বাবা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। বাড়ির সামনের দোকানে চা বিক্রি করে সংসার চালান মা। এসব প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে এবার এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন ২.৯ ফুট উচ্চতার শিক্ষার্থী মল্লিকা খাতুন।
শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী মল্লিকা কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর সদর ইউনিয়নের পশ্চিম পানিমাছকুটি গ্রামের মনির হোসেন ও আকলিমা বেগম দম্পতির মেয়ে। তিনি ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজ (বিএম) শাখার শিক্ষার্থী। উপজেলার সাইফুর রহমান সরকারি কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছেন।
সচল স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় তার শারীরিক গঠন অনেক ছোট হওয়ায় চলাফেরা ও দৈনন্দিন কাজে তাকে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তার উপর দরিদ্র বাবা-মার সামান্য আয়ের সংসার। এতকিছুর পর কখনো হাল ছাড়েননি মল্লিকা। স্বজনদের সহযোগিতা ও নিজের দৃঢ় আত্মবিশ্বাসকে পুঁজি করে চালিয়ে যাচ্ছেন পড়াশোনা। ফলে এবার তিনি উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছেন।
মল্লিকার বাবা মনির হোসেন প্রায় পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি কোনো কাজ করতে পারেন না। মা আকলিমা বেগম বাড়ির সামনে একটি চায়ের দোকান চালিয়ে দৈনিক দুই থেকে তিনশ টাকা আয় করেন। তা দিয়েই চলে তাদের সংসার। মেয়ের স্বপ্ন পূরণে মা আকলিমার কষ্টের শেষ নেই। অর্থের অভাবে যেন মেয়ের স্বপ্ন পূরণ ব্যাহত না হয়, সেটাই তার একমাত্র প্রত্যাশা।
প্রতিবেশী আব্দুল মালেক ও মমিনুল ইসলাম জানান, মনির হোসেন খুবই গরিব, তার ওপর তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ। সংসারের সব ভার স্ত্রী আকলিমা ও তার ছোট্ট চায়ের দোকানের ওপর। প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে অত্যন্ত কষ্টে দিন কাটছে তাদের। সরকার বা সমাজের বিত্তবানরা অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়ালে প্রতিবন্ধী মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতো।
শিক্ষার্থী মল্লিকা খাতুন বলেন, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং মায়ের সামান্য আয়ে অভাব-অনটনের মধ্য দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। আমি উচ্চশিক্ষা অর্জন করে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। একজন স্বাবলম্বী মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে সমাজ ও দেশের কল্যাণে কাজ করতে চাই। পড়াশোনা শেষ করে একজন দক্ষ, আদর্শ ও মানবিক শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখি। জানি, আমাদের পথটা সহজ নয়। তবুও শত অভাব-অনটনের মধ্যেও স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমার এই স্বপ্ন পূরণে সবার সহযোগিতা ও দোয়া চাই।
মল্লিকার মা আকলীমা বেগম বলেন, আমাদের কোনো জমিজমা নেই, মাত্র সাত শতক জমির ওপর ছোট্ট একটি বাড়িই আমাদের একমাত্র সম্বল। বাড়ির পাশে ছোট্ট একটি দোকানে চা-বিস্কুট বিক্রি করে কোনোমতে সংসার চালিয়ে নিচ্ছি। আমার প্রতিবন্ধী মেয়ে মল্লিকার স্বপ্ন পড়াশোনা করে মানুষের মতো মানুষ হওয়া এবং নিজের পায়ে দাঁড়ানো। মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা সব সময় দুশ্চিন্তায় থাকি। সে হয়তো খুব বেশি মেধাবী নয়; কিন্তু তার অদম্য ইচ্ছাশক্তির ফলে সে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ ৪.৪৬ পেয়েছে। সে যেন এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফল করতে পারে, তার জন্য সকলের কাছে দোয়া চাচ্ছি।
ফুলবাড়ী ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ আমিনুল ইসলাম রিজু বলেন, মল্লিকা অন্য শিক্ষার্থীদের মতো স্বাভাবিক নয়। তবে তার অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ প্রশংসনীয়। বর্তমানে সে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, পরিবারের আর্থিক অসচ্ছলতা কোনো কিছুই তাকে আটকাতে পারেনি। আমরা প্রত্যাশা করি, মল্লিকার স্বপ্ন একদিন পূরণ হবে।
সাইফুর রহমান সরকারি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব জাকির হোসেন জানান, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নয়, মানুষের ইচ্ছাশক্তিই তাকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নেয়। মল্লিকা প্রতিবন্ধী হলেও সে অন্যান্য শিক্ষার্থীর মতোই নিয়মিত পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। তার এই অদম্য প্রত্যয় অন্য শিক্ষার্থীদেরও অনুপ্রাণিত করবে। তার স্বপ্ন পূরণ হোক, সব সময় এই প্রত্যাশা করি।