কোরবানির ত্যাগ, শিক্ষা, মহানুভবতা-তরুণরা কীভাবে দেখছেন
ঈদুল আজহা মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের একটি। এই উৎসব আমাদের বিনয়, আত্মত্যাগ ও আত্মসংযমের শিক্ষা দিয়ে থাকে। মহান আল্লাহর কাছে আমাদের কোরবানির পশুর রক্ত, মাংস-এর কোনো কিছুই পৌঁছায় না যা পৌঁছায় তা হলো তাকওয়া। আমাদের লোক দেখানো ইবাদত না করে প্রকৃত অর্থে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য এই ইবাদত পালন করতে হবে। গরিব-দু:খী ও অসহায় মানুষদের কথা মাথায় রেখে তাদেরও কোরবানির পশুর মাংস খাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে। ঈদুল আজহার আনন্দ কেবল যেন একপাক্ষিক না হয় বরং সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণে সবার মুখে হাসি ফোটাতে হবে। পশু কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মধ্যকার হিংসা, কুপ্রবৃত্তি ও অশালীন আচরণগুলোর কোরবানি দিতে হবে। তবেই কোরবানির প্রকৃত মাহাত্ম্য বজায় থাকবে। কোরবানির শিক্ষা ও তাৎপর্য নিয়ে শিক্ষার্থীদের মতামত লেখায় ফুটিতে তুলেছেন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তৈয়বা খানম- আত্মত্যাগের মহান শিক্ষা দিয়ে থাকে জোবাইদুল ইসলাম শিক্ষার্থী, আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইসলাম শব্দের অর্থ আত্মসমর্পণ করা। মুসলমানরা তাদের জান, মাল সবকিছু আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে। আর এই আত্ম
ঈদুল আজহা মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের একটি। এই উৎসব আমাদের বিনয়, আত্মত্যাগ ও আত্মসংযমের শিক্ষা দিয়ে থাকে। মহান আল্লাহর কাছে আমাদের কোরবানির পশুর রক্ত, মাংস-এর কোনো কিছুই পৌঁছায় না যা পৌঁছায় তা হলো তাকওয়া। আমাদের লোক দেখানো ইবাদত না করে প্রকৃত অর্থে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য এই ইবাদত পালন করতে হবে। গরিব-দু:খী ও অসহায় মানুষদের কথা মাথায় রেখে তাদেরও কোরবানির পশুর মাংস খাওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।
ঈদুল আজহার আনন্দ কেবল যেন একপাক্ষিক না হয় বরং সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণে সবার মুখে হাসি ফোটাতে হবে। পশু কোরবানির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মধ্যকার হিংসা, কুপ্রবৃত্তি ও অশালীন আচরণগুলোর কোরবানি দিতে হবে। তবেই কোরবানির প্রকৃত মাহাত্ম্য বজায় থাকবে। কোরবানির শিক্ষা ও তাৎপর্য নিয়ে শিক্ষার্থীদের মতামত লেখায় ফুটিতে তুলেছেন চট্টগ্রাম কলেজের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী তৈয়বা খানম-
আত্মত্যাগের মহান শিক্ষা দিয়ে থাকে
জোবাইদুল ইসলাম
শিক্ষার্থী, আরবী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ইসলাম শব্দের অর্থ আত্মসমর্পণ করা। মুসলমানরা তাদের জান, মাল সবকিছু আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে। আর এই আত্মসমর্পণের আরেকটি রূপ হলো আত্মত্যাগ। মহান আল্লাহ তায়ালা মুসলামানদেরকে কোরবানি করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর কোরবানি হতে হয় একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে। আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য বা নিয়ত থাকলে সেই কোরবানি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা হচ্ছে আত্মত্যাগ। মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে তাঁর প্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি দিতে সম্মত হয়েছিলেন। প্রাণাধিক প্রিয় পুত্রকে কোরবানি দেওয়া ছিল আত্মত্যাগের এক মহান দৃষ্টান্ত। নিজের প্রিয় বস্তু আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করার নামই কোরবানি। কোরবানি মুসলমানদেরকে নিজ স্বার্থ ত্যাগ করে শুধু মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে প্রিয় বস্তুকে ত্যাগ করার শিক্ষা দেয়। তাছাড়া কোরবানির এই আত্মত্যাগ মানুষকে আত্মশুদ্ধি অর্জন করতে সাহায্য করে; যা একজন মুসলমানের জীবন চলার পথে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পরিশেষে বলা যায়, কোরবানি আসে আমাদের আত্মত্যাগের শিক্ষা দিতে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে একনিষ্ঠ হওয়ার শিক্ষা দিতে।
কোরবানি: বর্বরতা নাকি মহানুভবতা
আনিকা বুশরা সিফাত
শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রতি বছর কোরবানি ঈদের কিছুদিন আগে থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোরবানির পশুর ছবির সঙ্গে একটি বিশেষ ক্যাপশন ছড়িয়ে পড়ে, ‘ওরাও বাঁচতে চায়’। আপাত দৃষ্টিতে এটি দেখে মনে হতেই পারে কোরবানি একটি অমানবিক কাজ যার মাধ্যমে লাখো নিরীহ প্রাণিকে হত্যা করা হয়। বাংলাদেশে ২০২৫ সালে প্রায় ৯১ লাখ ৩৭ হাজার পশু কোরবানি হয়েছিল। একি শুধুই বিশাল হত্যাযজ্ঞ? একটু গভীরে বিশ্লেষণ করলেই দেখা যাবে দাবিটি সঠিক নয়। সূরা আল-আনতামে বলা হয়েছে, ‘বলুন, আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন ও আমার মরণ সবকিছুই বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহর জন্য’। তবে ধর্মীয় দিক বাদ দিয়ে সামাজিক বা বৈজ্ঞানিক দিক বিবেচনায় ও কোরবানিকে অমানবিক বলা যায় না। বাস্তুতন্ত্রকে সচল রাখতে কোরবানি বড় ভূমিকা রাখে, খাদ্যশৃঙ্খলে পুষ্টির প্রবাহ বজায় রাখে। যদি প্রাণিহত্যা একেবারে বন্ধ করে দেয়া হয় তবে পৃথিবীতে তৃণভোজী প্রাণির সংখ্যা অত্যাধিক হারে বেড়ে যাবে। এতে ভূপৃষ্ঠের ঘাস শেষ হয়ে মরুকরণের আশঙ্কাও রয়েছে। কোরবানির মাধ্যমে যেমন এই ভারসাম্য বজায় থাকে তেমনি কোরবানির পশুর অবশিষ্টাংশ মাটিতে মিশে উদ্ভিদের পুষ্টি নিশ্চিত করে। এছাড়া সামাজিক দিক বিবেচনায় আত্মীয়দের মধ্যে সৌহার্দ্য বাড়ায় কোরবানি। মাংস বিতরণের অজুহাতে সারাবছরে দেখা হয় না এমন আত্মীয়ের বাসায় ও যাতায়াত হয়। কোরবানির মাংসের এক তৃতীয়াংশ সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত। এতে তারা যেমন ভালো খাবার খাওয়ার সুযোগ পায় তেমনি অতিরিক্ত মাংস বাজারে বিক্রি করে সারাবছর পড়ার খরচ চালায় অনেক পথশিশু। নতুন প্রজন্মের কাছে কোরবানির এই দিকগুলো তুলে ধরা এখন অতীব প্রয়োজনীয়।
কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা: অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান
তাইয়িবা তাসনীম
শিক্ষার্থী, অর্থনীতি ও ব্যাংকিং বিভাগ, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম
ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জন্য শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি ত্যাগ, মানবতা, ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার এক মহান শিক্ষা। হযরত ইবরাহিম (আ.) এর আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করেই মুসলমানরা প্রতি বছর কোরবানি আদায় করেন। কিন্তু কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধুই পশু জবাই নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি সমাজের অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭) এই আয়াত আমাদের শেখায়, কোরবানির বাহ্যিক আয়োজন নয়; বরং মানুষের অন্তরের তাকওয়া ও আন্তরিকতাই আল্লাহর কাছে অধিক মূল্যবান। অথচ আজ আমাদের সমাজে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষার চেয়ে বাহ্যিক প্রদর্শনীর প্রবণতা বেশি দেখা যায়। কে কত বড় পশু কোরবানি দিল, কত দামি গরু কিনলো এসব নিয়ে আলোচনা বেশি হলেও কতজন অসহায় মানুষের ঘরে ঈদের আনন্দ পৌঁছালো, সেটি অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। ইসলাম কোরবানির গোশত বণ্টনের মাধ্যমেও সমাজে সাম্য ও সহমর্মিতার শিক্ষা দিয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম কোরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করতেন এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য এবং এক ভাগ গরিব ও অসহায় মানুষের জন্য। এর মাধ্যমে ইসলাম সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে চেয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন ‘তোমরা তা থেকে নিজেরাও খাও এবং অভাবগ্রস্ত দরিদ্রকেও খাওয়াও।’ (সূরা আল-হাজ্জ: ২৮) এই নির্দেশনার মধ্যেই কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে।
ইসলাম চায়, ঈদের আনন্দ যেন শুধু ধনীদের ঘরে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং সমাজের প্রতিটি মানুষ সেই আনন্দে অংশ নিতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।আমাদের সমাজে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা প্রতিদিন জীবনের সঙ্গে কঠিন সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন। দু’বেলা খাবার জোগাড় করাই যেখানে তাদের জন্য কঠিন, সেখানে ঈদ তাদের জীবনে অনেক সময় আনন্দের পরিবর্তে দুশ্চিন্তা নিয়ে আসে। চারপাশে যখন উৎসবের আমেজ থাকে, তখন অনেক অসহায় পরিবার নীরবে কষ্ট লুকিয়ে রাখে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদের দিনে তাদের মন আরও বেশি ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। সন্তানদের মুখে ভালো খাবার তুলে দিতে না পারার কষ্ট একজন বাবা-মায়ের হৃদয়কে গভীরভাবে আহত করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে অনেকেই কোরবানির অধিকাংশ গোশত আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন। অথচ আশপাশের অসহায় মানুষগুলোর কথা ভুলে যান। এটি কোরবানির প্রকৃত চেতনার পরিপন্থী।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘সে ব্যক্তি মুমিন নয়, যে নিজে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।’ (সহিহ আল-আদাবুল মুফরাদ) এই হাদিস শুধু খাদ্য ভাগাভাগির কথা নয়; এটি মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার শিক্ষা। একজন প্রকৃত মুসলমান কখনো নিজের আনন্দে মগ্ন থেকে পাশের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন ‘মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।’ (আল-মুজামুল আওসাত)
তাই এবারের কোরবানিতে আমাদের উচিত শুধু নিজের আনন্দ নিয়ে ব্যস্ত না থেকে আশপাশের দরিদ্র, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের খোঁজ নেওয়া। হয়তো আমাদের সামান্য সহযোগিতাই একটি পরিবারের ঈদের দুশ্চিন্তাকে আনন্দে পরিণত করতে পারে। একটি শিশুর মুখে হাসি ফোটাতে পারা, ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে খাবার তুলে দেওয়া কিংবা অভাবী প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো এসবই কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা।
ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জন্য শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি ত্যাগ, মানবতা, ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার এক মহান শিক্ষা। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর আত্মত্যাগের স্মৃতিকে ধারণ করেই মুসলমানরা প্রতি বছর কোরবানি আদায় করেন। কিন্তু কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধুই পশু জবাই নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পাশাপাশি সমাজের অসহায় ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।’ (সূরা আল-হাজ্জ: ৩৭) এই আয়াত আমাদের শেখায়, কোরবানির বাহ্যিক আয়োজন নয়; বরং মানুষের অন্তরের তাকওয়া ও আন্তরিকতাই আল্লাহর কাছে অধিক মূল্যবান।
অথচ আজ আমাদের সমাজে কোরবানির প্রকৃত শিক্ষার চেয়ে বাহ্যিক প্রদর্শনীর প্রবণতা বেশি দেখা যায়। কে কত বড় পশু কোরবানি দিল, কত দামি গরু কিনলো এসব নিয়ে আলোচনা বেশি হলেও কতজন অসহায় মানুষের ঘরে ঈদের আনন্দ পৌঁছালো, সেটি অনেক সময় গুরুত্ব পায় না। ইসলাম কোরবানির গোশত বণ্টনের মাধ্যমেও সমাজে সাম্য ও সহমর্মিতার শিক্ষা দিয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম কোরবানির গোশত তিন ভাগে ভাগ করতেন এক ভাগ নিজের পরিবারের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের জন্য এবং এক ভাগ গরিব ও অসহায় মানুষের জন্য। এর মাধ্যমে ইসলাম সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে চেয়েছে।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন ‘তোমরা তা থেকে নিজেরাও খাও এবং অভাবগ্রস্ত দরিদ্রকেও খাওয়াও।’(সূরা আল-হাজ্জ: ২৮) এই নির্দেশনার মধ্যেই কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে। ইসলাম চায়, ঈদের আনন্দ যেন শুধু ধনীদের ঘরে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং সমাজের প্রতিটি মানুষ সেই আনন্দে অংশ নিতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।আমাদের সমাজে এমন অসংখ্য মানুষ আছেন, যারা প্রতিদিন জীবনের সঙ্গে কঠিন সংগ্রাম করে বেঁচে আছেন। দু’বেলা খাবার জোগাড় করাই যেখানে তাদের জন্য কঠিন, সেখানে ঈদ তাদের জীবনে অনেক সময় আনন্দের পরিবর্তে দুশ্চিন্তা নিয়ে আসে। চারপাশে যখন উৎসবের আমেজ থাকে, তখন অনেক অসহায় পরিবার নীরবে কষ্ট লুকিয়ে রাখে। বিশেষ করে কোরবানির ঈদের দিনে তাদের মন আরও বেশি ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। সন্তানদের মুখে ভালো খাবার তুলে দিতে না পারার কষ্ট একজন বাবা-মায়ের হৃদয়কে গভীরভাবে আহত করে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে অনেকেই কোরবানির অধিকাংশ গোশত আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন। অথচ আশেপাশের অসহায় মানুষগুলোর কথা ভুলে যান। এটি কোরবানির প্রকৃত চেতনার পরিপন্থী।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন “সে ব্যক্তি মুমিন নয়, যে নিজে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।”(সহিহ আল-আদাবুল মুফরাদ)
এই হাদিস শুধু খাদ্য ভাগাভাগির কথা নয়; এটি মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধ ও মানবিকতার শিক্ষা। একজন প্রকৃত মুসলমান কখনো নিজের আনন্দে মগ্ন থেকে পাশের মানুষের কষ্টকে উপেক্ষা করতে পারে না। রাসূলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন “মানুষের মধ্যে সেই ব্যক্তিই উত্তম, যে মানুষের জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী।” (আল-মুজামুল আওসাত)
তাই এবারের কোরবানিতে আমাদের উচিত শুধু নিজের আনন্দ নিয়ে ব্যস্ত না থেকে আশেপাশের দরিদ্র, অসহায় ও বঞ্চিত মানুষের খোঁজ নেওয়া। হয়তো আমাদের সামান্য সহযোগিতাই একটি পরিবারের ঈদের দুশ্চিন্তাকে আনন্দে পরিণত করতে পারে। একটি শিশুর মুখে হাসি ফোটাতে পারা, ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে খাবার তুলে দেওয়া কিংবা অভাবী প্রতিবেশীর পাশে দাঁড়ানো এসবই কোরবানির প্রকৃত শিক্ষা।
আমাদের ঈদ ও কোরবানি অনলাইনমুখী না হোক
রাইহান উদ্দিন শিক্ষার্থী,
তা'মীরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা টঙ্গী
ডিজিটালাইজেশনের যুগে আমরা অতিরিক্ত অনলাইনমুখী হয়ে বাস্তব জীবনের সম্পর্ক ও অনুভূতিগুলোকে দিন দিন হারিয়ে ফেলছি। প্রযুক্তির প্রভাবে ঈদের প্রকৃত আনন্দ এখন যান্ত্রিকতায় বন্দি। সালামির সেই নতুন নোট এখন রূপ নিয়েছে বিকাশ, নগদ বা ই-পেমেন্টে। কার ঘরে কী রান্না হলো বা কে কত দামি পোশাক কিনলো সবই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রদর্শনের বিষয়। এমনকি দান-সদকা ও এখন লোক দেখানো প্রচারণায় পরিণত হচ্ছে।
বিশেষ করে ঈদুল আজহায় এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার মাত্রা আরও বেড়ে যায়। কে কত বড় বা কত বেশি দামে পশু কিনলো, তা নিয়ে সেলফি ও ভিডিওর হিড়িক পড়ে। অথচ কোরবানির মূল শিক্ষা হলো ত্যাগ, বিনয় ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। পশুর আকার বা দাম নয়, বরং অন্তরের তাকওয়াই এখানে মুখ্য বিষয়।
আমাদের উচিত ডিজিটাল কৃত্রিমতা বর্জন করে ঈদের প্রকৃত শিক্ষায় ফিরে আসা। ঈদের আনন্দ অনলাইনে নয়, বাস্তবিক ভাবে পরিবার, আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের মাঝে তা ভাগ করে নেওয়া হোক। ঈদ উদযাপনে লোক দেখানো প্রতিযোগিতা নয়, বরং মহান রবের সন্তুষ্টিই হোক আমাদের লক্ষ্য।
ত্যাগের মহিমায় শুদ্ধতা
আশিক বিন আলম সোহাগ
শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ
কোরবানি কেবল পশুর রক্ত ও মাংস উৎসর্গের আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি পরম করুণাময় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান ইবাদত। হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর অতুলনীয় ত্যাগের ঐতিহাসিক স্মৃতিকে স্মরণ করে প্রতি বছর জিলহজ মাসে মুসলিম উম্মাহ এই উৎসব পালন করে। কোরবানির মূল শিক্ষা হলো নিজের ভেতরের অহংকার, স্বার্থপরতা এবং পশুবৃত্তিকে বিসর্জন দেওয়া। লোকদেখানো মানসিকতা পরিহার করে সম্পূর্ণ হালাল উপার্জনে কেনা পশু আল্লাহর নামে উৎসর্গ করাই এর প্রধান শর্ত। কোরবানির পশুর মাংস তিন ভাগে ভাগ করে নিজের পরিবার, আত্মীয়-স্বজন এবং দরিদ্র মানুষের মাঝে বণ্টন করার বিধান রয়েছে। এই নিয়ম সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য বৃদ্ধি করে। ধনী-দরিদ্রের মধ্যকার দূরত্ব ঘুচিয়ে এটি একটি সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখে। তাই বাহ্যিক আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে অন্তরের তাকওয়া ও শুদ্ধতাই কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য।
- আরও পড়ুন
সীমানার ওপারে ঈদ: কেমন কাটে প্রবাসী তরুণদের
ঈদুল আজহায় কোরবানির সঙ্গে থাকুক পরিচ্ছন্ন পরিবেশের প্রতিশ্রুতি
কেএসকে
What's Your Reaction?