কে এই ধর্মেন্দ্র প্রধান? তুখোড় ছাত্রনেতা থেকে আজ ছাত্র আন্দোলনের কারণ

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট-ইউজি’ (NEET-UG)-এর প্রশ্নফাঁস, ফলাফল জালিয়াতি, কোটি টাকার প্রশ্ন বাণিজ্য এবং জাতীয় পরীক্ষা সংস্থার (NTA) নজিরবিহীন প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায়ে উত্তাল পুরো ভারত। রাজধানী দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর থেকে শুরু করে রাজস্থান, বিহার, মুম্বাই, কলকাতা ও হায়দরাবাদ পর্যন্ত কোটি কোটি পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও তরুণ সমাজের আক্রোশের প্রধান লক্ষ্য এখন একজনই- ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক ও রাজপথের পরাক্রমশালী আন্দোলনকারী সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) নেতৃত্বে এখন ভারতের আনাচে-কানাচে একটাই স্লোগান প্রতিধ্বনিত হচ্ছে- ‘ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চাই!’ আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা সরকারকে স্পষ্ট আলটিমেটাম দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, ৫৭ বছর বয়সী এই শিক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত না করা পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না; প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পদত্যাগের এক দফা দাবি তোলা হবে। কিন্তু কে এই ধর্মেন্দ্র প্রধান? একসময় যিনি নিজে রাজপথে পোস্টার মেরে ছাত্র আন্দোলন করতেন, তিনি কীভাবে নরেন্দ্র মোদীর ঘনিষ্ঠতম আস্থাশাভাজন ও ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ পদে

কে এই ধর্মেন্দ্র প্রধান? তুখোড় ছাত্রনেতা থেকে আজ ছাত্র আন্দোলনের কারণ

মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা ‘নিট-ইউজি’ (NEET-UG)-এর প্রশ্নফাঁস, ফলাফল জালিয়াতি, কোটি টাকার প্রশ্ন বাণিজ্য এবং জাতীয় পরীক্ষা সংস্থার (NTA) নজিরবিহীন প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায়ে উত্তাল পুরো ভারত। রাজধানী দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর থেকে শুরু করে রাজস্থান, বিহার, মুম্বাই, কলকাতা ও হায়দরাবাদ পর্যন্ত কোটি কোটি পরীক্ষার্থী, অভিভাবক ও তরুণ সমাজের আক্রোশের প্রধান লক্ষ্য এখন একজনই- ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।

সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক ও রাজপথের পরাক্রমশালী আন্দোলনকারী সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) নেতৃত্বে এখন ভারতের আনাচে-কানাচে একটাই স্লোগান প্রতিধ্বনিত হচ্ছে- ‘ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা চাই!’ আন্দোলনকারী ছাত্রনেতারা সরকারকে স্পষ্ট আলটিমেটাম দিয়ে জানিয়ে দিয়েছেন, ৫৭ বছর বয়সী এই শিক্ষামন্ত্রীকে বরখাস্ত না করা পর্যন্ত আন্দোলন থামবে না; প্রয়োজনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পদত্যাগের এক দফা দাবি তোলা হবে।

কিন্তু কে এই ধর্মেন্দ্র প্রধান? একসময় যিনি নিজে রাজপথে পোস্টার মেরে ছাত্র আন্দোলন করতেন, তিনি কীভাবে নরেন্দ্র মোদীর ঘনিষ্ঠতম আস্থাশাভাজন ও ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ পদে আসীন হলেন? আর কেনই বা তাকে রক্ষায় খোদ প্রধানমন্ত্রী ও এনডিএ সরকার পুরো দেশের ক্ষোভের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার প্রাচীর গড়ে তুলছে?

উড়িষ্যার রাজনীতি ও প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে তার নিজের আন্দোলন

১৯৬৯ সালের ২৬ জুন ওড়িশার তালচের জেলার এক অত্যন্ত সম্ভ্রান্ত রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। তার পিতা দেবেন্দ্র প্রধান ছিলেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একজন জাঁদরেল নেতা এবং অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকারের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। রগে রগে রাজনীতি রক্তে প্রবাহিত হলেও ধর্মেন্দ্রের পথচলা খুব একটা সহজ ছিল না।

আশি ও নব্বইয়ের দশকে উড়িষ্যার বিখ্যাত উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃতত্ত্বে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার সময় তিনি জাতীয়তাবাদী সামাজিক সংগঠন ‘রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘ’ (আরএসএস)-এর ছাত্র সংগঠন ‘অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ’ (এবিভিপি)-এর হাত ধরে ছাত্র রাজনীতিতে প্রবেশ করেন।

উড়িষ্যাজুড়ে ছাত্রদের অধিকার ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারা ছড়িয়ে দিতে তিনি ছিলেন রাজপথের অগ্রসৈনিক। পরবর্তী সময়ে তার সাংগঠনিক বিচক্ষণতা তাকে এবিভিপি’র সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের পদে উন্নীত করে। যে ছাত্র অসন্তোষ আজ তার রাজনৈতিক ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে, তার নিজের ক্যারিয়ারের গোড়াপত্তন হয়েছিল ঠিক একই রকম ছাত্র বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেওয়ার মাধ্যমে।

১৯৯৭ সালে উৎকল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় উড়িষ্যার রাজধানী ভুবনেশ্বরে রাজ্য স্তরের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছিল। সে সময়ের তরুণ ছাত্রনেতা ও এবিভিপি নেতা হিসেবে ধর্মেন্দ্র প্রধান রাজ্য সচিবালয়ের সামনে প্রায় দেড় হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভ দমনে পুলিশের লাঠিচার্জ করলে তিনি গুরুতর আহত হন ও তার শরীরের কয়েকটি হাড় ভেঙে যায়।

মূলধারার রাজনীতি ও মোদী-শাহের ‘ট্রাবলশুটার’

২০০০ সালে মাত্র ৩১ বছর বয়সে উড়িষ্যা বিধানসভার সদস্য (এমএলএ) নির্বাচিত হয়ে মূলধারার সংসদীয় রাজনীতিতে পা রাখেন ধর্মেন্দ্র। চার বছর পরই, ২০০৪ সালে, তিনি দেবগড় আসন থেকে প্রথমবারের মতো লোকসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ওই বছরই তাকে বিজেপির যুব সংগঠন ‘ভারতীয় জনতা যুব মোর্চা’র (বিজেওয়াইএম) সর্বভারতীয় সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয়।

বিজেপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ধর্মেন্দ্র প্রধানের নাম ছড়িয়ে পড়ে একজন দক্ষ ‘অর্গানাইজার’ বা সংগঠক হিসেবে। বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরাখণ্ড ও কর্ণাটকের মতো রাজনৈতিকভাবে জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে বিজেপির বিধানসভা নির্বাচনের পর্যবেক্ষক বা ‘ইনচার্জ’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অভাবনীয় সাফল্য এনে দেন তিনি। বিশেষ করে, উড়িষ্যা ও পূর্বাঞ্চলীয় ভারতে যেখানে বিজেপির উপস্থিতি সামান্য ছিল, সেখানে সংগঠন শক্তিশালী করতে তার কৌশল ছিল অতুলনীয়।

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী প্রথমবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ওপর আস্থা রেখে তাকে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ ‘পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস’ মন্ত্রণালয়ের স্বাধীন দায়িত্ব দেওয়া হয়। মোদী সরকারের অন্যতম ফ্ল্যাগশিপ ও সফল প্রকল্প ‘উজ্জ্বলা যোজনা’ (দরিদ্র নারীদের বিনামূল্যে রান্নার গ্যাস সংযোগ) সারাদেশে সফলভাবে বাস্তবায়ন করে তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং অমিত শাহের আস্থার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছান। সফলতার স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৭ সালে তাকে ক্যাবিনেট মন্ত্রীর মর্যাদায় উন্নীত করা হয় এবং পেট্রোলিয়ামের পাশাপাশি ‘দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা’ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

২০২১ সালে মন্ত্রিসভার রদবদলের সময় তাকে মোদী সরকারের সবচেয়ে দূরদর্শী দায়িত্ব ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়’- এর প্রধান করা হয়। ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে উড়িষ্যার সম্বলপুর আসন থেকে বিশাল ব্যবধানে জয়ী হওয়ার পর তাকে পুনরায় কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বেই বহাল রাখেন প্রধানমন্ত্রী মোদী।

নিট কেলেঙ্কারি ও জীবনের বড় অগ্নিপরীক্ষা

পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা ধর্মেন্দ্র প্রধানের ক্যারিয়ার জীবনের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি হয় ২০২৬ সালের মে ও জুন মাসে। দেশের লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভাগ্য নির্ধারণী পরীক্ষা ‘নিট-ইউজি’ (NEET-UG)-র প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা প্রকাশ্যে আসতেই পুরো দেশ তোলপাড় হয়ে যায়।

অভিযোগ ওঠে বিহার, রাজস্থান ও গুজরাটে কোটি কোটি টাকার বিনিময়ে পরীক্ষা শুরুর আগেই প্রশ্ন বিক্রি হয়েছে। একাধিক পরীক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেয়ে কিংবা জালিয়াতির খবরে হতাশ হয়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিলে ক্ষোভের আগুন জাতীয় আন্দোলনে রূপ নেয়। পাশাপাশি সিবিএসই-র পরীক্ষার মূল্যায়ন জালিয়াতি নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে আসেন।

শুরুতে কিছুটা নমনীয় মনোভাব দেখালেও পরে প্রশাসনিক ত্রুটি স্বীকার করেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। তবে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে নিজের পদত্যাগের দাবি তিনি সরাসরি নাকচ করে দেন। এতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও বিরোধী জোটের ক্ষোভ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, মোবাইল জ্যামার ও পুলিশি লাঠিচার্জও ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন দমিয়ে রাখতে পারেনি।

পদত্যাগ না করানোর নেপথ্যের কৌশল ও রাজনৈতিক অংক

বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) মোদী সরকারকে ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া সত্ত্বেও ও গোটা দেশ উত্তাল হওয়া সত্ত্বেও কেন ধর্মেন্দ্র প্রধানকে সরাচ্ছে না মোদী সরকার?

সরকারি শীর্ষ সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্র সরকারের স্পষ্ট বার্তা, ‘ইস্তফা দেওয়াটা সবচেয়ে সহজ সিদ্ধান্ত।’ কিন্তু একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ মেনে নিলে তা আন্দোলনকারীদের কাছে নত হওয়া হিসেবে বিবেচিত হবে এবং প্রশ্নফাঁস ও শিক্ষা মাফিয়া গ্যাংগুলোর বিরুদ্ধে সরকারের লড়াই দুর্বল দেখাবে।

দ্বিতীয়ত, ২০২৪-এর নির্বাচনে উড়িষ্যায় প্রথমবারের মতো বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ ও নিজস্ব মুখ্যমন্ত্রী সরকার গঠনের নেপথ্যে প্রধান কারিগর ছিলেন ধর্মেন্দ্র প্রধান। উড়িষ্যার রাজনীতিতে বিজেপি তাকে ভবিষ্যতের কাণ্ডারি হিসেবে দেখে। তাকে পদচ্যুত করলে উড়িষ্যায়য় দলীয় সংগঠন ও ভাবমূর্তিতে বড় আঘাত আসবে বলে মনে করে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব।

যে নেতা একদিন ছাত্র আন্দোলনের পতাকা হাতে রাজপথ থেকে উঠে এসে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি নির্ধারণী চেয়ারে বসেছিলেন, আজ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সেই ছাত্র সমাজেরই কোটি কোটি চোখ তার বিদায়ের প্রহর গুনছে। মোদী সরকার তার পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ালেও এবং ফাস্ট-ট্র্যাক কোর্ট গঠনের আশ্বাস দিলেও, রাজপথে রক্ত দেওয়া আন্দোলনকারী যুবসমাজ ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ছাড়া এক চুলও নড়তে রাজি নয়। ছাত্র রাজনীতির সাবেক এই ‘পোস্টার বয়’ তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বিপজ্জনক রাজনৈতিক ঝড় কাটিয়ে উঠতে পারেন কি না, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

সূত্র: দ্য হিন্দু, টাইমস অব ইন্ডিয়া, এনডিটিভি

এসএএইচ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow