ক্যাশলেস লেনদেন বা নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে আনার উদ্যোগে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মোবাইল অ্যাপ ‘নেক্সাসপে’ দৃঢ় অবস্থান তৈরি করেছে।
ডিজিটাল এ প্ল্যাটফর্মটি ২০১৮ সালে চালু হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাস শেষে নেক্সাসপে অ্যাপটির সক্রিয় ব্যবহারকারী দাঁড়িয়েছে ৯৪ লাখেরও বেশি।
অ্যাপ ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৮৪ শতাংশ পুরুষ এবং ১৬ শতাংশ নারী। মাত্র আট বছরে প্রায় এক কোটি গ্রাহকের কাছে অ্যাপটি একটি ভরসার নাম হয়ে উঠেছে।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংক ও রকেটের গ্রাহকদের পাশাপাশি অন্য ব্যাংকের কার্ড ব্যবহারকারীরাও এই অ্যাপ ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন, যা একে একটি সর্বজনীন আর্থিক ব্যবস্থায় পরিণত করেছে। এতে নেক্সাসপে ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থায় সর্বজনীন এক অ্যাপ হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
লেনদেনের রেকর্ড
আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশে নতুন রেকর্ড গড়েছে নেক্সাসপে। মাসে গড়ে ৭৫ লাখের বেশির লেনদেন হয়, যার পরিমাণ ২০ হাজার কোটি টাকার ওপরে। ২০২৩ সালে এ প্ল্যাটফর্মে মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৫৮ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা এবং ২০২৪ সালে লেনদেন বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৮০৬ কোটি টাকায়।
২০২৫ সালে লেনদেনের পরিমাণ আরও বেড়ে হয় ২ লাখ ৩৭ হাজার ৫৭২ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসেই অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত অ্যাপটির মাধ্যমে ৬২ হাজার ৭১১ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এছাড়া প্রতি মাসে শুধু ইউটিলিটি ও সার্ভিস বিল বাবদ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়ে থাকে।
পকেটে থাকা ভার্চুয়াল ব্যাংক
নেক্সাসপে শুধু একটি পেমেন্ট অ্যাপ নয়, এটি গ্রাহকের পকেটে থাকা একটি সম্পূর্ণ ভার্চুয়াল ব্যাংক ব্র্যাঞ্চ। বহুমুখী কার্ড ও অ্যাকাউন্ট সংযুক্তির অংশ হিসেবে ব্যবহারকারীরা ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের নেক্সাস, ভিসা, মাস্টারকার্ড, এজেন্ট ব্যাংকিং কার্ড এবং রকেট অ্যাকাউন্ট সরাসরি অ্যাপে যুক্ত করতে পারেন।
ফান্ড ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীরা ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ বাংলাদেশ (এনপিএসবি) বা বাংলাদেশ ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক (বিইএফটিএন) ব্যবহার করে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা এবং মাসে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফান্ড ট্রান্সফার করা সম্ভব। টাকা পাঠানোর সময় লেনদেনের উদ্দেশে বা ‘ন্যারেটিভ’ উল্লেখ করার সুবিধাও রয়েছে। কেনাকাটা ও বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে কিউআর কোড এবং এনএফসি প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘ট্যাপ অ্যান্ড পে’-এর মাধ্যমে বিল পরিশোধ করা যায়।
দেশজুড়ে প্রায় ১০ লাখ বাংলা কিউআর মার্চেন্ট পয়েন্টে কিউআর কোড দিয়ে লেনদেনের সুবিধা রয়েছে। গ্রাহকরা ঘরে বসেই বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানিসহ সব ধরনের ইউটিলিটি বিল এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফি দিতে পারেন। কোর ব্যাংকিং সুবিধার আওতায় স্মার্টফোন থেকেই নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বৈদেশিক মুদ্রার (এফসি) অ্যাকাউন্ট, ডিপিএস বা এফডিআর খোলা যায়।
এছাড়া চেক বইয়ের আবেদন, ট্যাক্স রিটার্ন আপলোড, কার্ড ব্লক বা আনব্লক এবং এটিএমসংক্রান্ত বিরোধের অভিযোগও এই অ্যাপের মাধ্যমে জানানো যায়। নেক্সাসপে অ্যাপে রয়েছে ভার্চ্যুয়াল লয়্যালটি পয়েন্টস কার্ড, যা ব্যবহার করে বিভিন্ন কেনাকাটা ও বিল পরিশোধ করা যায়।
সর্বোত্তম নিরাপত্তা ব্যবস্থা
নেক্সাসপে গ্রাহকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন যুক্ত করেছে। অন্যান্য ব্যাংকে ট্রান্সফারের জন্য নতুন বেনিফিশিয়ারি যোগ করার সময় ‘বায়োমেট্রিক অথেনটিকেশন’ চালু করা হয়েছে, যেমন- ই-কেওয়াইসি-এর মাধ্যমে ফেস ভেরিফিকেশন অথবা ডিভাইসে সংরক্ষিত ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে যাচাইকরণ।
ডাইনামিক পিন কী-বোর্ড যুক্ত করা হয়েছে, যেখানে প্রতিবার কী-বোর্ডের নম্বরগুলোর অবস্থার পরিবর্তন হবে, ফলে কী-লগার আক্রমণ থেকে ব্যবহারকারীর তথ্য সুরক্ষিত থাকবে। ঝুঁকিপূর্ণ বা কম্প্রোমাইজড ডিভাইসে রিমোট অ্যাক্সেসের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা সংযোজন করা হয়েছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিরা এখন বিদেশের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে ওটিপি পেতে পারেন এবং বিদেশ থেকে নিরাপদে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করতে পারেন। সহজ ইন্টারফেস ও ই-কেওয়াইসি সুবিধার জন্য অ্যাপটিতে একটি পরিচ্ছন্ন বাংলা সংস্করণ রয়েছে এবং ই-কেওয়াইসি প্রক্রিয়ায় ছবি তোলার সময় ভয়েস ইন্সট্রাকশন বা মৌখিক নির্দেশনার সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।
কীভাবে ব্যবহার করবেন নেক্সাসপে
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের এই সুবিধা নিতে গ্রাহককে প্রথমে গুগল প্লে স্টোর বা অ্যাপল অ্যাপ স্টোর থেকে অফিশিয়াল ‘নেক্সাসপে’ অ্যাপটি ডাউনলোড করতে হবে। অ্যাপটি ওপেন করে নিবন্ধন বাটনে ক্লিক করার পর ব্যবহারকারীকে তার সচল মোবাইল নম্বর ও সিম অপারেটর নির্বাচন করতে হবে।
এরপর মোবাইলে আসা একবার ব্যবহারযোগ্য পাসওয়ার্ড(ওটিপি) দিয়ে নম্বরটি যাচাই করে নিজের পছন্দমতো ছয় সংখ্যার একটি গোপন পিন সেট করতে হবে। এরপর জাতীয় পরিচয়পত্রের(এনআইডি) ছবি এবং ব্যবহারকারীর নিজের ছবি (সেলফি) সঠিকভাবে তোলার মাধ্যমেই প্রাথমিক নিবন্ধন প্রক্রিয়া শেষ করতে পারবেন।
সফলভাবে লগইন করার পর ব্যবহারকারীকে তার কাঙ্ক্ষিত কার্ডটি নেক্সাসপেতে যুক্ত করে নিতে হয়। এ জন্য ড্যাশবোর্ডের ‘মাই কার্ডস’ থেকে ‘অ্যাড কার্ড’ অপশনে গিয়ে কার্ডের ধরন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কার্ডটি নির্বাচন করে অত্যাবশ্যকীয় তথ্য দিয়ে পুনরায় ওটিপি দিয়ে যাচাই করলেই কার্ডটি নেক্সাসপে অ্যাপে যুক্ত হয়ে যাবে এবং ব্যবহারকারী নেক্সাসপের সব সুবিধা উপভোগ করতে পারবেন।