প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদকে ঘিরে মাদারীপুর শহরের শকুনি লেকপাড়ে মানুষের ঢল নেমেছে। সব বয়সের মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠেছে লেকের চারপাশ।
বুধবার (২ এপ্রিল) ঈদের তৃতীয় দিনেও লেকে গিয়ে ভিড় দেখা যায়। ঈদের দিন বিকেল থেকে শহরের পাশাপাশি উপজেলা ও গ্রাম থেকে মানুষ পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসছেন।
জানা যায়, মাদারীপুর জেলার এতিহ্যবাহী স্থানগুলোর মধ্যে শকুনি লেক অন্যতম। লেকপাড়ে শিশুপার্ক থাকায় শিশুদের কাছে পছন্দের জায়গা এটি। এছাড়া সেখানে আছে মাদারীপুর মিউজিয়াম, হরেক রকম খাবারের দোকান, খেলনা ও কসমেটিকসের দোকান। লেকের চারপাশে ১৪টির মতো রেস্টুরেট ও চা-কফির দোকান রয়েছে। ঈদকে ঘিরে এসব দোকানের বেচাকেনা বেড়ে যায়।
প্রতিবছর ঈদ, নববর্ষ ও পূজাসহ বিভিন্ন দিবসকে কেন্দ্র করে লেকপাড়ে মানুষের ঢল নামে। বিশেষ করে দুই ঈদের প্রায় এক সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মানুষের পদচারণা থাকে লেকপাড়ে। এতে এই লেকপাড় জেলার অন্যতম বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আশপাশের জেলা থেকেও এখানে ঘুরতে আসেন অনেকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, একসময় নগরায়নের প্রয়োজনে এই লেকটি খনন করা হয়। ২০১৭ সালে পৌরসভার তত্ত্বাবধানে সাড়ে ২২ কোটি টাকা ব্যয়ে লেকের সৌন্দর্যবর্ধন করা হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৩৭-৩৮ সালের দিকে পদ্মা ও আড়িয়ালখাঁ নদীর ভাঙা-গড়ায় যখন মাদারীপুর মূল শহরের অস্তিত্ব বিলীন হতে থাকে। তখন নতুন করে শহর স্থানান্তরের জন্য মাটির প্রয়োজনে ১৯৪২-৪৩ সালে এ লেক খনন করা হয়। সে সময় এ এলাকাটি ছিল জনমানবহীন ও বনজঙ্গলে ভরা একটি নিন্মভূমি। নদী ভাঙন কবলিত তৎকালীন মহকুমা শহরের কোর্ট-কাচারি, অফিস-আদালত, হাসপাতাল, থানা, জেলখানাসহ সরকারি কর্মকর্তাদের বাংলো স্থানান্তরের জন্য এই এলাকা বেছে নেওয়া হয়। কারণ সমতলে এসব স্থাপনা তৈরির জন্য প্রচুর মাটির প্রয়োজন হওয়ায় তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের মাদারীপুর মহকুমা প্রশাসন এই লেকটি খনন করে মাটির চাহিদা পূরণ করেন।
লেকে ঘুরতে আসা জাকারিয়া, তামিম, রফিক, নাঈম, হাসিবসহ কয়েকজন জানান, ঈদের ছুটিতে মাদারীপুরে এসেছি। তাই পরিবার নিয়ে এই শকুনি লেকপাড়ে ঘুরতে এসেছি। তবে এখানে আগের চেয়ে মানুষের অনেক ভিড় থাকছে। শান্তিতে ঘোরাঘুরি করতে পারছি না। তবুও লেকপাড়ে ঘুরতে আসি। এখানে ভ্রাম্যমাণ চটপটি, ফুচকাসহ রেস্টুরেন্টগুলোর খাবারের মান ভালো। তাই ঘুরতে এসে আমরা যে যার পছন্দমতো খাবার খেয়ে থাকি।
শিশুপার্কে ঘুরতে আসা এখলাস বলেন, স্কুল বন্ধ। তাই শিশুপার্কে বাবার সঙ্গে ঘুরতে এসেছি। শিশুপার্কে এলে আমার খুব ভালো লাগে।
মাদারীপুরের ইতিহাস গবেষক সুবল বিশ্বাস বলেন, চল্লিশের দশকে প্রচুর মাটির প্রয়োজনে বিশাল এই লেকটি খনন করা করতে প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক শ্রমিক এ অঞ্চলে না থাকায় তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার ভারতের বিহার ও উড়িষ্যা অঞ্চল থেকে দুই হাজার শ্রমিক আনা হয়। শ্রমিকরা ২০ একর জায়গার মাটি কেটে লেক খনন শুরু করেন। প্রায় ৯ মাসে লেকের খনন কাজ সম্পন্ন করা হয়। লেকের খনন কাজের শেষ মূহূর্তে কলেরায় সাত জন শ্রমিক মারা গেলে অন্যান্য শ্রমিক আতঙ্কিত হয়ে পড়েন ও কোনো এক রাতের অন্ধকারে পালিয়ে যান।
মাদারীপুরের স্থানীয় সংগঠন দেশগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা বজলুর রহমান খান বলেন, মাদারীপুরে শকুনি লেক হচ্ছে জেলার প্রাণ। এর সৌন্দর্য দেখার জন্য শহরবাসীর পাশাপাশি গ্রাম থেকেও মানুষ ঘুরতে আসেন। ঈদের ছুটির সময় লেকপাড়ে মানুষের ভিড় আরও বাড়ে।
আয়শা সিদ্দিকা আকাশী/এমএন/এএসএম