে দাঁড়িয়ে থেকে বলল, ‘আমাগের কি এটটু শান্তিতি থাকতি দিবা না?’
ছেলের কথায় তার মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে ভাবে, এই কী সেই ছেলে? যাকে বাঁচাতে একদিন ষাঁড়ের সামনে নিজেই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল! না হলে সেদিনই পাগলা ষাঁড়টা ওকে পিষে ফেলতো। যাকে দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করে নরক যন্ত্রণা ভোগ করেছিলাম? যাদের মুখে দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন তুলে দেবার জন্যে ঝড় বৃষ্টিকে উপেক্ষা করে ফসল ফলিয়েছি? কোনো কিছু আর ভাবতে চায় না গহরজান। হাজার হলেওতো তার সন্তান!
‘আমারে এটটু পানি দিতি পারবি বাপ?’
‘মুখ ঢাহে এটটু আচতে কতা কও। আমাগের সবাইরে তুমি কি মারবা?’
শীর্ণকায় শরীর। কথা বলার শক্তি বেশি অবশিষ্ট নেই। তার কথার ভেতরে শরীরের অক্ষমতা প্রকাশ পায়। বলল, ‘আমি ত্যোগের কি করলাম?’
‘তুমার করোনা ভাইরাস অইছে। বাড়ি সুদ্ধ মানুষ; এটটু বুজার চিষ্টা করো। তুমার বাতাস লাগলি বাড়িসুদ্ধ মরতি হবেনে! দেখতিছাও না, বাড়ি পিলাক টাঙায়ে দিয়ে গেছে?’
কথাটা গহরজানের কানে গেল কি গেল না বোঝা যায় না। তার নিঃশ্বাসে কষ্ট হওয়ায় হাঁপাতে শুরু করেছে। অবস্থা বেগতিক দেখে মাটির ভাড়ে পানি এনে পাঁচ হাত লম্বা একটা লাঠির মাথায় সেটা ঝুলিয়ে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে মায়ের দিকে এগিয়ে দেয় রবি। বলল, ‘নেও; পানি খাও। আর শোন, আজ রাত্তিরি যেন বারান্দায় উঠো না। কী হয় কওয়া যায় না। আমরা মাজে মদ্যি ওই বারান্দায় যাই।’
গহরজান বুঝতে পারে তার ছেলের মূল বক্তব্য কী। কোনো কথার উত্তর না দিয়ে মাটির ভাঁড় থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে খায় ঢকাঢক। কেন জানি পানি তিতো মনে হয় তার। আজ তিনদিন জ্বর। গোলাম ডাক্তার এসেছিল সেদিন। ডাক্তারকে কে নিয়ে এসেছিল তা জানে না গহরজান। তবে ছেলেরা যে তাকে আনেনি এটা নিশ্চিত। পাশের গ্রামে বাড়ি। গহরজানের জীবনী তার জানা। সে নিজ ইচ্ছায় মাঝে মধ্যে বৃদ্ধার খোঁজখবর নিয়ে ওষুধ দেন। মূল্য নেন না। ডাক্তার দু’পাতা নাপা ট্যাবলেট দিয়ে ছয় ঘণ্টা পরপর আহারের পর খাবার কথা বলেছিল। সময় বুঝতে না পেরে ঠিকমত তা খাওয়া হয় না। বাড়িতে তিন তিনটে ছেলে, ছেলেদের বউ। তারা কেউ আর এই বয়স্ক মানুষটার কাছে আসে না। নাতি-নাতনিদের কথা আলাদা। তারা সবাই এখনো অনেক ছোট। অথচ গহরজানের ছেলেমেয়েরা যখন ছোট ছিল; তখন চাষাবাদের কারণে মাঝে মধ্যে জ্বর-সর্দি হলে তাদের মধ্যে মাকে সেবাযত্নের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যেত। ঠিক যেমন ছিল তার জমি লিখে দেবার আগে।
আজ সকালে তবি যে দয়া করে ওষুধ এনে দিয়েছে তা বুঝতে পারে গহরজান। না হলে মুখে গামছা পেঁচিয়ে এসে দূর থেকে মায়ের দিকে ওষুধ ছুড়ে দিয়ে সে কী করে বলতে পারে, ‘নেও, দয়া করে অন্তত ওষুধগুলো খাইয়ো; দেহ সারে কিনা। তুমার জন্যি তো আমাগের কোনো জাগায় যাওয়ার জো নেই। সবাই আমাগের দেহে ভয় পায়। পিলাক টাঙানো বাড়ির লোক বলে!’
তবির এতগুলো কথায় হৃদয়ে তার বৃষ্টির ধারা বইলেও চোখ থেকে কোনো অশ্রু ঝরে না।
দু’দিন থেকে শরীরের অবস্থা বেশ খারাপ গহরজানের। সে বিছানা থেকে উঠতে পারে না। অনেক চেষ্টা করেও না। মায়ের খবর শুনে উদ্ভ্রান্তের মতো ছুটে আছে ইয়াসমিন। সে সাথে আনা ভাত তরকারি মাখিয়ে মায়ের মুখে তুলে দিয়েও ব্যর্থ হয়। তার যে অনেক শক্তি শেষ হয়ে গেছে ইতোমধ্যে। কোনো খাবার আজ তার গলা থেকে নামবে না। প্রাণটা যে যায় যায় অবস্থা! অনেকদিন পর মেয়েকে পেয়ে মেয়ের গায়ে-মুখে হাত বোলায়; কিছু একটা বলতে চায় গহরজান। তার চোখের কোণে দেখা যায় জলের রেখা।
মাকে শান্ত্বনা দেয় ইয়াসমিন। ‘তুমি ভালো হয়ে যাবা মা। কুনো চিন্তা করবা না।’
গহরজান মেয়ের মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। মুখ থেকে তার কোনো শব্দ বের হয় না। বয়স আর সমাজ-সামাজিকতা তাকে মুখ বন্ধ করে রাখতে বাধ্য করেছে। মনে মনে তার মেয়েকে মন ভরে আশীর্বাদ করে গহরজান। বলে, ‘কতদিন পরে তোরে দ্যাখলাম মা। ক্যামন ছিলি এতদিন? জামাই কিরাম আছে রে? আর হ্যাঁ, আমার যে করোনা অয়চে! দূরি দাঁড়ায়ে কথা কলি ভালো করতি।’ মুখ ফুটে কিছুই বলা হয় না। ঠোঁট কাঁপতে থাকে; অন্তরটা জ্বলেপুড়ে অঙ্গার হয় তার। ইয়াসমিন ভাইদের কাছে জিজ্ঞাসা করে মায়ের করোনা হয়েছে তারা কীভাবে জানলো। আর বাড়ি লাল ফ্লাগ টাঙালো কীসের ওপর ভিত্তি করে। তবি বলে, ‘মা’র বয়স হবার জন্যি টেসট্ করাতি নিতি পারিনি। তয় লক্ষণতো করোনার। তাইতো আমাগের এলাকার নেতা কটা আব্দুল থায়ে পিলাগ টাঙায়ে দিয়ে গেছে।’
ছেলে— ছেলের বউয়েরা তার ধারের কাছেও ঘেঁষছে না ভয় আর ঘৃণায়। গহরজানের হৃদস্পন্দন ক্ষীণ হয়ে আসে ক্রমেই। সে অস্পষ্ট স্বরে ডাক দেয়, ‘ও হবি, তবি, রবি; আমি আর বাঁচপো না রে বাপ। ইয়াসমিনরে এটটু খবর দে।’ ইয়াসমিন আজ সকালে এসে বিকেলেই তার শ্বশুরবাড়িতে ফিরে গেছে; যা তার মনে নেই। এ কারণে অস্পষ্ট স্বরে তার ছেলেদের উদ্দেশ্যে কথাটি বলে। কথাটি ছেলেদের কান পর্যন্ত গিয়েছে বলে মনে হয় না গহরজানের।
ঘুটঘুটে অন্ধকার। চারদিকে জোড়া জোড়া চোখ জ্বল জ্বল করছে। দূর থেকে ভেসে আসে শেয়াল-কুকুরের ডাক। গহরজান এখন মুক্ত। তার বহু বছরের আশা পূর্ণ হয়েছে। এখন সে শান্তিতে জীবন পরবর্তী সময় অতিবাহিত করতে পারবে ভেবে স্বস্তিতে চারদিকে তাকায়। তাকে ঘিরে ধরে আছে অনেকগুলো শেয়াল-কুকুর জাতীয় প্রাণী। যে মানুষটা কুকুর দেখলে ভয়ে অস্থির হয়ে উঠতো তার চারপাশে কিনা এতগুলো প্রাণী! সে অনেক চেষ্টা করেও মনের ভেতরে ভয়ের আলামত তৈরি করতে পারে না। আচমকা ঘাড়ের কাছে কিসের যেন নিঃশ্বাসের উষ্ণতা পায়। ভাবে, হয়তো মৃতদেহ খেতে এসেছে; এখনি হয়তো তাকে খেয়ে শেষ করে ফেলবে। তাহলে মৃত্যুর পর এভাবেই বুঝি মৃতদেহ খেতে চলে আসে পশুর দল! পায়ে হাতে পিঁপড়ে জাতীয় কিসে যেন কামড়িয়ে যাচ্ছে অহর্নিশ। নিঃশ্বাস নিতে আগের মতো কষ্ট। শীতও লাগছে খুব। সাথে দখিনা হিমেল হাওয়া। মৃত্যু পরবর্তী যন্ত্রণা বুঝি এমন হয়! ইমাম সাহেব কেন তবে সেদিন বলেছিলেন, দোজখের আযাব খুবই কঠিন! তার ভাবনা দূর থেকে বহুদূরে হারিয়ে যায়।
‘তবে কী আমি বেহেশত মদ্যি?’ বিভিন্নভাবে সে জেনেছে বেহেশতের বর্ণনা। সেই বর্ণনার সাথে বর্তমান অবস্থার খুব বেশি মিল নেই।
‘তালি আমি এহনে কনে আচি?’ সাতপাঁচ ভেবে কোনো উত্তর খুঁজে পায় না সে। বলল, ‘কিয়ামতের আগে হইতো এবাবে চলবেনে।’
‘আমি এহা ক্যান? কাউরেতো দেখতিচি নে!’ নিজেকে প্রশ্ন করে। পৃথিবী থেকে শুধু যে সে একা বিদায় নিয়ে এখানে এসেছে তা নয়; হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষ বিদায় নিয়ে এখানে এসেছে— আসছে। কই তাদের কাউকেতো দেখছে না! মনের ভাবনা মনে থাকতেই একটা আলোর বহর তার দিকে আসতে দেখে মনটা শান্ত হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে আলোটা আরো স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়।
বলো হরি, হরি বোল বলতে বলতে আলোর বহর কাছে এসে পড়ে। মাটিতে পড়ে থাকা গহরজানের গায়ে ধাক্কা লেগে একজন উচোট খাওয়ার জোগাড়। ‘কী রে বাবা, সব জাগায় তো চালাকি! শ্মশানে আসে যদি না পুড়ায় তালি লাশের কি কোনো ধর্ম্ম থাকলো?’ একজন বলল।
একজন হারিকেনটা মুখের কাছে ধরে বলল, ‘এই কেউ ওদিক যাস নে। মনে হয় করোনার রোগী ছিল। ছুয়ালরা পয়সা বাঁচাইচে।’
একজন বলল, ‘মনে হয় বেশি সময় ফেলিনি। তা না হলি তো লাশেরতে গোন্দ ছুটতো।’
অপেক্ষাকৃত বয়স্ক একজন বলল, ‘তা ঠিক, কালকে সকালে আসে দেকা যাবেনে। চল, এইডেরেতো আগে চিতায় উঠোই। যদি কাঠ বাঁচে তালি ভগবানের ইচ্ছাই ব্যবস্থা একটা হবেই।’ বলো হরি, হরি বোল বলতে বলতে তারা চললো সামনের নদীর ধারে, যেখানে চিতা সাজানো আছে আগে থেকে।
আর যাই হোক সকল কিছু অনুভবে আসে গহরজানের। দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে চিতার আগুন। ঐ আগুনে সারা শ্মশান আলোকিত হয়ে যায়। হৃদয় জুড়ে তার হাহাকার। এটা বুঝতে পারে. ছেলেরা তাকে কবর না দিয়ে রাতে আঁধারে এই শ্মশানে ফেলে গেছে! তবে একদিক দিয়ে ভালোই করেছে বলে মনে হয় তার। অন্তত কোনো ঋণ তাকে হতে হয়নি। তা না হলে ছেলেদের কাছে তার ঋণী হবার সম্ভাবনা ছিল। কাফনের কাপড় কেনা, আগরবাতি, গোলাপজল, গন্ধ সাবান আরো কত কী! দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে গহরজান। এখন মনটা যে বেশ ফুরফুরে লাগছে। যাকে পোড়াচ্ছে সে তো কিছুক্ষণ পরেই ভূত হয়ে তার সাথে সঙ্গ দেবে, তার অপেক্ষায় আছি আমি। মনে মনে কথাটা আওড়িয়ে যায় গহরজান।
হঠাৎ এক পশলা শীতল হাওয়ায় শরীরে কাঁপুনি লাগে। এমনিতে শীতকাল। তার ওপর এমন হিমেল হাওয়া! গালে যে কয়টা দাঁত আছে তারা একটার সাথে আর একটা লেগে যায়। সামনে চিতার আগুন নিভতে শুরু করেছে। যারা এসেছিল তারা ফিরে গেছে অনেক আগেই।
বলো হরি, হরি বোল শব্দটা হঠাৎ কানের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আবারো মশাল হাতে গোটা পাঁচ/ছয়জন লোক। এবার লাশের সঙ্গে কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। মনে হয় এরা সবাই টাকার বিনিময়ে লাশ পোড়াতে এসেছে। একথায় পেশাজীবী কাঠুরে। পাশ দিয়ে গেলেও গহরজানের দিকে ভ্রুক্ষেপ করে না। তারা তাড়াতাড়ি দুটো চিতা পরপর সাজিয়ে অগ্নিসংযোগ করে তাতে। এক আলোকচ্ছটায় মুখটা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে গহরজানের। সে বুঝতে পারে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের স্বাদ। এখানে ভয় নেই— ক্লান্তি নেই— ক্ষুধা নেই, চাওয়া-পাওয়ারও কিচ্ছু নেই। কিন্তু কিছু একটা আছে। মনে খটকা লাগে তার। উঠে বসার জন্যে আশপাশের কিছু হাতড়িয়ে ধরার চেষ্টা করে। পারে না। তিন ছেলেকে একবার ডাকতে চেয়েছিল। সে ডাকে না। তারা যখন কাফনের কাপড় কেনা আর মায়ের শেষ যাত্রায় সামান্য খরচের ভয়ে তাদের মৃত মা’কে কবর না দিয়ে শ্মশানে ফেলে গেছে তখন তাদের ডাকতে ইচ্ছে হয় না। তারা সবাই ভালো থাক। আর কবর দিলেই বেহেশতে যেতে পারতো তা নয়; তার কর্মফলই তাকে সঠিক ঠিকানায় পৌঁছে দেবে। মনে মনে ভাবে গহরজান।
বেশকিছু সময় রাতজাগা কুকুরের আনাগোনা ছিল না। এখন আবার শুরু হয়েছে। পায়ের গোড়ালিতে কিসে যেন একটা কামড় বসিয়ে দেয়। চিল্লিয়ে ওঠে গহরজান। সে ক্ষীণ স্বর কাঠুরিয়াদের কানে যায়। তারা সবেমাত্র চিতার আগুন শেষ করে বাড়ির দিকে ফিরতে পা বাড়িয়েছিল। শব্দের উৎপত্তি খুঁজতে খুঁজতে কাছে এসে দেখে একজন বৃদ্ধ মহিলা শ্মশানের খালি মাটিতে পড়ে আছে। একজন নাকের কাছে হাত দিয়ে বুঝতে পারে নিঃশ্বাস এখনো চলছে। কোনো কিছু না ভেবে কিছুক্ষণ আগে যে বাঁশে ঝুলিয়ে মৃতদেহ এনেছিল সেই বাঁশে ঝুলিয়ে গহরজানকে তারা হাসপাতালের দিকে নিয়ে যায়।
গহরজান তখনো বুঝতে পারে না কী হচ্ছে! মৃত্যু পরবর্তী জীবন এমন হয় তা তার আগে জানা ছিল না। ক্লান্ত অবসন্ন শরীর তাকে ঘুমের রাজ্যে নিয়ে গিয়েছিল। যখন চোখ মেলে তাকায় তখন সে নিজেকে নরম বিছানায় আবিষ্কার করে। পাশের সেবিকাকে ক্ষীণ কণ্ঠে প্রশ্ন করে, ‘তুমি কি মা দুনিয়াতে নার্স ছিলে?’
সেবিকা বুঝতে পারে ব্যাপারটা কী? তাইতো বলল, ‘না দাদি মা, তা হবে কেন?’
‘তালি তুমি কী ছিলে?’
‘আমি মরতে যাবো কেন?’ সেবিকার মুখে হাসির রেখা ফুটে ওঠে।
‘তালি তুমি মরে যাওনি?’ কপালে চিন্তার ভাজ গহরজানের।
আপনার কি মনে হয় এটা মরণ কাল?’
‘হ্যাঁ তাইতো।’
‘আপনি বেঁচে আছেন, এখন হাসপাতালে।’
‘তালি...’
গহরজানের কথা শেষ না হতেই সেবিকা প্রশ্ন করে, ‘তাহলে কী দাদি মা?’
‘এই যে শ্মশান, চিতা, ধুধু মাঠ, কালো রাত এত্তকিছু? আর আমি তো করোনায় মরে গিছি।’
সেবিকা গহরজানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, ‘আপনার করোনা হয়নি। এখন একটু ঘুমানোর চেষ্টা করেন। সব ঠিক হয়ে যাবে।’
গহরজান মনে মনে ভাবে, আসলেইতো একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। শুধু ঠিক হবে না মনের ক্ষত। যে ক্ষত তার সন্তানরাই তৈরি করেছে। তবুও তারা ভালো থাক।
গহরজান আবারো ঘুমের রাজ্যে। সে বিচরণ করতে চায় অচেনা জগতে। যে জগতে নেই চাওয়া-পাওয়া, দেওয়া-নেওয়া, স্বার্থ-মোহ আর করোনা ক্রান্তিকাল।
What's Your Reaction?