ইতিহাস, অভিজ্ঞতা ও বাংলাদেশের জন্য আস্থার পরীক্ষা
ভোটাধিকার আধুনিক গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, তার একটি বড় সূচক হলো সে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ভোটাধিকার কতটা সহজলভ্য, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিশ্চিত করতে পারে। বাস্তবতার কারণেই বিশ্বের বহু দেশে বিকল্প ভোটদান পদ্ধতির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ডাকযোগে ভোট বা পোস্টাল ভোট সেই প্রয়োজনেরই একটি ফল। তবে এ পদ্ধতি যতটা সুযোগ তৈরি করে, ততটাই জটিল প্রশ্নও সামনে আনে, বিশেষ করে গোপনীয়তা ও আস্থার ক্ষেত্রে। পোস্টাল ভোটের ধারণাটি নতুন নয়। এর সূচনা উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাজ্যে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ব্যাপকতা এবং নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অবস্থানের বাস্তবতা থেকেই প্রথম ডাকযোগে ভোট প্রদানের ব্যবস্থা চালু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই পদ্ধতির ব্যাপক বিস্তার ঘটে। যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থানরত সেনাসদস্যদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বহু দেশ পোস্টাল ভোটকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। অর্থাৎ, পোস্টাল ভোটের জন্ম কোনো তাত্ত্বিক গণতান্ত্রিক পরীক্ষানিরীক্ষা থেকে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার চাপ থেকেই। পরবর্তীকালে ইউরোপের বিভিন
ভোটাধিকার আধুনিক গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, তার একটি বড় সূচক হলো সে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ভোটাধিকার কতটা সহজলভ্য, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে নিশ্চিত করতে পারে। বাস্তবতার কারণেই বিশ্বের বহু দেশে বিকল্প ভোটদান পদ্ধতির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ডাকযোগে ভোট বা পোস্টাল ভোট সেই প্রয়োজনেরই একটি ফল। তবে এ পদ্ধতি যতটা সুযোগ তৈরি করে, ততটাই জটিল প্রশ্নও সামনে আনে, বিশেষ করে গোপনীয়তা ও আস্থার ক্ষেত্রে।
পোস্টাল ভোটের ধারণাটি নতুন নয়। এর সূচনা উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাজ্যে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ব্যাপকতা এবং নৌবাহিনী ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অবস্থানের বাস্তবতা থেকেই প্রথম ডাকযোগে ভোট প্রদানের ব্যবস্থা চালু হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই পদ্ধতির ব্যাপক বিস্তার ঘটে। যুদ্ধক্ষেত্রে অবস্থানরত সেনাসদস্যদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বহু দেশ পোস্টাল ভোটকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। অর্থাৎ, পোস্টাল ভোটের জন্ম কোনো তাত্ত্বিক গণতান্ত্রিক পরীক্ষানিরীক্ষা থেকে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার চাপ থেকেই।
পরবর্তীকালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পোস্টাল ভোট একটি সীমিত কিন্তু স্বীকৃত ব্যবস্থায় পরিণত হয়। জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও নেদারল্যান্ডসের মতো দেশে ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলেও সেখানে ভোটার পরিচয় যাচাই এবং ব্যালট ব্যবস্থাপনার মধ্যে কঠোর কাঠামোগত বিচ্ছিন্নতা বজায় রাখা হয়। পরিচয় যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর ব্যালটগুলো দ্রুত বেনামি করা হয়, যাতে কোনো পর্যায়েই ভোটারের পরিচয়ের সঙ্গে ব্যালট যুক্ত করা না যায়। এই দেশগুলোতে পোস্টাল ভোট নিয়ে বিতর্ক থাকলেও প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতার কারণে সেটি বড় আকারের আস্থার সংকটে রূপ নেয়নি।
তবে ইউরোপীয় অভিজ্ঞতা এটাও দেখিয়েছে যে সামান্য প্রক্রিয়াগত ত্রুটিও বড় রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক সংকট তৈরি করতে পারে। অস্ট্রিয়ায় ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পোস্টাল ব্যালট খোলার সময় নিয়ম অনুসরণ না করার অভিযোগ ওঠে। শেষ পর্যন্ত দেশটির সাংবিধানিক আদালত পুরো নির্বাচন বাতিল করে পুনরায় ভোট গ্রহণের নির্দেশ দেয়। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, ব্যাপক জালিয়াতির প্রমাণ না থাকা সত্ত্বেও কেবল প্রক্রিয়াগত অনিয়মের আশঙ্কাই একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে যথেষ্ট ছিল।
যুক্তরাষ্ট্রে পোস্টাল বা মেইল-ইন ভোট বহুদিন ধরেই চালু, বিশেষ করে বিদেশে অবস্থানরত নাগরিক ও সামরিক সদস্যদের জন্য। তবে ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে ব্যাপকভাবে মেইল-ইন ভোট ব্যবহারের ফলে বিষয়টি তীব্র রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়। পরবর্তীকালে বিভিন্ন তদন্ত ও আদালতের রায়ে বড় ধরনের জালিয়াতির প্রমাণ না মিললেও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে, ভোট পদ্ধতির প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল হলে গণতন্ত্র কার্যত ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এমনকি আইনগতভাবে প্রক্রিয়া সঠিক হলেও। এই আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাগুলো একটি সাধারণ সত্য তুলে ধরে। পোস্টাল ভোটে প্রকৃত অনিয়ম না থাকলেও, অনিয়মের সম্ভাবনা ও প্রক্রিয়ার অসচ্ছতা মানুষের আস্থাকে দুর্বল করে দিতে পারে। আর গণতন্ত্রে আস্থা ক্ষুণ্ণ হওয়া মানেই পুরো ব্যবস্থার ভিত নড়ে যাওয়া।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পোস্টাল ভোট নতুন কোনো ধারণা নয়, তবে এর ব্যবহার দীর্ঘদিন ধরেই সীমিত ছিল। মূলত সশস্ত্র বাহিনী ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেই এ ব্যবস্থা সীমাবদ্ধ ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে পোস্টাল ভোটের আওতা সম্প্রসারণ এবং প্রবাসী নাগরিকদের জন্য ডাকযোগে ভোট চালুর উদ্যোগ বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। এ উদ্যোগ নীতিগতভাবে ইতিবাচক হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা প্রশ্ন সামনে এসেছে।
বাংলাদেশে নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা আস্থার সংকট এই আলোচনাকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। ভোটকেন্দ্রভিত্তিক নির্বাচন নিয়েই যেখানে সন্দেহ, অভিযোগ ও বিতর্ক রয়েছে, সেখানে পোস্টাল ভোটের মতো তুলনামূলকভাবে অদৃশ্য একটি পদ্ধতি চালু হলে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্টাল ভোট নিয়ে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও অভিযোগ, সেগুলো সত্য হোক বা না হোক, এই আস্থাহীনতার প্রতিফলন।
পোস্টাল ভোটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার জায়গা হলো ভোটারের স্বাধীনতা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করা। ভোটকেন্দ্রে সরাসরি ভোট দেওয়ার সময় নির্বাচন কর্মকর্তা, প্রার্থীর এজেন্ট ও পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি থাকে। পোস্টাল ভোটে সেই নজরদারি অনুপস্থিত। ফলে ভোটার নিজের ইচ্ছায় ভোট দিয়েছেন কি না, নাকি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা সামাজিক চাপের মধ্যে পড়েছেন, তা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই দুর্বলতা সব দেশেই রয়েছে, তবে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তা প্রক্রিয়াগত সুরক্ষার মাধ্যমে অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
বাংলাদেশে প্রবাসীদের ডাকযোগে ভোটের বর্তমান পদ্ধতিতে একটি গুরুতর কাঠামোগত প্রশ্ন সামনে এসেছে। ভোটার পরিচয় সংবলিত ঘোষণা ফরম ও ব্যালট সংবলিত খাম একই প্যাকেজে ব্যবহৃত হওয়ায় পরিচয় ও ব্যালটের মধ্যে কার্যকর বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে ব্যালট গ্রহণ, সংরক্ষণ বা গণনার কোনো পর্যায়েই ভোটার পরিচয়ের সঙ্গে ব্যালট যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করা যায় না। গণতন্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যা হলো, এমন কিছু বাস্তবে ঘটছে কি না, তা নয়; বরং ঘটতে পারার সুযোগ থাকাই গোপন ব্যালটের নীতির পরিপন্থি।
এই বাস্তবতায় পোস্টাল ভোট নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো যেমন দায়িত্বশীল আচরণ নয়, তেমনি সব প্রশ্নকে গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়াও গণতান্ত্রিক মনোভাবের পরিচয় নয়। প্রয়োজন হলো তথ্যভিত্তিক আলোচনা, ভোটার সচেতনতা এবং কাঠামোগত সংস্কার। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা দেখায়, পোস্টাল ভোট কার্যকর করা সম্ভব, তবে তার জন্য স্বচ্ছতা, কঠোর নিয়ম, পর্যবেক্ষণ এবং সর্বোপরি ভোটার পরিচয় ও ব্যালটের মধ্যে অটুট বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
পোস্টাল ভোট কোনো অপ্রয়োজনীয় বা অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়। বরং এটি ভোটাধিকার সম্প্রসারণের একটি প্রয়োজনীয় উপায়। তবে এ ব্যবস্থার সফলতা নির্ভর করে কতটা দক্ষতা, সততা ও বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে এটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তার ওপর। প্রক্রিয়াগত দুর্বলতা ও তথ্যের অস্পষ্টতা দূর করা না গেলে পোস্টাল ভোট শুধু অনিয়মের অভিযোগই নয়, পুরো নির্বাচনি ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। গণতন্ত্রের শক্তি কেবল ভোট দেওয়ার অধিকারে নয়, বরং সেই ভোট নাগরিক কতটা নির্ভয়ে, গোপনে ও মর্যাদার সঙ্গে দিতে পারছেন সেই নিশ্চয়তায়।
লেখক
ড. মো. হাছান উদ্দীন
অধ্যাপক, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, পটুয়াখালী
[email protected]
জেএইচ/এমএফএ/জেআইএম
What's Your Reaction?