অনিয়ম, ঘুষ, লাইসেন্স ভাড়া ও বিপুল রাজস্ব ফাঁকির এক অগোছালো জালে বন্দি দেশের মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন ব্যবস্থা। সরকারের নামে কোটি কোটি টাকা কমিশন আদায় হলেও সেই অর্থের ১ শতাংশও রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে লাইসেন্স বাণিজ্য, রাজনৈতিক সুপারিশ, ভুয়া প্রতিনিধি নিয়োগ এবং আয়কর ফাঁকির মতো নানা অনিয়মে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে পুরো নিকাহ নিবন্ধন ব্যবস্থা।
আইন মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও কালবেলার অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) রয়েছেন প্রায় ৬ হাজার। গড়ে একজন কাজির মাসিক আয় প্রায় ২ লাখ টাকা হিসেবে বছরে এ খাতে মোট লেনদেন বা আয় দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। অথচ বিয়ের সময় সরকারের নামে কমিশন বা নিবন্ধন ফি আদায় করা হলেও সেই অর্থের ১ শতাংশও সরকারি কোষাগারে জমা পড়ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। অনিয়মের এখানেই শেষ নয়; লাখ লাখ টাকার ঘুষ-বাণিজ্য ও রাজনৈতিক সুপারিশে লাইসেন্স পাওয়া এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। অনৈতিকভাবে নিয়োগ পাওয়া এসব কাজি আবার ভুয়া প্রতিনিধি নিয়োগ দিয়ে নিজের ‘কমিশনটা’ ঠিকই আদায় করে নিচ্ছেন। কিন্তু সরকারের ন্যায্য পাওনাটা দিতে তাদের অনীহা।
বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী, দেনমোহরের প্রথম ৫ লাখ টাকার ক্ষেত্রে প্রতি ১ হাজার টাকায় ১৪ টাকা হারে নিবন্ধন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু এই অর্থ আদায়ের পর তার কতটুকু সরকার পাচ্ছে, সে বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের কাছেও কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কাজিদের বার্ষিক ফি বা কমিশন জমার হিসাব সংরক্ষণের দায়িত্ব তাদের নয়।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, একজন কাজি হতে জেলা পর্যায়ে ৩ থেকে ১০ লাখ এবং রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। পাশাপাশি রাজনৈতিক সুপারিশ ছাড়া লাইসেন্স পাওয়া কঠিন বলেও জানিয়েছেন একাধিক নিবন্ধিত কাজি। অভিযোগ রয়েছে, মন্ত্রণালয়, জেলা রেজিস্ট্রি অফিস এবং বিভিন্ন পর্যায়ে নিয়মিত মাসোহারা ও সমিতির নামে চাঁদাও দিতে হয়।
এদিকে অনেক নিবন্ধিত কাজি নিজে দায়িত্ব পালন না করে লাইসেন্স ভাড়া দিয়ে প্রতিনিধি দিয়ে কাজ করাচ্ছেন। কোথাও কোথাও একটি নিবন্ধন নম্বর ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তি বিবাহ নিবন্ধনের কাজ করছেন, যদিও আইনে এমন কোনো সুযোগ নেই। এতে মাঠপর্যায়ে জবাবদিহি ও তদারকি মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সরকারের করনীতি অনুযায়ী, বছরে ৪ লাখ টাকার বেশি আয় হলে আয়কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ঢাকার অভিজাত এলাকা ছাড়াও অধিকাংশ এলাকার ওয়ার্ডে একজন কাজি মাসে ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা আয় করেন। এসব কাজি লাইসেন্সের বিপরীতে বছরে নামমাত্র টাকা পরিশোধ করে বাকি সব টাকাই হাতিয়ে নেন। কিন্তু সরকারকে আয়কর দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের তীব্র অনীহা লক্ষণীয়। কোনো কোনো কাজি আবার নিজের স্থাবর সম্পত্তির ওপর আয়কর দিয়ে কাজি পেশার আয় গোপন করেন। রাজধানীর একজন কাজি কম করে হলেও বছরে অর্ধকোটি টাকা আয় করেন।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, একটি রেজিস্ট্রেশন নম্বর ব্যবহার করে একাধিক ব্যক্তি কাজি হিসেবে কাজ করছেন, যার ফলে মাঠপর্যায়ে জবাবদিহি ও তদারকি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ ধরনের অনিয়মের কারণে পুরো বিবাহ নিবন্ধন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রায় ৩০০ কাজির নিবন্ধন বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হলে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। বর্তমানে এসব বিষয়ে একাধিক মামলা ও রিট বিচারাধীন রয়েছে।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিচার শাখা-৭-এর সিনিয়র সহকারী সচিব মো. আবদুল ওয়াহাব কালবেলাকে বলেন, ‘সারা দেশে প্রায় ৬ হাজার রেজিস্ট্রারভুক্ত কাজি আছেন। বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ৫ শতাধিক কাজির কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।” তবে কাজিদের বার্ষিক ফি বা সরকারের রাজস্ব আয়ের তথ্য সম্পর্কে তিনি বলেন, “এই তথ্য রাখার দায়িত্ব আমাদের না।’
এ বিষয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের এক যুগ্ম সচিব বলেন, কাজিদের নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এসব অনিয়ম কমাতে সরকার পর্যায়ক্রমে সারা দেশে ডিজিটালাইজেশন চালুর উদ্যোগ নিয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ মুসলিম নিকাহ রেজিস্ট্রার কল্যাণ সমিতির নির্বাহী সভাপতি অধ্যক্ষ ড. মো. গোলাম কিবরিয়া দাবি করেন, নিয়ম অনুযায়ী সরকারের নামে আদায়কৃত কমিশন বছরে দুবার কোষাগারে জমা দেওয়া হয় এবং কাজিরা আয়করও পরিশোধ করেন। তবে তিনি স্বীকার করেন, কিছু ভুয়া কাজি বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শতভাগ ডিজিটাল পেমেন্ট, কেন্দ্রীয় হিসাব নম্বর, অনলাইন মনিটরিং, স্বচ্ছ নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং লাইসেন্স ভাড়া দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করা গেলে রাজস্ব ফাঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। একই সঙ্গে সরকারের আয় বাড়বে এবং মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন ব্যবস্থায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।