কোরবানির বাজারে মন্দার আভাস

সারাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর হাট। তবে প্রথম দিকেই বাজারে দেখা দিয়েছে এক ধরনের ‘মন্দাভাব’। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক মন্দা আর পশুখাদ্যের বাড়তি দামের কারণে এবার হাটে পশুর সরবরাহ যেমন কম, তেমনি বিক্রেতাদের হাঁকানো দামও কিছুটা বেশি। ফলে বিগত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও দেশে পশু কোরবানির সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, কয়েক বছর ধরেই দেশে পশু কোরবানির সংখ্যা কমছে। গত বছর (২০২৫) ঈদুল আজহায় দেশে ৯১ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল, যা তার আগের বছরের (২০২৪) চেয়ে ১৩ লাখ কম। ২০২৪ এর ঈদুল আজহায় সারাদেশে ১ কোটি ৪ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল। গত বছর ৩৩ লাখ ১০ হাজারের বেশি কোরবানির পশু অবিক্রীত রয়ে যায়। অন্যদিকে এ বছর ঈদুল আজহায় দেশে কোরবানি যোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার। এর মধ্যে এবার চাহিদা হবে ১ কোটি ১ লাখ বলে প্রাথমিক ধারণা করেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এবার গত বছরের চেয়েও কোরবানি কম হতে পারে। সংখ্যায় যা ৯১ লাখের চেয়েও কম হতে পারে। কেন কমতে পারে কোরবানি? বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, ব্য

কোরবানির বাজারে মন্দার আভাস

সারাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে পবিত্র ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর হাট। তবে প্রথম দিকেই বাজারে দেখা দিয়েছে এক ধরনের ‘মন্দাভাব’। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, অর্থনৈতিক মন্দা আর পশুখাদ্যের বাড়তি দামের কারণে এবার হাটে পশুর সরবরাহ যেমন কম, তেমনি বিক্রেতাদের হাঁকানো দামও কিছুটা বেশি। ফলে বিগত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও দেশে পশু কোরবানির সংখ্যা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, কয়েক বছর ধরেই দেশে পশু কোরবানির সংখ্যা কমছে। গত বছর (২০২৫) ঈদুল আজহায় দেশে ৯১ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল, যা তার আগের বছরের (২০২৪) চেয়ে ১৩ লাখ কম। ২০২৪ এর ঈদুল আজহায় সারাদেশে ১ কোটি ৪ লাখ পশু কোরবানি হয়েছিল।

গত বছর ৩৩ লাখ ১০ হাজারের বেশি কোরবানির পশু অবিক্রীত রয়ে যায়। অন্যদিকে এ বছর ঈদুল আজহায় দেশে কোরবানি যোগ্য পশুর সংখ্যা ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার। এর মধ্যে এবার চাহিদা হবে ১ কোটি ১ লাখ বলে প্রাথমিক ধারণা করেছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর।

তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এবার গত বছরের চেয়েও কোরবানি কম হতে পারে। সংখ্যায় যা ৯১ লাখের চেয়েও কম হতে পারে।

কেন কমতে পারে কোরবানি?

বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক দুর্বলতা, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব, দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে এবার ঈদুল আজহার কোরবানির বাজারে। পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় গত কয়েক বছর পশুর দাম দ্রুত বেড়েছে, যা নিম্ন থেকে নিম্নমধ্যবিত্তদের নাগালের বাইরে এখন।

যে কারণে দ্রুত কোরবানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় বেড়েছে ভাগে কোরবানির প্রবণতাও। আগে যারা একটি পশু কোরবানি করতেন তারা এখন কয়েকজন মিলে ভাগে কোরবানি করছেন। অন্যদিকে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিরও কিছুটা বিরুপ প্রভাব ফেলেছে কোরবানির বাজারে।

আরও পড়ুন
অনলাইনে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে ভাগে কোরবানিও
পশুবাহী গাড়ি জোর করে নির্দিষ্ট হাটে নেওয়া ঠেকাতে নজরদারি করছে র‍্যাব
পশুর হাটে নিরাপত্তা ও জাল টাকা ঠেকাতে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নিয়েছে সরকার

কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, খামারিদের নানা খরচ বেড়ে যাওয়ায় এবার পশুর দাম বেড়েছে। অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। তারা প্রতিদিনের খরচ মেটাতেই হিমশিম খাচ্ছেন।

শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ভালো মানের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বড় পদের কর্মী ছাড়া ব্যবসায়ীদেরও মন্দাভাব চলছে। যে কারণে আগে যারা একা একটি পশু কোরবানি দিতেন, তারা এখন ভাগে কোরবানি দিচ্ছেন। যারা ছোট গরু দিতেন, তারা ছাগল দিচ্ছেন। আর যারা অনেক কষ্টে দিতেন, তারা এবার আর দিতে পারছেন না।

শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির অধ্যাপক রিপন কুমার মণ্ডল বলেন, করোনা পরবর্তী অর্থনৈতিক দুর্বলতা এখনো কাটেনি। এর মধ্যে দ্রুত পশুর দাম বেড়েছে। এ অবস্থায় মধ্যবিত্ত শ্রেণির অনেকেই গরু কিনতে এক লাখ বা তার বেশি টাকা খরচ করার সামর্থ্য নেই। যে কারণে তারা ছাগল কিনছেন, অথবা উপায় না পেয়ে কেউ কোরবানি দিচ্ছেন না। আর্থিক দুর্বলতা এখন কোরবানি কমে যাওয়ার বড় কারণ।

তাহলে কি খামারিদের লোকসানের শঙ্কা বেশি

চাহিদার চেয়ে কোরবানিযোগ্য পশুর সংখ্যা বেশি থাকায় এ বছর ২২ লাখ পশু অবিক্রীত থাকতে পারে বলে ধারণা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে।

এ অবস্থায় খামারিরা বড় ধরনের পুঁজি শূন্যতায় পড়বেন কি না এমন বিষয়ে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (খামার) মো. শরীফুল হক জানান, প্রতি বছরই কিছু পশু উদ্বৃত্ত থাকে। তবে মাংসের চাহিদা সারাবছরই থাকায় খামারিদের বড় ক্ষতির আশঙ্কা নেই।

jagonews24

অবিক্রীত পশুগুলো পরের বছরের কোনবানিতে বিক্রি হয়। আবার অনেকে সেটা বছরের যে কোনো সময় বিক্রি করতে পারেন। মাংসের দাম বেশি হওয়ায় কোরবানি ছাড়াও সাধারণ সময়ে পশুর ভালো দাম পাওয়া যায়।

তথ্য বলছে, দেশে বছরে যত গরু জবাই হয়, তার অর্ধেক হয় কোরবানির ঈদে। আর বাকি অর্ধেক সারাবছর বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে ও দৈনন্দিন মাংসের দোকানে সরবরাহ করা হয়।

যা বলছেন খামারিরা

তবে কোরবানিতে পশু বিক্রি না করতে পারলে বড় লোকসানের শঙ্কার কথা বলছেন অধিকাংশ প্রান্তিক খামারি। তারা বলছেন, কোরবানির জন্য প্রস্তুত পশু সাধারণ সময়ে কসাই বা সাধারণ মাংসের ওজনে বিক্রি করলে উৎপাদন খরচ ও শ্রমের ন্যূনতম মূল্যও মেলে না। বরং কোরবানির পর এর লালন-পালন খরচের প্রায় পুরোটা লোকসান হয়।

শুধু কোরবানি কম হওয়ায় সারা দেশের স্থায়ীভাবে গড়ে ওঠা কোরবানির পশুপালনের অনেক খামার এই লোকসানের বোঝা টানতে গিয়ে প্রতি বছরই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

জয়পুরহাট আক্কেলপুর গ্রামের খামারি রুবেল হোসেন বলেন, কোরবানির হাট থেকে ফিরে আসা পশু ধকল সামলাতে গিয়ে প্রায় অসুস্থ হয়ে যায়। শরীর ভেঙে যায়। এরপর বিক্রির আগে পর্যন্ত এর খাওয়া, ওষুধসহ লালনপালনে যে খরচ সেটা পুরোটায় বাড়তি।

ঠিক ওই সময় (কোরবানির পরে) এসব অবিক্রীত পশুর চাপে হাটে দাম পড়ে যায়। যে কারণে এসব গরু খামারিদের ‌‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ ডেইরি অ্যান্ড ফ্যাটেনিং ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন বলেন, যদিও একটি খামারের সবগুলো গরু হাটে নেওয়া হয় না, তবে বাস্তবতা হচ্ছে একটি ৫-৬ মণ ওজনের গরু কোরবানিতে বিক্রি না হলে সেটা পরে ৫০ থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত ওজন হারায়। কারণ এ গরুগুলো ঠিক কোরবানি কেন্দ্র করেই প্রস্তুত করা। তখন খামারিরা ব্যাপক লোকসানে পড়েন।

আরও পড়ুন
বগুড়ার হাটে হাটে ‘হাসিল সন্ত্রাস’
উৎসবের হাটে বাড়ছে ঝুঁকি, দরকার বাড়তি সতর্কতা
গরমে হাঁসফাঁস রাজধানী, স্বস্তি খুঁজছে কোরবানির গরুও

তিনি বলেন, এমনিতেই গত কয়েক বছর পশুখাদ্য, ওষুধ ও খামার পরিচালনার ব্যয় অস্বাভাবিক বাড়ছে। বিষয়টি সরকারের গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তবে এ খামারি মনে করেন, এখনো প্রত্যাশার চেয়ে কম বিক্রির আশঙ্কা চূড়ান্ত নয়। ঈদের কেনাবেচা শুরু হয় দুদিন আগে। তখন উল্টেও যেতে পারে সব হিসাব-নিকাশ।

এ বছর গরুর দাম বেশি

এদিকে ঢাকার কোরবানির পশুর হাটগুলোতে শুরু হয়েছে বেচাকেনা। বেচাকেনা আশা অনুযায়ী না হলেও এবার গরুর দাম বেশি দেখা গেছে। যে কারণে শুরুতেই পশুর দাম নিয়ে ক্রেতাদের কিছুটা অসন্তোষ দেখা গেছে। হাটে যারা আসছেন তাদের অধিকাংশই বাজার দেখে-শুনে ফিরে যাচ্ছেন।

খামারি ও বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক বছরের মতো এবারও ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদা সবচেয়ে বেশি। যে হাটগুলো বসছে সেখানে ছোট ও মাঝারি আকারের গরু বেশি। চার থেকে সাড়ে চার মণ মাংস হবে এমন গরুর দাম দেড় লাখ টাকার ওপর হাঁকছেন বিক্রেতারা।

jagonews24

বিক্রেতাদের দাবি, গত বছরের চেয়ে তারা এবার প্রত্যন্ত এলাকার খামারিদের থেকে ছোট ও মাঝারি গরু ১০-১৫ হাজার টাকা করে বেশি দামে কিনেছেন। বড় গরু কিনেছেন লাখ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দাম দিয়ে।

রাজধানীর শাহজাহানপুর হাটে কথা হয় আব্দুল বারি নামের এক ক্রেতার সঙ্গে। তিনি বলেন, এ বছর শুরু থেকে বাজার অনেক চড়া মনে হচ্ছে। যে গরুর দাম এক লাখ ৭০ হাজার টাকা চায়, সেটা আমার কাছে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা ঠিক মনে হচ্ছে। অর্থাৎ প্রতিটি গরুর দাম ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা বেশি বলছেন বিক্রেতারা।

এনএইচ/এমআইএইচএস/এমএফএ

What's Your Reaction?

like

dislike

love

funny

angry

sad

wow