এ বছর ঘনঘন দুর্যোগের কারণ কী?

কখনো অসহ্য দাবদাহে পুড়ছে জনপদ, আবার কখনো মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে আধুনিক শহর। ২০২৬ সালে এসেও বাংলাদেশের মানুষের কাছে প্রকৃতি যেন এক অজানা আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের শুরু থেকে একের পর এক ঘূর্ণিঝড়, অসময়ে বন্যা এবং রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রার দাপট জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সাম্প্রতিক ‘গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট ২০২৬’-এ বিরূপ আবহাওয়াকে বর্তমান বিশ্বের এক নম্বর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ও জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ভয়াবহতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের এক চরম ও নিষ্ঠুর বহিঃপ্রকাশ। তপ্ত সমুদ্র ও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় এ বছর দুর্যোগ বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের উপরিভাগের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) ২০২৫-২০২৯ মেয়াদের জলবায়ু পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ সময়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আগের সব রেকর্ড ভেঙে দেওয়ার উচ্চ আশঙ্কা রয়েছে। সমুদ্রের পানি যত উষ্ণ হয়, লঘুচাপগুলো তত দ্রুত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমুদ্র

এ বছর ঘনঘন দুর্যোগের কারণ কী?

কখনো অসহ্য দাবদাহে পুড়ছে জনপদ, আবার কখনো মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে তলিয়ে যাচ্ছে আধুনিক শহর। ২০২৬ সালে এসেও বাংলাদেশের মানুষের কাছে প্রকৃতি যেন এক অজানা আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরের শুরু থেকে একের পর এক ঘূর্ণিঝড়, অসময়ে বন্যা এবং রেকর্ডভাঙা তাপমাত্রার দাপট জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) সাম্প্রতিক ‘গ্লোবাল রিস্ক রিপোর্ট ২০২৬’-এ বিরূপ আবহাওয়াকে বর্তমান বিশ্বের এক নম্বর দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ও জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই ভয়াবহতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের এক চরম ও নিষ্ঠুর বহিঃপ্রকাশ।

তপ্ত সমুদ্র ও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়

এ বছর দুর্যোগ বাড়ার অন্যতম প্রধান কারণ বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের উপরিভাগের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) ২০২৫-২০২৯ মেয়াদের জলবায়ু পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ সময়ে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আগের সব রেকর্ড ভেঙে দেওয়ার উচ্চ আশঙ্কা রয়েছে। সমুদ্রের পানি যত উষ্ণ হয়, লঘুচাপগুলো তত দ্রুত শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নেয়।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২৬ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলেই ঘূর্ণিঝড় তৈরির পরিবেশ তৈরি হয়। কিন্তু এ বছর বঙ্গোপসাগরের কোনো কোনো অংশে তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসও ছাড়িয়ে গেছে। ফলে আগে যেখানে বছরে দু-একটি মাঝারি মানের ঝড় আসত, এখন ঘনঘন তীব্র ও অতি-তীব্র ঘূর্ণিঝড় উপকূলীয় জনপদ তছনছ করে দিচ্ছে। সমুদ্রের উচ্চতা বাড়ায় জলোচ্ছ্বাসের মাত্রা ও লোনা পানির অনুপ্রবেশও বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে, যা উপকূলের কৃষি জমিকে চিরতরে ধ্বংস করে দিচ্ছে।

এল নিনো-লা নিনার অদ্ভুত খেলা

জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রশান্ত মহাসাগরের ‘এল নিনো’ ও ‘লা নিনা’ চক্রের ভারসাম্যহীনতা এ বছর দুর্যোগের তীব্রতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ট্র্যাকারের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই প্রাকৃতিক চক্রের অস্বাভাবিক পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের আর্দ্রতা ও বায়ুপ্রবাহের দিক বদলে গেছে। এর প্রভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ষা মৌসুমের আচরণ ওলটপালট হয়ে গেছে।

আরও পড়ুন>>
জলবায়ু সংকটে বিশ্ব/ ২০২৬ সালে ধেয়ে আসছে ভয়াবহ বন্যা
মেঘভাঙা বৃষ্টি কী? কেন এটি এত ভয়াবহ? কারণ ও প্রতিরোধের উপায়

আগে যে বৃষ্টিপাত তিন মাস ধরে হতো, এখন তা মাত্র কয়েকদিনে হয়ে যাচ্ছে। এতে মাটির পানি শোষণের ক্ষমতা কমে যাচ্ছে এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ছে।

অন্যদিকে, শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি খরা, যা বোরো ধানসহ রবি শস্যের ব্যাপক ক্ষতি করছে। এই পরিবর্তনগুলো আমাদের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার জন্য এক অশনি সংকেত।

হিমালয়ের কান্না ও উজান থেকে আসা পানি

বাংলাদেশের দুর্যোগের একটি বিশাল অংশ নির্ধারিত হয় হিমালয় অঞ্চলের পরিস্থিতির ওপর। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে হিমালয়ের বরফ প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত গলছে। ফলে গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকায় পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রসের (আইএফআরসি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে বন্যার ঝুঁকি ও প্রভাব আগের চেয়ে অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠেছে।

সম্প্রতি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট ও সুনামগঞ্জের হাওর এলাকায় হওয়া আগাম বন্যা এর বড় প্রমাণ। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির ফলে কৃষকের স্বপ্নের ফসল কাটার আগেই পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে নদী ভাঙন, যা প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষকে বাস্তুচ্যুত করছে।

মানুষের আত্মঘাতী পদক্ষেপ

দুর্ভোগের জন্য প্রকৃতিকে দোষারোপ করার আগে আমাদের নিজেদের কর্মকাণ্ডের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। জার্মানওয়াচের ‘ক্লাইমেট রিলেটেড রিস্ক ইনডেক্স’ অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ ১৩তম অবস্থানে রয়েছে।

নির্বিচারে বন উজাড়, পাহাড় কাটা এবং জলাশয় ভরাট করার ফলে এখানে প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার মতো মেগাসিটিগুলোতে কংক্রিটের জঙ্গল বেড়ে যাওয়ায় ‘হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব তৈরি হচ্ছে। শহরের জলাধারগুলো দখল হয়ে যাওয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই ভয়াবহ জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে, যা দিনশেষে জীবন ও সম্পদের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

সুন্দরবনের মতো প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেওয়ালগুলো দিন দিন মানুষের হস্তক্ষেপে দুর্বল হয়ে পড়ছে, যার ফলে ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা সরাসরি লোকালয়ে আঘাত হানছে।

বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রভাব

জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক প্যানেল আইপিসিসি (আইপিসিসি) তাদের প্রতিবেদনে আগেই সতর্ক করেছিল, বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্প বিপ্লব-পূর্ব সময়ের চেয়ে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়লে দুর্যোগ সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমরা এখন সেই সীমার খুব কাছাকাছি অবস্থান করছি।

প্রিভেনশন ওয়েবের তথ্যমতে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বন্যার কারণে এ বছর রেকর্ড পরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কার্বন নিঃসরণে বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমাদের সবচেয়ে বড় মূল্য চোকাতে হচ্ছে।

অভিযোজন ও আগাম প্রস্তুতিই বাঁচার পথ

প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়তো পুরোপুরি ঠেকানো সম্ভব নয়, কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টেকসই ও উঁচু বেড়িবাঁধ নির্মাণ, উপকূলীয় বনায়ন বৃদ্ধি এবং জলবায়ু-সহনশীল ফসলের চাষ এখন বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার অপরিহার্য অংশ। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও দুর্যোগ প্রস্তুতির আধুনিক প্রযুক্তি যেমন—আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম বা আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের ব্যবস্থা আরও জোরদার করতে হবে। এছাড়া নদী খনন ও নগরীর জলাধারগুলো দখলমুক্ত করতে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে।

২০২৬ সালের এই দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে, প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে মানুষ জিততে পারে না। এ অবস্থায় বিশ্বনেতৃত্বের কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতিগুলো যেমন বাস্তবায়ন জরুরি, তেমনি স্থানীয়ভাবে আমাদের পরিবেশ সচেতন হওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। নতুবা আগামী বছরগুলোতে দুর্যোগের এই মিছিল আরও দীর্ঘ হবে।

সূত্র: ডব্লিউএমও, প্রিভেনশন ওয়েব, আইএফআরসি, জার্মানওয়াচ
কেএএ/

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow