কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ১

১৫ জুলাই, রাত সাড়ে দশটা। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশে ব্যাপক কোলাহল, হকারদের হাকডাক, মাথাবোঝাই মাল নিয়ে ছুটছেন কুলিরা, যাত্রীদের ওঠা-নামা। দূরপথের যাত্রীদের চোখেমুখে একটা ছটফট ভাব, ঝিকঝিক শব্দ ছেড়ে এই বুঝি রেলগাড়ি ছুটলো। অন্ধকার এই রাতেও স্টেশনপাড়াতে চরম ব্যস্ততা। ফেরার তাড়াহুড়ো নেই শুধু ঘরছাড়া নিঃসঙ্গ মানুষগুলোর! ঘণ্টাখানেক বাদেই লোহার চাকা ঘুরিয়ে গন্তব্যে ছুটবে বেনাপোল এক্সপ্রেস। হাতে এখনো ৬০ মিনিট সময় আছে। ঘড়ির কাঁটা শেষ গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই হাতের কিছু কাজ সম্পন্ন করতে হবে। ট্রেনে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ফুড সার্ভিস অভিজ্ঞতা বেশ তিক্ত। অবশ্য রেলওয়েকে কিছু বলে ‍উপায়ও নেই। কারণ শুনেছি, সরকার ইজারার মাধ্যমে ঠিকাদারদের দায়িত্ব দেয়। তারাই মূলত ঝামেলাটা বাঁধায়! খাবারের চড়া মূল্য রাখলেও যাত্রীদের মানসম্পন্ন খাবার পরিবেশন করেন না। ঢাকা থেকে বগুড়া যাওয়ার পথে কয়েকবার এ অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে। আমি আবার এমন মানুষ, যে দ্বিতীয়বার বেলতলায় যেতে মোটেও ইচ্ছুক নই। পুরোনো অভিজ্ঞতার কারণেই স্টেশনের বাইরে থাকা খাবারের বুথ থেকে কিছু স্ন্যাকস, বেকারি পণ্য, সফট ড্রিংকস আর পানি নিয়ে নি

কলকাতা ভ্রমণের দিনগুলো: পর্ব ১

১৫ জুলাই, রাত সাড়ে দশটা। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে আছি। চারপাশে ব্যাপক কোলাহল, হকারদের হাকডাক, মাথাবোঝাই মাল নিয়ে ছুটছেন কুলিরা, যাত্রীদের ওঠা-নামা। দূরপথের যাত্রীদের চোখেমুখে একটা ছটফট ভাব, ঝিকঝিক শব্দ ছেড়ে এই বুঝি রেলগাড়ি ছুটলো। অন্ধকার এই রাতেও স্টেশনপাড়াতে চরম ব্যস্ততা। ফেরার তাড়াহুড়ো নেই শুধু ঘরছাড়া নিঃসঙ্গ মানুষগুলোর!

ঘণ্টাখানেক বাদেই লোহার চাকা ঘুরিয়ে গন্তব্যে ছুটবে বেনাপোল এক্সপ্রেস। হাতে এখনো ৬০ মিনিট সময় আছে। ঘড়ির কাঁটা শেষ গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই হাতের কিছু কাজ সম্পন্ন করতে হবে। ট্রেনে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ফুড সার্ভিস অভিজ্ঞতা বেশ তিক্ত। অবশ্য রেলওয়েকে কিছু বলে ‍উপায়ও নেই। কারণ শুনেছি, সরকার ইজারার মাধ্যমে ঠিকাদারদের দায়িত্ব দেয়। তারাই মূলত ঝামেলাটা বাঁধায়! খাবারের চড়া মূল্য রাখলেও যাত্রীদের মানসম্পন্ন খাবার পরিবেশন করেন না। ঢাকা থেকে বগুড়া যাওয়ার পথে কয়েকবার এ অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে। আমি আবার এমন মানুষ, যে দ্বিতীয়বার বেলতলায় যেতে মোটেও ইচ্ছুক নই।

পুরোনো অভিজ্ঞতার কারণেই স্টেশনের বাইরে থাকা খাবারের বুথ থেকে কিছু স্ন্যাকস, বেকারি পণ্য, সফট ড্রিংকস আর পানি নিয়ে নিলাম। একটা পলিব্যাগে সেসব নিয়ে হেঁটেই চেকিং পয়েন্টের দিকে এগোলাম। যাত্রা টিকিট দেখতে চাইলেন নিরাপত্তা প্রহরীরা। প্রিন্ট করা কাগজের কপি নেই। মোবাইলে ডাউনলোড করা পিডিএফ কপি আছে জানালাম। সেটিই খুটিয়ে খুটিয়ে পরখ করলেন এক কর্মকর্তা। ইদানিং নাকি পিডিএফ কপিতে অসদোপায় অবলম্বন করে ট্রেনে যাত্রা করছেন গুটিকয়েক মানুষ। এতে যাত্রী লাভবান হলেও রেলওয়ের ক্ষতি হচ্ছে। বছরে বছরে ভর্তুকি গুনতে হচ্ছে সরকারকে।

চেকিং সম্পন্ন করে শহরতলি প্ল্যাটফর্মের দিকে পা বাড়িয়েছি। এটা ১৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত। স্টেশনের বাইরে যতটা ব্যস্ততা, প্ল্যাটফর্মের ভেতরটায় অবশ্য ততটা কোলাহল নেই। বিশালাকৃতির বিমের পাশে যাত্রীদের বসার আসন পাতা হয়েছে। সময় বিবেচনায় একদল আসন ছাড়ছে, অন্যদল পলেস্তারা করা সেই আসনে বসছেন। তাদের মাথার ওপর কড়কড় করে ফ্যান ঘুরছে।

কয়েক বর্ষায় প্ল্যাটফর্মের দৃশ্যপট অনেক বদলেছে। ডিজিটাল ব্যানারে বিজ্ঞাপন চলছে, যাত্রীদের রিমাইন্ডার হিসেবে মাইকে ভেসে আসছে নারীকণ্ঠ, বড় ডিজিটাল বোর্ডে ট্রেনের নাম, প্ল্যাটফর্ম, সময় আর গন্তব্য ভেসে উঠেছে।

ষাটের দশকের শুরুতেই কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের কাজ শুরু হয়। ৮ বছর পর ১৯৬৮ সালে স্টেশনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। মার্কিন স্থপতি ড্যানিয়েল ডানহাম ও রবার্ট বাউগির নকশায় দেশের ব্যস্ততম ও সবচেয়ে বড় রেলস্টেশনটি যাত্রা শুরু করে। কয়েক দশকের ব্যবধানে সাদামাটা স্টেশনটার রূপ অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যাত্রীদের আধুনিক সেবা দেওয়ার প্রয়াসই করেছে রেলওয়ে।

প্ল্যাটফর্মে পৌঁছতেই চোখে পড়লো বেশ লম্বা একটা ট্রেন। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই প্ল্যাটফর্মে হাজির বেনাপোল এক্সপ্রেস। আধুনিক শ্রেণির এই ট্রেনেই দর্শনা হল্টে রওয়ানা করবো। টিকিট দেখে বগির সামনে এসে দাঁড়িয়েছি। বগিতে প্রবেশের আগে বোকাবাক্সে নিজের একটা স্থিরচিত্র বন্দি করলাম। এতদূর তো সবকিছু ঠিকই ছিল। ঝামেলা বাঁধলো নিজের সিট খুঁজতে গিয়ে। ট্রেন ছাড়বে ৫ থেকে ৭ মিনিটের মধ্যে। চিন্তায় তো খেই হারিয়ে ফেললাম। কপালজুড়ে ঘামের আনাগোনা টের পেলাম। অবস্থাটা এমন বিনা মেঘে বজ্রপাত হওয়ার কাণ্ড।

ট্রেনে ওঠার আগে সবুজ নামের এক যুবকের হাতে নিজের ছবি তুলেছিলাম। তড়িঘড়ি করে গেটের কাছে এসে তাঁকে বললাম, ‌‘ভাই আমার সিট খুঁজে পাচ্ছি না, আপনার সাহায্য প্রয়োজন।’ সঙ্গে সঙ্গে সবুজ ট্রেনে উঠে এলো। দেবদূতের মতো কয়েক মুহূর্তেই আমার আসন খুঁজে দিলো। তাকে লম্বা একটা ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম। সেসময় অবশ্য তাকে বলেছিলাম, ‘বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে।’ দুই বছরের বেশি হতে চললো আজও তার দেখা পাইনি।

সারাদিন অফিস করেছি। বিন্দুমাত্র বিশ্রামের সুযোগ পাইনি। ৪৮০ টাকার টিকিটে শোভন চেয়ারে যাত্রা করছি। ‘ঝ’ বগির শেষ দিক থেকে তৃতীয় লাইন। পাশে পেয়েছি মাঝবয়সী এক যুবককে। ঢাকায় গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ করেন। গন্তব্য যশোর। তবে তার সঙ্গে ভাবটা বেশ জমলো না। কিন্তু মনটা ফুরফুরে! জানালার পাশে সিট পেয়েছি। মাথার ওপরের র‌্যাকে মাঝারি আকৃতির নীল রঙের লাগেজ তুলে দিলাম। লুঙ্গি, হাফ প্যান্ট আর কয়েকটা হালকা কাপড় আছে। বাঙালি পোশাকের পাশাপাশি কিছু জিন্স আইটেমও ছিল। আর একটা মাত্র বই ‘হ্যারি পটার: এন্ড দ্য চেম্বারস অব সিক্রেটস’ নিয়েছি।

এই নীল লাগেজের হ্যান্ডিতে সাদা ফ্লুয়েড কালিতে ‘আশরাফুল’ লেখা। সঙ্গে মোবাইল নম্বর। কোনো কারণে লাগেজ মিসিং হলে শেষ আশ্রয় এই নম্বর। কোনো হৃদয়বান মানুষের হাতে পড়লে যেন লাগেজটা ফেরত দিতে পারেন। পরিকল্পনাটা দিয়েছিলেন সরকারি চাকরির সন্ধানে থাকা আবুল বাশার। তার কথামতোই কাজটা করেছি।

লাগেজ রেখে কাঁধ থেকে মিনি ব্যাগটা সরিয়ে হাতে নিলাম। এই ব্যাগেই ভারতীয় ভিসা, পাসপোর্ট, প্রয়োজনীয় কাগজের ফাইল, পাওয়ার ব্যাংক, মোবাইল চার্জার, চাইনিজ ব্র্যান্ডের একটা গিম্বল, মাইক্রোফোন আর লাইট সেলফি স্ট্যান্ড। এই স্ট্যান্ড ব্যবহার করেই সিটি অব জয়ের নানা অবকাঠামোর ফেক ড্রোন শট ফ্রেমবন্দি করবো। স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে দেখেছিলাম হাজার হাজার টাকা খরচ না করেও পাখির চোখে ফুটেজ নেওয়া সম্ভব। সেই ভাবনা থেকেই বেশ বড়সড় সেলফি স্ট্যান্ড নেওয়া। এটার সুবিধা কাজ শেষে ফোল্ড করে ব্যাগবন্দি করা যায়।

বেনাপোল এক্সপ্রেস সাধারণত রাত সাড়ে ১১টায়ই ঢাকা ছেড়ে যায়। তবে আজ ১২ বগির এই ট্রেনের চাকা ঘুরতে কয়েক মিনিট বিলম্ব হয়েছে। অবশ্য খুব বেশি সময় নষ্ট হয়নি। কিছুক্ষণের মধ্যেই জোরে কয়েকটা শব্দ হাঁকিয়ে ট্রেনের ইঞ্চিন চালু হলো। যাত্রা শুরু হলো।

ট্রেন ছেড়েছে মিনিট বিশেক হলো। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী আর রেলওয়ে পুলিশের ছোটাছুটিতে বোঝা গেল, টিকিট চেক হবে। বড়কর্তার আগমন হয়েছে। টিকিট চেক হবে। তারই পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে রাউন্ড শুরু হয়েছে। আন্তঃনগর ট্রেনে যাত্রার অভিজ্ঞতা থাকলে এ দৃশ্য পুরোনো।

কয়েকটি কামড়া পেরিয়ে ‘ঝ’ বগিতে সহকারীসহ হাজির টিটি। অস্ত্র-লাঠি হাতে রেলওয়ে পুলিশও আছে। সাদা কোট আর বেশভূষায় বড়কর্তাকে সহজেই চেনা গেল। টিকিট চেকিংয়ে তিনি কিছু করছেন না। পায়চারি করে সামনে এগোনোই তার কাজ। যা কাজ করার সহকারী করছেন। বগিতে পা রেখেই দুজন যাত্রীর হাতে স্ট্যান্ডিং টিকিট ধরিয়ে দিয়েছেন। সঙ্গে একটা সতর্ক বার্তাও দেওয়া হলো। আইন-কানুন বুঝিয়ে সবার টিকিট চেক করে বগি ছাড়লেন সবাই।

দর্শনা হল্টে নামার আগে আর কোনো চেকিং ঝামেলা নেই। এখন একটা কাজ বাকি। সারাদিনের ক্লান্তি দূর করা। কাঁধের ব্যাগ পায়ের ফাঁকে রেখে ঘুমে হারালাম।

ট্রেন চলছে...

এসইউ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow