ইতিহাসের ভাঙা-গড়ায় মুখর আলেপ্পো নগরী

মধ্যপ্রাচ্যের আলেপ্পো এমন ঐতিহাসিক এক নগরী, যেখানে হাজার বছরের বাণিজ্য, সংস্কৃতি, ধর্মীয় পরিবর্তন ও যুদ্ধের ইতিহাস মিশে আছে। বর্তমান সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এ শহরটি শুধু ভৌগোলিক দিক থেকে নয়, ইতিহাসের ধারাবাহিকতার দিক থেকেও এক অসাধারণ উদাহরণ। আলেপ্পোর ইতিহাস শুরু হয় আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে এখানে গড়ে ওঠে নগরজীবন। প্রাচীন নথি ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, এটা ছিল ঐতিহ্যবাহী সিল্ক রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। পূর্ব ও পশ্চিমের বণিকরা এখানে এসে মিলিত হতো, ফলে আলেপ্পো হয়ে ওঠে এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র। এ শহরের ওপর দিয়ে একের পর এক সাম্রাজ্য অতিক্রম করেছে। অ্যামোরাইট, হিট্টাইট, অ্যাসিরীয়, পারস্য প্রভৃতি প্রতিটি শাসনই শহরের চরিত্রে কিছু না কিছু ছাপ রেখে গেছে। পরে সেলিউসিড সাম্রাজ্যের সময়ে গ্রিক প্রভাব এসে মিশে যায় স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে। তবে এ দীর্ঘ পরিবর্তনের ভেতর দিয়েও আলেপ্পো তার বাণিজ্যিক গুরুত্ব কখনো হারায়নি। সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের বিস্তার এই অঞ্চলের ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলে। ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে বিখ্যাত সাহাবি খালিদ ইবনে ও

ইতিহাসের ভাঙা-গড়ায় মুখর আলেপ্পো নগরী

মধ্যপ্রাচ্যের আলেপ্পো এমন ঐতিহাসিক এক নগরী, যেখানে হাজার বছরের বাণিজ্য, সংস্কৃতি, ধর্মীয় পরিবর্তন ও যুদ্ধের ইতিহাস মিশে আছে। বর্তমান সিরিয়ার উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এ শহরটি শুধু ভৌগোলিক দিক থেকে নয়, ইতিহাসের ধারাবাহিকতার দিক থেকেও এক অসাধারণ উদাহরণ। আলেপ্পোর ইতিহাস শুরু হয় আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দে এখানে গড়ে ওঠে নগরজীবন। প্রাচীন নথি ও প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, এটা ছিল ঐতিহ্যবাহী সিল্ক রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল। পূর্ব ও পশ্চিমের বণিকরা এখানে এসে মিলিত হতো, ফলে আলেপ্পো হয়ে ওঠে এক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র।

এ শহরের ওপর দিয়ে একের পর এক সাম্রাজ্য অতিক্রম করেছে। অ্যামোরাইট, হিট্টাইট, অ্যাসিরীয়, পারস্য প্রভৃতি প্রতিটি শাসনই শহরের চরিত্রে কিছু না কিছু ছাপ রেখে গেছে। পরে সেলিউসিড সাম্রাজ্যের সময়ে গ্রিক প্রভাব এসে মিশে যায় স্থানীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে। তবে এ দীর্ঘ পরিবর্তনের ভেতর দিয়েও আলেপ্পো তার বাণিজ্যিক গুরুত্ব কখনো হারায়নি। সপ্তম শতাব্দীতে ইসলামের বিস্তার এই অঞ্চলের ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলে। ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে বিখ্যাত সাহাবি খালিদ ইবনে ওয়ালিদের নেতৃত্বে মুসলিম বাহিনী আলেপ্পো দখল করে। তবে এ দখল ছিল তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ; শহরটি দ্রুতই ইসলামী প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং নতুন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়। ইসলামী শাসনের অধীনে আলেপ্পো নতুন করে বিকশিত হয়। মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ ও বাজার সব মিলিয়ে শহরটি হয়ে ওঠে এক জীবন্ত নগরসভ্যতা। বণিক, আলেম, সুফি সবার পদচারণায় শহরটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।

দ্বাদশ শতাব্দীতে আলেপ্পো আবার ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসে, যখন ক্রুসেডের ঢেউ সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যকে আলোড়িত করছিল। এ সময়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল নাম সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী। আলেপ্পো তখন নানা মুসলিম শাসকের অধীনে বিভক্ত শক্তির অংশ ছিল। সালাহউদ্দিনের লক্ষ্য ছিল এ বিভক্ত শক্তিকে একত্রিত করা। ১১৮৩ সালে তিনি আলেপ্পো অবরোধ করেন। যদিও তাৎক্ষণিকভাবে শহরটি তার নিয়ন্ত্রণে আসে না, তবুও এটি ছিল বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এর কিছুদিন পরই ঘটে ইতিহাসখ্যাত হিত্তিনের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে সালাহউদ্দিনের কৌশল, ধৈর্য ও প্রাকৃতিক পরিস্থিতির সদ্ব্যবহার ক্রুসেডারদের পরাজিত করে। এর ফলে জেরুজালেম পুনর্দখলের পথ উন্মুক্ত হয়। আলেপ্পো তখন মুসলিম শক্তির পুনরুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।

আলেপ্পোর ইতিহাসে শান্তি কখনো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১২৬০ সালে হালাকু খানের মঙ্গোল বাহিনী শহরটি আক্রমণ করে। এ আক্রমণ ছিল অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক। শহরের জনজীবন, স্থাপত্য ও অর্থনীতি মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়। তবে ইতিহাসের ধারা বজায় রেখে আলেপ্পো বারবার ধ্বংস হয়ে আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। মঙ্গোলদের পর মামলুক সালতানাত শহরটির পুনর্গঠন করে। তাদের শাসনে আলেপ্পো আবারও বাণিজ্য ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তারপর ষোড়শ শতকে অটোমান সাম্রাজ্য শহরটি দখল করে এবং দীর্ঘ চার শতাব্দী ধরে এটি অটোমান প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে টিকে থাকে। এ সময়েই আলেপ্পোর বিখ্যাত বাজার, সরাইখানা ও স্থাপত্যের বিকাশ ঘটে, যা আজও ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে পরিচিত।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের সঙ্গে সঙ্গে আলেপ্পো এক নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশ করে। শহরটি ফরাসি ম্যান্ডেট সিরিয়ার অধীনে আসে। পরে স্বাধীন সিরিয়ার অংশ হিসেবে এটি আধুনিক রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে যুক্ত হয়। বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত আলেপ্পো ছিল সিরিয়ার অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্রগুলোর একটি। বিশেষ করে বাণিজ্য ও শিল্পে এর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে চলমান শতাব্দীতে আলেপ্পোর সবচেয়ে বড় বিপর্যয় আসে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে। ২০১২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত চলা আলেপ্পোর যুদ্ধ শহরটিকে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে। বিশেষ করে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত পুরোনো অঞ্চলগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সরু গলি, প্রাচীন বাজার, শতাব্দী প্রাচীন স্থাপত্য সবকিছুই যুদ্ধের আগুনে পুড়ে যায়। বিখ্যাত উমাইয়া মসজিদ আলেপ্পোর মিনার ধসে পড়ার মাধ্যমে যেন ইতিহাসের একটি অংশও ভেঙে পড়ছে।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর আলেপ্পো আবারও ধ্বংসের মধ্য থেকে পুনর্জন্ম নিতে চলেছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও স্থানীয় উদ্যোগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে বাজার, ঘরবাড়ি ও ধর্মীয় স্থাপনাগুলো সংস্কার করা হচ্ছে। যদিও কাজটি কঠিন, তবুও এটা শুধু স্থাপত্য পুনর্গঠন নয়, বরং মানুষের স্মৃতি ও ইতিহাসের পুনরুদ্ধার।

লেখক: মাদ্রাসা শিক্ষক

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow