কোন দেশ বিরিয়ানি আবিষ্কার করেছিল?

ভোজনরসিকদের কাছে বিরিয়ানি মানেই এক আবেগ, এক দীর্ঘশ্বাস। এক হাঁড়ি ধোঁয়া ওঠা বিরিয়ানির মায়াবী সুগন্ধ যেন নিমিষেই জয় করে নিতে পারে যেকোনো মানুষের মন। কিন্তু প্লেটের ওপর সাজানো এই রাজকীয় খাবারের আদি জন্মস্থান আসলে কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, অধিকাংশ মানুষকে এই প্রশ্ন করা হলে নির্দ্বিধায় উত্তর আসবে, ভারত। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পদের নাম এবং ইতিহাসের পরতগুলো কিন্তু ভিন্ন এক রোমাঞ্চকর গল্পের দিকে ইঙ্গিত দেয়। ‘বিরিয়ানি’ শব্দটি মূলত এসেছে ফারসি শব্দ ‘বিরিঞ্জ বিরিয়ান’ থেকে, যার সহজ অর্থ হলো ‘ভাজা চাল’। নাম থেকেই স্পষ্ট যে, এই পদের শেকড় কেবল ভারতীয় মাটিতেই নয়, বরং তা সুদূর পারস্য (বর্তমান ইরান) পর্যন্ত বিস্তৃত। পারস্যের রাজকীয় হেঁশেল থেকে শুরু হয়ে কীভাবে এই খাবারটি আধুনিক বিশ্বের ভোজন সংস্কৃতিতে জায়গা করে নিল, সেই ইতিহাস যেন বিরিয়ানির মশলার মতোই পরতে পরতে রহস্যেঘেরা। পারস্যের রাজকীয় হেঁশেল ও ‘দম’ পদ্ধতি অনেক খাদ্য ঐতিহাসিক মনে করেন, বিরিয়ানির প্রকৃত জন্ম হয়েছিল প্রাচীন পারস্যে, ভারতে আসার অনেক আগে

কোন দেশ বিরিয়ানি আবিষ্কার করেছিল?

ভোজনরসিকদের কাছে বিরিয়ানি মানেই এক আবেগ, এক দীর্ঘশ্বাস। এক হাঁড়ি ধোঁয়া ওঠা বিরিয়ানির মায়াবী সুগন্ধ যেন নিমিষেই জয় করে নিতে পারে যেকোনো মানুষের মন। কিন্তু প্লেটের ওপর সাজানো এই রাজকীয় খাবারের আদি জন্মস্থান আসলে কোথায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, অধিকাংশ মানুষকে এই প্রশ্ন করা হলে নির্দ্বিধায় উত্তর আসবে, ভারত। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পদের নাম এবং ইতিহাসের পরতগুলো কিন্তু ভিন্ন এক রোমাঞ্চকর গল্পের দিকে ইঙ্গিত দেয়।

‘বিরিয়ানি’ শব্দটি মূলত এসেছে ফারসি শব্দ ‘বিরিঞ্জ বিরিয়ান’ থেকে, যার সহজ অর্থ হলো ‘ভাজা চাল’। নাম থেকেই স্পষ্ট যে, এই পদের শেকড় কেবল ভারতীয় মাটিতেই নয়, বরং তা সুদূর পারস্য (বর্তমান ইরান) পর্যন্ত বিস্তৃত। পারস্যের রাজকীয় হেঁশেল থেকে শুরু হয়ে কীভাবে এই খাবারটি আধুনিক বিশ্বের ভোজন সংস্কৃতিতে জায়গা করে নিল, সেই ইতিহাস যেন বিরিয়ানির মশলার মতোই পরতে পরতে রহস্যেঘেরা।

পারস্যের রাজকীয় হেঁশেল ও ‘দম’ পদ্ধতি

অনেক খাদ্য ঐতিহাসিক মনে করেন, বিরিয়ানির প্রকৃত জন্ম হয়েছিল প্রাচীন পারস্যে, ভারতে আসার অনেক আগে। পারস্যের সফাবিদ এবং তিমুরিদ সাম্রাজ্যের রাজকীয় বাবুর্চিরা চালকে প্রথমে ঘি বা চর্বিতে ভেজে নিতেন। এরপর সেই চালের স্তরে স্তরে মাংস, শুকনো ফল, বাদাম এবং জাফরান সাজিয়ে একটি হাঁড়িতে রাখা হতো। সেই হাঁড়ির মুখ আটা দিয়ে শক্ত করে বন্ধ করে হালকা আঁচে দীর্ঘক্ষণ রান্না করা হতো, যা আজ আমাদের কাছে ‘দম’ পদ্ধতি নামে পরিচিত। ঐতিহাসিকদের মতে, এই ধীরগতির রান্নার কৌশলটিই আধুনিক বিরিয়ানির ভিত্তি স্থাপন করেছিল।

সিল্ক রোড ও আফগান সংযোগ

পারস্য থেকে এই সুস্বাদু পদটি প্রাচীন বাণিজ্য পথ ধরে ধীরে ধীরে পূর্ব দিকে অগ্রসর হতে থাকে। বণিক, সৈন্য এবং ভ্রাম্যমাণ কবিদের হাত ধরে এটি ইসফাহান ও খোরসান হয়ে পৌঁছায় হেরাত এবং কাবুলে। ১৫শ শতকের দিকে তিমুরিদ সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু কাবুল ও হেরাতে রাজকীয় বাবুর্চিরা এই রান্নার আরও পরিমার্জন করেন। ধারণা করা হয়, বিখ্যাত 'কাবুলি পোলাও' বিরিয়ানির বিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যা ল্যাম্ব, গাজর, কিশমিশ ও এলাচের সমন্বয়ে তৈরি হয়ে অভিজাতদের ভোজসভায় পরিবেশিত হতো।

মুঘল সাম্রাজ্য ও ভারতীয় বিবর্তন

বিরিয়ানিকে আজকের পূর্ণতা ও রাজকীয় রূপ দিয়েছে মুঘলরা। ১৫২৬ সালে সম্রাট বাবর যখন ভারত জয় করেন, তিনি সঙ্গে করে নিয়ে আসেন মধ্য এশীয় ও পারস্যের রান্নার এই ঐতিহ্য। ভারতে এসে এই রান্নার পদ্ধতিতে যুক্ত হয় এখানকার সুগন্ধি বাসমতি চাল এবং স্থানীয় বিভিন্ন সুগন্ধি মশলা। তবে ১৮শ শতকের আগে মুঘল নথিপত্রে ‘বিরিয়ানি’ শব্দটির সরাসরি উল্লেখ পাওয়া যায় না। ততদিনে এটি সাধারণ সৈনিকদের এক-পাত্রের খাবার থেকে উন্নীত হয়ে দিল্লি, লখনউ এবং হায়দ্রাবাদের রাজকীয় খাবারের মর্যাদা পেয়েছে।

প্রাচীন ভারতের নিজস্ব দাবি

বিরিয়ানির উৎপত্তি নিয়ে একটি চমকপ্রদ বিকল্প তত্ত্বও প্রচলিত আছে। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, খ্রিষ্টীয় ২য় শতকের দিকে বর্তমান তামিলনাড়ু অঞ্চলে ‘ওন সোরু’ নামক মাংস ও চালের একটি পদের প্রচলন ছিল। যোদ্ধাদের জন্য তৈরি এই পুষ্টিকর খাবারটিতে ঘি, মাংস, তেজপাতা এবং গোলমরিচ ব্যবহার করা হতো, যা অনেকটা বিরিয়ানির প্রাথমিক রূপের মতোই ছিল।

শিল্পে রূপান্তর: লখনউ ও হায়দ্রাবাদ

উৎস যেখানেই হোক না কেন, বিরিয়ানিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছে ভারতের অবধ (লখনউ) এবং হায়দ্রাবাদের নিজামদের হেঁশেল। লখনউয়ের বিরিয়ানি তার সূক্ষ্ম ও সুগন্ধি স্বাদের জন্য বিখ্যাত, যা সাধারণত তামার পাত্রে রান্না করা হয়। অন্যদিকে, হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানিতে জাফরান ও তীব্র মশলার ব্যবহার একে সারা বিশ্বে অনন্য করে তুলেছে।

বিরিয়ানি কেবল একটি দেশের আবিষ্কার নয়, বরং এটি পারস্যের রান্নার কৌশল, আফগানিস্তানের উপকরণ এবং ভারতীয় মশলার এক অপূর্ব মহামিলন। পারস্যে এর জন্ম হলেও, এটি ভারতীয় উপমহাদেশেই তার বৈচিত্র্য ও পরিপূর্ণতা খুঁজে পেয়েছে। তাই প্রতিবার যখন আপনি বিরিয়ানির প্লেট সামনে নেবেন, মনে রাখবেন এটি কেবল একটি খাবার নয়, বরং কয়েকশ বছরের এক সুস্বাদু বিশ্বভ্রমণের ইতিহাস।

তথ্যসূত্র: এনডিটিভি

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow