ইমাম আবু হানিফার (রা.) প্রখর প্রজ্ঞার দুই ঝলক
উস্তাদ মোহাম্মদ বাজুর ইমাম আবু হানিফার (রহ.) মূল নাম নোমান ইবনে সাবেত। হিজরি ৮০ সনে তিনি কুফায় জন্মগ্রহণ করেন। ফিকহের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ চার ইমামের মধ্যে ইমাম আবু হানিফাই (রহ.) নবী করিমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যুগের সবচেয়ে নিকটবর্তী ছিলেন। চার ইমামের মধ্যে একমাত্র তিনিই তাবেঈ হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন। ‘তাবেঈ’ বলতে আমরা কী বুঝি? এর আগে জানা দরকার ‘সাহাবি’ কাদের বলা হয়? সাহাবি হলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি রাসুলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দেখেছেন, তাঁর ওপর ইমান এনেছেন, অর্থাৎ তাঁকে অনুসরণ করেছেন এবং মুসলিম হিসেবে ইন্তেকাল করেছেন। মক্কার মুশরিকরা বা মদিনার ইহুদিরাও তাঁকে দেখেছিল কিন্তু ইমান আনেনি, আবার অনেকে ইমান আনার পরও ইসলাম ত্যাগ করেছিল। সাহাবি তিনিই, যিনি তাঁকে দেখেছেন, বিশ্বাস করেছেন এবং মুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। আর তাবেঈ হলেন তিনি, যিনি কোনো সাহাবিকে দেখেছেন এবং মুসলিম হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছেন। ইমাম আবু হানিফা একজন সাহাবিকে নিজের চোখে দেখেছিলেন। এই কারণেই তাঁকে তাবেঈ বলা হয়। তাবেঈ হওয়াটা কেন এত সম্মানের? কারণ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস
উস্তাদ মোহাম্মদ বাজুর
ইমাম আবু হানিফার (রহ.) মূল নাম নোমান ইবনে সাবেত। হিজরি ৮০ সনে তিনি কুফায় জন্মগ্রহণ করেন। ফিকহের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ চার ইমামের মধ্যে ইমাম আবু হানিফাই (রহ.) নবী করিমের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যুগের সবচেয়ে নিকটবর্তী ছিলেন। চার ইমামের মধ্যে একমাত্র তিনিই তাবেঈ হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছিলেন।
‘তাবেঈ’ বলতে আমরা কী বুঝি? এর আগে জানা দরকার ‘সাহাবি’ কাদের বলা হয়? সাহাবি হলেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি রাসুলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দেখেছেন, তাঁর ওপর ইমান এনেছেন, অর্থাৎ তাঁকে অনুসরণ করেছেন এবং মুসলিম হিসেবে ইন্তেকাল করেছেন। মক্কার মুশরিকরা বা মদিনার ইহুদিরাও তাঁকে দেখেছিল কিন্তু ইমান আনেনি, আবার অনেকে ইমান আনার পরও ইসলাম ত্যাগ করেছিল। সাহাবি তিনিই, যিনি তাঁকে দেখেছেন, বিশ্বাস করেছেন এবং মুসলিম অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। আর তাবেঈ হলেন তিনি, যিনি কোনো সাহাবিকে দেখেছেন এবং মুসলিম হিসেবে মৃত্যুবরণ করেছেন।
ইমাম আবু হানিফা একজন সাহাবিকে নিজের চোখে দেখেছিলেন। এই কারণেই তাঁকে তাবেঈ বলা হয়। তাবেঈ হওয়াটা কেন এত সম্মানের? কারণ রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, মানুষের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ হলো আমার যুগের মানুষ, তারপর তাদের পরবর্তী যুগের মানুষ এবং তারপর তাদের পরবর্তী যুগের মানুষ। সুতরাং তাবেঈরা নবী (সা.) ও সাহাবিগণের পরে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রজন্মের মানুষ আর ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ছিলেন তাদের অন্যতম।
ইমাম আবু হানিফার (রহ.) বাবা সাবেত ছিলেন কুফার অত্যন্ত সুপরিচিত এবং বেশ বিত্তশালী একজন ব্যবসায়ী। তিনি যখন ইন্তেকাল করেন, তখন তাঁর একমাত্র সন্তান ইমাম আবু হানিফার জন্য প্রায় দুই লাখ দিরহাম রেখে যান। সে যুগের হিসাবটা একটু বুঝিয়ে বলি, তখন মাত্র তিন দিরহাম দিয়ে আস্ত একটা ভেড়া কেনা যেত। আজকের দিনে একটা ভেড়ার দাম কত হতে পারে? তিনশত বা চারশত ডলার? হিসাবের সুবিধার জন্য আমরা যদি ধরে নিই যে একটা ভেড়ার দাম তিনশত ডলার, তাহলে তৎকালীন দুই লাখ দিরহামের হিসাব দাঁড়ায় বর্তমানের প্রায় দুই কোটি ডলারের সমপরিমাণ।
সুতরাং ইমাম আবু হানিফার বাবা বিপুল সম্পত্তির অধিকারী একজন ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু এই বিপুল সম্পত্তির মধ্য থেকে ইমাম আবু হানিফা নিজের জন্য মাত্র চার হাজার দিরহাম রেখে বাকি সব সম্পদ দ্বীনের জ্ঞান অর্জনকারীদের উদ্দেশ্যে দান করে দিয়েছিলেন।
জীবনের প্রথম দিকে ইমাম আবু হানিফা (রহ.) নিজের ব্যবসা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকতেন। ইলম অর্জনে সময় কম দিতেন। ইমাম শা’বীর উৎসাহ তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ইমাম শা’বী একদিন ইমাম আবু হানিফাকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কার কার সাথে গিয়ে দেখা করেন? ইমাম আবু হানিফা উত্তর দিলেন, আমি তো বেশিরভাগ সময় বাজারের কেনাবেচাতেই সময় কাটাই। তিনি বললেন, না, না, আমি তো সেটা জানতে চাইনি। আমি জানতে চেয়েছি, আপনি কোন শায়খের মজলিসে বসেন? ইমাম আবু হানিফা বললেন, আল্লাহর কসম, আমি শায়খদের কাছে তেমন একটা যাই না। তখন তিনি বললেন, আপনাকে তো অত্যন্ত মেধাবী এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন একজন মানুষ মনে হয়। এভাবে উদাসীন হয়ে থাকবেন না। কোনো ইলমি মজলিস খুঁজে নিন এবং সেখানে যুক্ত হন।
ইমাম আবু হানিফা পরবর্তীকালে নিজেই এই ঘটনা উল্লেখ করে বলেছেন যে, ওই একটি কথা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। আমি বাজার ছেড়ে দিয়ে ইলমের মজলিসে যুক্ত হলাম।
তিনি তাঁর ইলমি জীবন শুরু করেছিলেন 'ইলমুল কালাম' বা যুক্তিতর্ক ও বিতর্কের মাধ্যমে। তিনি ইসলামকে যুক্তি দিয়ে রক্ষা করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। ওই যুগের অন্যতম সেরা বিতর্কিক হিসেবে তিনি মুসলিম দুনিয়ায় খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি মুতাজিলা ও খারেজিদের সাথে অনবরত বিতর্কে অংশ নিতেন।
এখানে আমি দুটি ঘটনা উল্লেখ করছি যা থেকে বোঝা যায় তিনি ইসলামি শরিয়তের ব্যাপারে কত গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন, কত প্রখর ছিল তার প্রজ্ঞা।
একবারের ঘটনা, প্রায় ৭০ জন খারেজি তলোয়ার উঁচিয়ে তাঁর ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। তারা তাঁকে হত্যা করতে চেয়েছিল, কারণ তারা তাঁকে কাফের মনে করত। খারেজিরা মনে করত যে কোনো ব্যক্তি যদি কোনো কবিরা গুনাহ করে, তবে সে কাফের হয়ে যায়। কেউ যদি মদ পান করে, তবে সে কাফের, কেউ যদি জিনা করে তবে সে কাফের। যারা এদেরকে কাফের মনে করে না তারাও কাফের। তাই তারা ইমাম আবু হানিফাকে কাফের গণ্য করেছিল।
তারা এসে বলল, হে ইমাম! তিনি বললেন, ‘আগে তোমাদের তলোয়ারগুলো খাপে ঢোকাও। তারপর তোমরা কী চাও বলো? তারা বলল, আমাদের সাথে দুটি জানাজা রয়েছে। একটি এমন পুরুষের, যে মদ খেতে খেতে মারা গেছে। অন্যটি এমন এক নারীর, যে ব্যভিচারের মাধ্যমে গর্ভবতী হয়ে আত্মহত্যা করেছে। এই মানুষগুলো জান্নাতে যাবে নাকি জাহান্নামে?
ইমাম আবু হানিফা তাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, তারা কি খ্রিস্টান, ইহুদি নাকি নাস্তিক ছিল? তারা কোন ধর্মের লোক ছিল? তারা উত্তর দিল, তারা ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ’ বলা মানুষদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা মুখে বলতে চাইছিল না যে তারা মুসলিম ছিল, তাই বলল তারা এই কলেমা পাঠকারীদের দলভুক্ত ছিল। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, যে কলেমার কথা তোমরা বললে, ইমানের কতটুকু অংশজুড়ে এই কলেমার অবস্থান? তারা বলল, পুরোটাই, এটাই হলো ইমানের সবটুকু।
তখন তিনি বললেন, আমি তোমাদের ঠিক সেভাবেই উত্তর দেব, যেভাবে ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) তাঁর সম্প্রদায়কে উত্তর দিয়েছিলেন। আমি তোমাদের ঠিক সেভাবেই উত্তর দেব, যেভাবে ঈসা (আলাইহিস সালাম) তাঁর সম্প্রদায়কে উত্তর দিয়েছিলেন। ইবরাহিম (আলাইহিস সালাম) শিরকে লিপ্ত নিজের সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার দলভুক্ত, আর যে আমার অবাধ্যতা করবে, হে আল্লাহ, তুমি তো পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু। অন্যদিকে ঈসা (আলাইহিস সালাম) শিরক করা নিজের সম্প্রদায় সম্পর্কে বলেছিলেন, হে আল্লাহ, এরা তো তোমারই বান্দা। তুমি যদি এদের শাস্তি দাও, তবে তা তোমার ইচ্ছা। আর তুমি যদি এদের ক্ষমা করো, তবে তুমি তো পরাক্রমশালী ও প্রজ্ঞাময়।
ইমাম আবু হানিফার এই প্রজ্ঞাপূর্ণ উত্তর শুনে সেই ৭০ জন খারেজি সাথে সাথে তওবা করল এবং তলোয়ার নামিয়ে ফিরে গেল।
আরেকটা ঘটনা বলি। তখন তিনি কুফায় অবস্থান করছিলেন। তিনি শুনলেন যে তাঁর এলাকায় অত্যন্ত প্রভাবশালী, সুপরিচিত এবং শিক্ষিত একজন মানুষ বাস করেন। কিন্তু লোকটার একটা বিরাট সমস্যা ছিল যে, সে হজরত উসমানকে (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) ভীষণ ঘৃণা করত। শুধু ঘৃণাই করত না, নাউযুবিল্লাহ, সে উসমানকে (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) ইহুদি বলে গালি দিত।
ইমাম আবু হানিফা যখন এই খবর শুনলেন, তখন তিনি সেই লোকটির সাথে দেখা করতে চাইলেন এবং তার বাড়ি গিয়ে হাজির হলেন। তিনি লোকটিকে বললেন, আমি শুনেছি আপনার একটি বিয়ের বয়সী মেয়ে আছে? লোকটি বলল, হ্যাঁ, আছে। তিনি বললেন, আমার নজরে একটি পাত্র আছে। ছেলেটি পুরো কোরআনের হাফেজ, সমাজে অত্যন্ত নামকরা এবং সে এক রাকাতেই পুরো কোরআন খতম করে ফেলে। দান-ধ্যানের ক্ষেত্রেও সে অত্যন্ত উদার। তবে তার একটা ছোট সমস্যা আছে।
লোকটি কৌতুহলী হয়ে বলল, কী সমস্যা? সুবহানআল্লাহ, এমন পাত্র তো আমার স্বপ্নের মতো! তার আবার কী সমস্যা থাকতে পারে? ইমাম আবু হানিফা বললেন, সে তো একজন ইহুদি! লোকটি চিৎকার করে উঠল, নাউযুবিল্লাহ! আমি কোনো অবস্থাতেই এমন লোকের কাছে আমার মেয়েকে বিয়ে দেব না! তখন ইমাম আবু হানিফা মুচকি হেসে বললেন, আপনার চেয়ে বহুগুণ উত্তম একজন মানুষ নিজের দুটি মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন আপনার চেয়ে এবং আমার চেয়ে উত্তম ব্যক্তি উসমানের (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) কাছে। সুতরাং তার ব্যাপারে আপনার মন্দ কথা বন্ধ করুন।
সেই দিনের পর থেকে ওই ব্যক্তি হজরত উসমানকে (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) ভালোবাসতে শুরু করেছিল।
সূত্র: উস্তাদ মোহাম্মদ বাজুর একজন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ, আলেম, শিক্ষক ও দাঈ। তিনি ইসলামি ধর্মতত্ত্ব, তরবিয়ত এবং সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে মননশীল ও হৃদয়গ্রাহী বয়ান দেওয়ার জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তিনি মূলত লেবানিজ বংশোদ্ভূত এবং দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। ইউটিউব চ্যানেল এপিক মসজিদ-এ প্রকাশিত তার ইংরেজি বক্তব্যের ভিডিও থকে লেখাটি তৈরি করা হয়েছে।
ওএফএফ
What's Your Reaction?