এখনো ইলা মিত্র: প্রান্তিক মানুষের আখ্যান

কথাসাহিত্যিক জাকির হোসেনের ‘এখনো ইলা মিত্র’ বইটি সাধারণ বাঙালির জীবনচিত্রের দারুণ প্রতিচ্ছবি। বইটিতে মোট নয়টি গল্প স্থান পেয়েছে। সমাজের নানা স্তরের মানুষ, তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, হাসি, কান্না এবং বঞ্চনার কথা লেখক খুব সহজ ভাষায় মলাটবদ্ধ করেছেন। কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস বইটির ফ্ল্যাপে যথার্থই বলেছেন, ‌‘লেখকের বাক্যগুলো মেদহীন এবং তার প্রতিটি শব্দ কথা বলে।’ গল্পগুলোর বিষয়বস্তু সত্যিই সুনির্বাচিত। ‘বোরোধান’ গল্পের কথা ধরা যাক। এখানে প্রান্তিক কৃষকের অসহায়ত্ব এতটাই প্রবলভাবে ফুটে উঠেছে যে, ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে এক কৃষক তার রক্ত ঘামে ফলানো ফসল নদীর পানিতে ফেলে দিতে বাধ্য হয়। নামগল্প ‘এখনো ইলা মিত্র’ আবাদি জমি রক্ষার তীব্র সংগ্রামের গল্প। আসমা নামের লড়াকু নারী কৃষকদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত করে এবং তাদের ন্যায্য দাবির পক্ষে আওয়াজ তোলেন। নারীদের জীবনসংগ্রাম ও সামাজিক রূঢ় বাস্তবতা বইটির অন্যতম প্রধান উপজীব্য। ‘চুতমারানি’ গল্পে একজন প্রবাসী নারী কর্মীর নিজের বাড়ি বানানোর সংগ্রাম এবং দেশে ফিরে নিজের সন্তানের কাছেই নিগৃহীত হওয়ার দৃশ্য পাঠকের মনকে নাড়া দেয়। ‘উদ্বাহু’ গল্পে কুসংস্কারাচ্ছন্ন সম

এখনো ইলা মিত্র: প্রান্তিক মানুষের আখ্যান

কথাসাহিত্যিক জাকির হোসেনের ‘এখনো ইলা মিত্র’ বইটি সাধারণ বাঙালির জীবনচিত্রের দারুণ প্রতিচ্ছবি। বইটিতে মোট নয়টি গল্প স্থান পেয়েছে। সমাজের নানা স্তরের মানুষ, তাদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, হাসি, কান্না এবং বঞ্চনার কথা লেখক খুব সহজ ভাষায় মলাটবদ্ধ করেছেন। কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস বইটির ফ্ল্যাপে যথার্থই বলেছেন, ‌‘লেখকের বাক্যগুলো মেদহীন এবং তার প্রতিটি শব্দ কথা বলে।’

গল্পগুলোর বিষয়বস্তু সত্যিই সুনির্বাচিত। ‘বোরোধান’ গল্পের কথা ধরা যাক। এখানে প্রান্তিক কৃষকের অসহায়ত্ব এতটাই প্রবলভাবে ফুটে উঠেছে যে, ধানের ন্যায্য দাম না পেয়ে এক কৃষক তার রক্ত ঘামে ফলানো ফসল নদীর পানিতে ফেলে দিতে বাধ্য হয়। নামগল্প ‘এখনো ইলা মিত্র’ আবাদি জমি রক্ষার তীব্র সংগ্রামের গল্প। আসমা নামের লড়াকু নারী কৃষকদের অধিকার আদায়ে সংগঠিত করে এবং তাদের ন্যায্য দাবির পক্ষে আওয়াজ তোলেন।

নারীদের জীবনসংগ্রাম ও সামাজিক রূঢ় বাস্তবতা বইটির অন্যতম প্রধান উপজীব্য। ‘চুতমারানি’ গল্পে একজন প্রবাসী নারী কর্মীর নিজের বাড়ি বানানোর সংগ্রাম এবং দেশে ফিরে নিজের সন্তানের কাছেই নিগৃহীত হওয়ার দৃশ্য পাঠকের মনকে নাড়া দেয়। ‘উদ্বাহু’ গল্পে কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজে একজন বিধবা নারীর বেঁচে থাকার লড়াই ফুটে উঠেছে। আবার ‘বিশুদবার’ গল্পে শহরের কর্পোরেট জীবনের ব্যস্ততা কীভাবে স্বামী-স্ত্রীর একান্ত সময়গুলোকে কেড়ে নেয়, তার একটি মনস্তাত্ত্বিক চিত্র পাওয়া যায়।

বইয়ের একেবারে শেষের গল্প ‘সোনালি টকিজ’ একটি অনবদ্য সৃষ্টি। ব্যক্তিগতভাবে এটি আমার সবচেয়ে পছন্দের গল্প। মৃত্যুর আগে আশি বছরের বৃদ্ধ কদর আলীর শেষ ইচ্ছা থাকে সিনেমা হলে গিয়ে ছবি দেখার। এই ইচ্ছাকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ সমাজের নানা মানুষের প্রতিক্রিয়া এবং একইসাথে আমাদের হারিয়ে যাওয়া সিনেমা হলের সোনালি অতীতের নস্টালজিয়া লেখক খুব নিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। গল্পটি পড়ার পর দীর্ঘস্থায়ী একটা রেশ থেকে যায়।

লেখক জাকির হোসেনের জন্ম এবং বসবাস চট্টগ্রামে হলেও তার আদি নিবাস ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে। সেই সুবাদে তার গল্পে গ্রামীণ পটভূমি এবং চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার চমৎকার ব্যবহার দেখা যায়। গল্পগুলোর আকার খুব বেশি বড় নয়, ফলে এক বসাতেই পড়ে ফেলা যায়। যারা জীবনের খুব কাছাকাছি থাকা মাটির গন্ধমাখা গল্প পড়তে ভালোবাসেন, তাদের জন্য ‘এখনো ইলা মিত্র’ দারুণ সংগ্রহ হতে পারে। পাঠকদের বাংলা ছোটগল্পের এই মোহন সভায় স্বাগত জানানো যেতেই পারে।

বইয়ের নাম: এখনো ইলা মিত্র
লেখক: জাকির হোসেন
প্রকাশক: চন্দ্রবিন্দু
প্রকাশকাল: বইমেলা ২০২৫
মূল্য: ২৫০ টাকা।

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow