মাদারীপুর চরমুগরিয়ার ইকোপার্কের কাজের মেয়াদ শেষ হলেও এখনও শেষ হয়নি নির্মাণকাজ। প্রায় ১০ মাস ধরে ইকোপার্ক নির্মাণের কাজটি বন্ধ আছে। এতে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্তসহ অনেক কিছু চুরিও হয়ে যাচ্ছে।
ইকোপার্ক নির্মাণের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ক্ষতিপূরণ না পাওয়ায় তাদের চাপের মুখে কাজ বন্ধ আছে। দ্রুত এই ব্যাপারটি সমাধান হলেই আবার কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন মাদারীপুর বন কর্মকর্তা।
স্থানীয় ও বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর সদর উপজেলার চরমুগরিয়ার কুমড়াখালি মৌজার কুমার নদের পাড়ে নয়াচর এলাকায় ইকোপার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ফরিদপুর সামাজিক বন বিভাগ। পরবর্তীতে ফরিদপুর সামাজিক বন বিভাগের অধীনে মাদারীপুর জেলার চরমুগরিয়া ইকো-পার্কের আধুনিকায়ন প্রকল্প (দ্বিতীয় সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। পরবর্তীতে কাজ শেষ না হতেই আবার বন্ধ হয়ে যায়।
- আরও পড়ুন-
ঠাকুরগাঁওয়ের সাবেক এমপি ইমদাদুল হক মারা গেছেন - ছাত্রদল নেতার অফিস-বাড়িতে যুবদল কর্মীদের ভাঙচুর, মোটরসাইকেলে আগুন
- নেত্রকোনায় দু’পক্ষের সংঘর্ষে নিহত ৩
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ইকোপার্কটি নির্মাণের জন্য প্রথম পর্যায়ে ৩১ কোটি ৭৩ লাখ ৮২ হাজার টাকার অনুমোদন পায়। পরবর্তীতে প্রথম সংশোধনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ কোটি ২৪ লাখ টাকা। ২০২০ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হলে তা শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে।
পরবর্তীতে প্রকল্পটি আধুনিকীকরণে দ্বিতীয় সংশোধন করা হয়। দ্বিতীয় সংশোধনে তা বেড়ে ৩৬ কোটি ৭৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকা করা হয়। ১০.৩৬ একর জায়গার ওপর নির্মিত ইকোপার্কটির দ্বিতীয় সংশোধনের কাজ ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে শুরু হয়। ২০২৫ সালের জুন মাসে কাজটি শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গত ১০ মাস ধরে কাজটি বন্ধ হয়ে যায়।
খোঁজ নিয়ে আরও জানা যায়, নয়াচর এলাকার ২৪টি পরিবার ইকোপার্ক নির্মাণের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দিলে তারা জায়গা ছেড়ে দেয়। কিন্তু মাত্র একটি পরিবার ক্ষতিপূরণের টাকা পেলেও বাকিরা এখনো টাকা পাননি। তাই ইকোপার্কটির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বাধা দেয়। সেই বাধায় ২০২৪ সালের অক্টোবর মাস থেকে ইকোপার্কটির কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তাছাড়া দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ থাকায় ইকোপার্কের ইট, বালু, রডসহ নানা জিনিসপত্র চুরি হয়ে গেছে। এছাড়াও অনেক নির্মাণাধীন স্থাপনা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি জানিয়েছে মাদারীপুরের সচেতন মহল।
সরেজমিনে দেখা যায়, ইকোপার্কের ভেতরে ঢুকতেই ঘাট বাঁধানো বিশাল বড় একটি পুকুর, চারটি পিকনিক স্পট, পানির ট্যাংক, অর্কিড হাউজ, ২টি টয়লেট জোন, স্টাফ জোন, তিনতলা অফিস ভবন, বানরের জন্য চিকিৎসা কেন্দ্র, চিলড্রেন কর্নারসহ অন্যান্য স্থাপনা রয়েছে। সব মিলিয়ে ইকোপার্কটি দৃষ্টিনন্দন হয়েছে। যে কেউ গেলে পার্কটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবেন।
নাম না প্রকাশে কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত বলেন, আমাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমরা তা পাইনি। কাজ প্রায় শেষ হওয়ার পথে। যদি একবার কাজ শেষ হয়, তাহলে আমরা আর ক্ষতিপূরণ পাবো না। তাই আমরা সবাই মিলে বাধা দিয়েছি। আমাদের সবার ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলে, আর বাধা দেওয়া হবে না। আমরাও চাই সুন্দর একটি ইকোপার্ক নির্মাণ হোক।
স্থানীয়রা বলেন, ইকোপার্কটি অনেক সুন্দর হয়েছে। কিন্তু কাজ শেষ হয়নি। এটি হলে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হবে। ফলে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারও ঘটবে।
এ ব্যাপারে মাদারীপুর বন বিভাগের কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, জমি অধিগ্রহণের বিষয়টি নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। এই ইকোপার্কটি করার জন্য ২৪টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ক্ষতিগ্রস্তদের একটি তালিকা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে তাদের ক্ষতিপূরণের জন্য ২ কোটি ৬ লাখ টাকা বরাদ্দ হয়। এরফলে দ্বিতীয় সংশোধনীতে কাজের টাকা বেড়ে ৩৬ কোটি টাকা অনুমোদন হয়। সেই ক্ষতিপূরণের বরাদ্দ করা ২ কোটি ৬ লাখ টাকা ২০২৩ সালের জুন মাসেই তৎকালীন জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরবর্তীতে একজন ক্ষতিগ্রস্তকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হলেও তৎকালীন ডিসি বদলিসহ নানা জটিলতার কারণে অন্য ক্ষতিগ্রস্তরা এখনও ক্ষতিপূরণ পাননি। তাই কাজ প্রায় ৮০ শতাংশ শেষ হলেও ক্ষতিগ্রস্তরা টাকা না পাওয়ায় বাধা দেন। তাদের বাধায় বর্তমানে কাজ বন্ধ আছে।
তাছাড়া জমি নিয়ে মামলাও আছে। তাই এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের রিপোর্টের পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আশা করা হচ্ছে দ্রুতই এর সমাধান হবে এবং কাজ শেষ করা সম্ভব হবে। আর এই ইকোপার্কের কাজ শেষ হলে এ এলাকাটিতে পর্যটক বেড়ে যাবে। এতে করে ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।
এফএ/জেআইএম