বন কখনো পুরোপুরি নীরব থাকে না। শান্ত দুপুরেও কোথাও না কোথাও পাখির ডাক শোনা যায়। তবে এসব ডাক শুধু সময় কাটানোর জন্য নয়। পাখিদের প্রতিটি ডাক, সুর কিংবা শব্দের ভেতর লুকিয়ে থাকে বিশেষ বার্তা; যার অনেকটাই এতদিন মানুষের অজানা ছিল।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা পাখিদের এই রহস্যময় আচরণের কিছু অংশ বুঝতে সক্ষম হয়েছেন। আর অবাক করার বিষয় হলো, বছরের পর বছর জঙ্গলে ঘুরে গবেষণা না করে তারা এই তথ্য পেয়েছেন ‘আড়ি পেতে’।
গবেষকেরা বনজুড়ে ছোট ছোট মাইক্রোফোন বসিয়ে হাজার হাজার ঘণ্টার শব্দ রেকর্ড করেন। সেই শব্দ বিশ্লেষণ করেই তারা বুঝতে চেষ্টা করেছেন, বনের পাখিরা বিপদ টের পেলে কীভাবে আচরণ বদলায় এবং জীবন-মৃত্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানবিষয়ক জার্নাল ইকোলজি-তে।
শিকারি পাখির ডাক শুনলে বদলে যায় আচরণ
কর্নেল ল্যাব অব অর্নিথোলজির গবেষকেরা ক্যালিফোর্নিয়ার সিয়েরা নেভাদা অঞ্চলের বিভিন্ন বনে মাইক্রোফোন বসান। মূলত পাখির বৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণের জন্য শুরু হওয়া এই প্রকল্প থেকেই নতুন তথ্য উঠে আসে।
এর আগে বিজ্ঞানীরা মাইক্রোফোন ব্যবহার করলেও সাধারণত সেটি দিয়ে শুধু বোঝার চেষ্টা করা হতো, কোন এলাকায় কোন প্রজাতির পাখি আছে। কিন্তু কর্নেলের গবেষকেরা আরও গভীরে যেতে চেয়েছেন। তারা শত-শত হাজার ঘণ্টার শব্দ বিশ্লেষণ করে বোঝার চেষ্টা করেন, শিকারি পাখি ‘আমেরিকান গসহক’-এর ডাক শুনে অন্য পাখিরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়।
গবেষণায় ‘বার্ডনেট’ নামে একটি মেশিন লার্নিং টুল ব্যবহার করা হয়। এটি শব্দ শুনে পাখির প্রজাতি শনাক্ত করতে পারে। একই সঙ্গে আমেরিকান গসহকের ডাকও যাচাই করা হয়।
গবেষকেরা লক্ষ্য করেন, গসহকের ডাক শোনার পর অন্য পাখিরা সাধারণত কম ডাকতে ও গান গাইতে শুরু করে। তবে এই প্রতিক্রিয়া সব জায়গায় একরকম ছিল না। সিয়েরা নেভাদার দক্ষিণাঞ্চলের পাখিরা উত্তরাঞ্চলের পাখিদের তুলনায় গসহকের উপস্থিতিতে আরও বেশি চুপ হয়ে যেত।
ছোট্ট চিকাডি পাখির কঠিন সিদ্ধান্ত
গবেষণায় ‘মাউন্টেন চিকাডি’ নামের ছোট এক ধরনের গানের পাখির আচরণও বিশ্লেষণ করা হয়। এই পাখিরা সাধারণত ‘ফি-বি’ ধরনের সুর ব্যবহার করে সঙ্গী আকর্ষণ ও নিজেদের এলাকা চিহ্নিত করতে। আবার বিপদ টের পেলে তারা ‘চিকাডি-ডি’ নামে বিশেষ সতর্ক সংকেত দেয়, যা অন্য পাখিদের সাবধান করে এবং শিকারিকে ভয় দেখানোর কাজও করে।
গবেষকেরা দেখেছেন, গসহকের ডাক শোনামাত্র এই ছোট্ট পাখিগুলো গান বন্ধ করে সতর্কবার্তা দেওয়া শুরু করে। তবে সেটিও সব জায়গায় নয়। যেসব এলাকায় গাছের নিচের অংশে ঝোপঝাড় কম ছিল, সেখানে চিকাডিরা বেশি গান গাইত। কিন্তু গসহকের উপস্থিতি টের পেলেই তারা দ্রুত নিজেদের আচরণ বদলে ফেলত এবং গান ছেড়ে সতর্ক সংকেতে চলে যেত।
গবেষকদের ধারণা, এই পাখিরা এক ধরনের ‘ঝুঁকি-হিসাব’ করে। অর্থাৎ, একদিকে তারা নিজেদের এলাকা রক্ষা করতে চায়, অন্যদিকে শিকারির হাত থেকেও বাঁচতে চায়।
ছোট্ট মাইক্রোফোন যেভাবে বদলে দিল গবেষণা
কর্নেল ল্যাব অব অর্নিথোলজির গবেষক ও এই গবেষণার সহলেখক কনর উড বলেন, সিয়েরা নেভাদাজুড়ে শত শত মাইক্রোফোন বসিয়ে তারা পাখিদের আচরণের সূক্ষ্ম কিছু ধরণ বুঝতে পেরেছেন।
তার ভাষায়, পাখিরা যেন ভাবছে ‘এটি ভালো বাসা বাঁধার জায়গা, তাই এখানে বেশি গান গাইব। কিন্তু এখানেই আমি শিকারির কাছে বেশি দৃশ্যমান। তাই গসহকের ডাক শুনলেই সতর্ক সংকেতে চলে যেতে হবে।’
গবেষণার প্রধান লেখক মিকি পার্ডো বলেন, এ ধরনের সূক্ষ্ম আচরণ প্রচলিত মাঠপর্যায়ের গবেষণায় ধরা খুব কঠিন। কিন্তু বনজুড়ে বসানো মাইক্রোফোন কোনো মানব পর্যবেক্ষক ছাড়াই বিশাল এলাকা থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে।
গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতে পাখি গবেষণায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কারণ তুলনামূলক কম খরচে বিশাল পরিসরের আচরণগত তথ্য সংগ্রহ সম্ভব হচ্ছে।
কনর উড আরও বলেন, পাখিদের আচরণ সঠিকভাবে বুঝতে পারা সংরক্ষণ কার্যক্রমের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের আচরণের ওপর ভিত্তি করেই বিজ্ঞানীরা অনেক সময় নির্ধারণ করেন, কোন এলাকায় তারা আছে বা কীভাবে টিকে আছে। আর শব্দ রেকর্ডিং সেই কাজকে আরও নির্ভুল করতে সাহায্য করতে পারে।
তথ্যসূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া