খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে বাজেটে কৃষিতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবি
সম্প্রতি বৈশ্বিক সংকটের কারণে শুধু বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতেই কৃষির উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষিতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। বৃহস্পতিবার (২১ মে) সন্ধ্যায় রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এনসিপি আয়োজিত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের বাজেট: কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সংস্কারে অগ্রাধিকার এবং জনপ্রত্যাশার বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানের চতুর্থ সেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন। \'কৃষি, শিল্প বহুমুখীকরণ ও রপ্তানী উন্নয়ন\' শিরোনামে সেশনটি আয়েজিত হয়। ড. ফয়সাল খানের সঞ্চালনায় এই সেশনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম। এতে বক্তব্য রাখেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ (ইউজিভি)-এর সাবেক উপাচার্য এবং বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)-এর সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম, বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিবিএ) সভাপতি কাজী ইফতেখার হোসেন, লেদারেক্স ফুটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ম্যানেজিং
সম্প্রতি বৈশ্বিক সংকটের কারণে শুধু বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবীতেই কৃষির উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে কৃষিতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) সন্ধ্যায় রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে এনসিপি আয়োজিত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের বাজেট: কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সংস্কারে অগ্রাধিকার এবং জনপ্রত্যাশার বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানের চতুর্থ সেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন। 'কৃষি, শিল্প বহুমুখীকরণ ও রপ্তানী উন্নয়ন' শিরোনামে সেশনটি আয়েজিত হয়। ড. ফয়সাল খানের সঞ্চালনায় এই সেশনে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক কমিটির মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম।
এতে বক্তব্য রাখেন একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ (ইউজিভি)-এর সাবেক উপাচার্য এবং বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)-এর সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. জাহাঙ্গীর আলম, বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিবিএ) সভাপতি কাজী ইফতেখার হোসেন, লেদারেক্স ফুটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও ফুটওয়্যার, লেদার গুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং এনসিপি-এর যুগ্ম সদস্য সচিব ফরিদুল হক।
ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আজকের প্রেক্ষাপটে বাজেটে কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া উচিত। কারণ সাম্প্রতিককালে বৈশ্বিক সংকটের কারণে শুধু বাংলাদেশে না, সারা পৃথিবীতেই কৃষির উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। তারপর হাওড়ে বন্যায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ফসল বিনষ্ট হয়েছে। এর ফলে আমাদের খাদ্যের মূল্যস্ফীতি হতে পারে। ইতোমধ্যে চালের দাম ৩-৪ টাকা বেড়ে গেছে। উৎপাদন মৌসুমে দাম বাড়া আশঙ্কাজনক। খাদ্য মূল্যস্ফীতিটাকে ঠেকানোর একমাত্র উপায় হল খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা।
তিনি বলেন, আজকে খাদ্য সংকটের কারণ কী? গত কয়েক বছর ধরে খাদ্যশস্য উৎপাদন বা সামগ্রিক কৃষি উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাচ্ছে। গত অর্থবছর ২৪-২৫ খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির হার ছিল ২.৪২ শতাংশ। যেটি গত ৫৪ বছরে ৩ শতাংশের বেশি ছিল। কেন উৎপাদন কমছে? কারণ যে হারে বাজেট বাড়ছে, সেই হারে কৃষি বাজেট বাড়ছে না
তিনি আরও বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আসন্ন জাতীয় বাজেটে কৃষিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে কৃষি বরাদ্দ ন্যূনতম পক্ষে ১০ শতাংশ বা ৯৪ হাজার কোটি টাকা এবং কৃষি ভর্তুকি ন্যূনতম ৪০ হাজার কোটি টাকা করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এছাড়া, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করতে হবে এবং গ্রামে গ্রামে সংগ্রহ সেন্টার স্থাপন করতে হবে। একই সঙ্গে দেশে একটি ‘এগ্রিকালচারাল প্রাইস কমিশন’ গঠন করা জরুরি, যাতে কৃষকরা উৎপাদিত ফসলের সঠিক দাম পায়। পাশাপাশি কৃষি ঋণের পরিমাণ বাড়িয়ে সাধারণ কৃষকদের সহযোগিতা করা উচিত।
মোহাম্মদ নাজমুল হাসান বলেন, আমার অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের যে পরিকল্পনা, সেটির জন্য পাঁচটি বিষয়ে নজর দিতে হবে। প্রথমত, শিল্প ও রপ্তানি বহুমুখীকরণে এনার্জির কোনো ঘাটতি থাকা যাবে না এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আপনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যদি ভালো না থাকে সেক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়ে না। তৃতীয়ত, লাইসেন্সিং এবং রেগুলেটরি বিষয়গুলো সহজ করতে হবে। দেশে ব্যবসা করতে ২০ থেকে ২৫টা লাইসেন্স প্রয়োজন হয়, যা পৃথিবীর কোথাও নেই। চতুর্থত, এটি সবচেয়ে মারাত্মক তথা ব্যাংকিং খাত। এই ব্যাংকিং সেক্টর ধ্বংস হয়ে গেছে। ১৪ থেকে ১৭ শতাংশ সুদহার দিয়ে উদ্যোক্তা তৈরি করতে পারবেন না। কর্মসংস্থান তৈরি করতে হলে দুইটা অপশনস আছে। আপনাকে উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। তারপর যারা শ্রমিক আছে, তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, পঞ্চম হল, সব ক্ষেত্রে রিফর্ম করতে হবে। আপনারা রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কারের কথা বলেছেন, আমি সরকারের সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে সংস্কারের কথা বলছি। সব প্রতিষ্ঠান সংস্কার করা উচিত। সেখানে এটার জন্য একটা দুই বছর মেয়াদি একটা প্ল্যান করা দরকার। আপনারা সবাই সরকার-বিরোধী দল মিলে একটা প্ল্যান করেন। আমাদের ডাকলে পাবেন। সমস্যাগুলো কী আছে যেগুলো কখনো জিজ্ঞেস করলেই আমরা জানাতে পারব। জুলাই বিপ্লবের পর অনেক রাজনৈতিক দল দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। আমাদের ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকে দেশ ছেড়ে চলে গেলেন কেন? এটা আমার প্রশ্ন সবার কাছে।
কাজী ইফতেখার হোসেন বলেন, বাংলাদেশে গার্মেন্টস সেক্টরে সস্তা শ্রমিক বিক্রি করে চলে। এই সস্তা শ্রমিক দিয়ে তো আপনি অনেকদিন চলতে পারবেন না। কারণ, এই যে সস্তা শ্রমিক একসময় শেষ হয়ে যাবে। কারণ, আমাদের ডেমোগ্রাফিক ডেভিডেন্ত কমে যাবে। ফলে আপনাকে ইন্ডাস্ট্রিতে বৈচিত্র্য আনতে হবে।
তিনি বলেন, ১৯৯০ সালে ভিয়েতনামের এক্সপোর্ট ছিল ২.৭ বিলিয়ন ডলার। আমাদের ছিল ১.৮৭ বিলিয়ন ডলার। তারা আজকে তাদের ৪৭৫ বিলিয়ন ডলার আর আমাদের ৪২ বিলিয়ন ডলারে। তার কারণ কী? তার কারণ হল সে তার মধ্যে বৈচিত্র্য এনেছে। সে এই কৃষি খাতে ৭০ বিলিয়ন ডলার এক্সপোর্ট করে। কিন্তু আমি করতে পারছি না। এর মূল কারণ প্রক্রিয়াগত।
তিনি আরও বলেন, আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার বিশাল অভাব। যেই স্বচ্ছতার কারণে আমরা আজকে বিপদে আছি। আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় লুটেরাদের আধিপত্য, অলিগার্কদের আধিপত্য। একটি রাষ্ট্রের যদি যদি অর্থনৈতিক মুক্তি না হয়, তাহলে তার কোনো আজাদি আসবে না।
জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ম সদস্য সচিব ফরিদুল হক বলেন, করোনার সময় খুব আলাপ হচ্ছিল যে, স্বাস্থ্য খাতে এত বিনিয়োগ করা হল, তার রিটার্ন আমরা কি পেয়েছি? সেসময় আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বলতে কোনো কিছু নেই। ৬ বছর পর এসে আমরা বুঝতে পারছি, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ৬ বছরেও যা ছিল, এখনও তাই আছে। মজার ব্যাপার হল বর্তমান সরকার এটাকে টিকার সংকট হিসেবে দেখছে। কয়েকদিন পর বাজেটের জন্য সংসদে একটি অর্থবিল তোলা হবে। এই বিলে স্পিকার একটা সার্টিফিকেট দিয়ে দিবেন। দেওয়ার পর এটাতে আর রাষ্ট্রপতি কোনো মতামত দিতে পারবেন না। সার্টিফিকেটটা দেওয়ার পরে এই অর্থ বিল নিয়ে কোথাও কখনো কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না। অর্থাৎ এই ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট হবে, যেটার প্রত্যেকটা পেনি বাংলাদেশের জনগণ তাদের কষ্টার্জিত সম্পদ থেকে ব্যয় করবে কিন্তু সেটাকে কোথাও আপনি প্রশ্ন করতে পারবেন না।
সভাপতির বক্তব্যে সারজিস আলম বলেন, সরকার সারে ভর্তুকি দিলেও অনেক ক্ষেত্রে কৃষকদের তা বেশি দামেই কিনতে হয়। কীটনাশক দিনে দিনে কৃষকের কাছে দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠছে। ফলে ফসল উৎপাদনের পর কৃষক সার এবং কীটনাশকের দাম তুঁতে পেরেছেন কি না, তা নিয়ে চিন্তা করেন এবং প্রতিবার উৎপাদনের পর কৃষক তওবা করেন যে পরেরবার তিনি আর কৃষি কাজ করবেন না।
তিনি বলেন, স্থানীয় পর্যায়ে যারা সারের ডিলার তারা হয় রাজনৈতিক দলের নেতা অথবা রাজনৈতিক দলের পৃষ্ঠপোষকতায় হয়েছে। আমরা যদি কৃষকের মুক্তি দিতে চাই, তাহলে তার ন্যূনতম নিজের মতো করে কেনার স্বাধীনতা দিতে হবে। কৃষকদের আলুর ক্ষেত্রে একটি সিন্ডিকেট কাজ করে। কৃষক তার সর্বস্ব দিয়ে কৃষিকাজ করে, এটি বিক্রি করে তিনি যদি সামান্য লাভ না পান, তাহলে এটা কৃষকের সঙ্গে রাষ্ট্রের করা অন্যায়। কৃষকদের এই অন্যায় থেকে আমাদের মুক্তি দিতে হবে। ফসল উৎপাদনে ১০ টাকা খরচ হলে ১২ টাকা সে বিক্রি করতে পারবে, এই নিশ্চয়তা থাকা উচিত।
এনএস/জেএইচ
What's Your Reaction?